নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বর্তমান সময়ে সাইবার ক্রাইম শব্দটির সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। কিন্তু এই ঘটনাগুলোতে ভুক্তভোগী কি প্রচন্ড পরিমাণ ক্ষতির শিকার হয় এবং এমন একটি ঘটনার ভয়াবহতা কিভাবে একটি পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, সেটা আমরা কতটুকু উপলব্ধি করতে পারি? একই সাথে এমন পরিস্থিতিতে একজন ভুক্তভোগীর জন্য আইনী সুবিধা কি? ভুক্তভোগী কিভাবে এবং কতটুকু আইনী সহায়তা পেতে পারে, এসম্পর্কে সাধারণ মানুষ কতটুকু জানে? এই প্রশ্নগুলো জরুরীভাবেই সামনে চলে আসে। পুরো বিষয়টিকে নিয়ে আমি আমার মত আলোচনা করতে চাই-
একটি ব্যক্তিগত চ্যাট, একটি ছবি কিংবা দুজন মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্ত! থাকতেই পারে! কিন্তু সমস্যাটা তখন হয় যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এগুলো আর ব্যক্তিগত থাকছে না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্ক্রিনশট, স্ক্রিন রেকর্ডিং বা শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে হাজারো মানুষের কাছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে মানসিক বিপর্যয়, সামাজিক অপমান এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অপরাধ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকার পূর্ববর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ কার্যকর করেছে। নতুন আইনে ডিজিটাল হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ব্ল্যাকমেইল এবং তথাকথিত ‘রিভেঞ্জ পর্ন’-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
আসুন আমরা প্রথমেই জানি আইনে কী বলা হয়েছে,
অধ্যাদেশের ধারা ২৫ অনুযায়ী, কেউ যদি অন্য কাউকে ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা ডিজিটাল কনটেন্ট প্রকাশ করে কিংবা তা প্রকাশের হুমকি দেয়, তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এই অপরাধে সাধারণ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। আর যদি ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের নিচের শিশু হয়, তাহলে শাস্তি বেড়ে দাঁড়াবে পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানা।
এছাড়া নতুন আইনে ‘সেক্সটর্শন’ শব্দটিও স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ, সম্পর্ক বা অন্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি।
কিন্তু সমস্যা তো শুধু প্রযুক্তিতে নয়, সমাজেও যদিও আইন কঠোর হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সামাজিকভাবে মানুষের মানসিকতা কি বদলেছে?
বাংলাদেশে এখনো ব্যক্তিগত ছবি বা চ্যাট ফাঁসের ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়। “সে কেন ছবি পাঠালো?” কিংবা “এমন সম্পর্কেই বা কেন গেল?” এ ধরনের মন্তব্য ভুক্তভোগীদের আরও বিপর্যস্ত করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘ভুক্তভোগীকে দোষারোপের চর্চা’ অপরাধীদের সাহস বাড়ায় এবং এ কারণে অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জার ভয়ে থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করতে চান না।
উদ্বেগজনক আরেকটি দিক হচ্ছে তরুণদের মধ্যে এই অপরাধের প্রবণতা আশঙ্কাজনক ভাবে বেশি। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিস্তারের ফলে তরুণদের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ধরন বদলেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা সচেতনতা সমানভাবে বাড়েনি।
অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী বিপুল সংখ্যক নারী কোনো না কোনোভাবে অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস, ভুয়া আইডি তৈরি, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল এবং হুমকি এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও ডিজিটাল নৈতিকতা গড়ে ওঠেনি। আইন প্রয়োগেও রয়েছে চ্যালেঞ্জ। আমি বলব সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং দ্রুত বিচার এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কেন?
কারণ-
- ভুক্তভোগীরা আইনি প্রক্রিয়া জানেন না।
- প্রমাণ সংরক্ষণ করতে পারেন না।
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ডিজিটাল সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকে।
- দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
- ফলে কঠোর আইন থাকলেও বাস্তব সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলপ্রসূ সমাধান কোথায় তাহলে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন-
- স্কুল-কলেজে ডিজিটাল নৈতিকতা শিক্ষা।
- পরিবারে অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা।
- দ্রুত আইনি সহায়তা।
- ভুক্তভোগীবান্ধব অভিযোগ ব্যবস্থা।
- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
ডিজিটাল সম্মান এখন মৌলিক অধিকারে পৌঁছেছে। বর্তমান সময়ে একজন মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং ডিজিটাল উপস্থিতি তার ব্যক্তিগত/ সামাজিক মর্যাদার অংশ হিসেবে দেখা হয়। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে আইন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সমাজ কত দ্রুত ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে তার ওপর।
কারণ ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা শুধু আইনি প্রশ্ন নয়, এটি এখন মানবিক মর্যাদা রক্ষারও প্রশ্ন।
