ফারাহ জেহির
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম চিরকালের জন্য অম্লান হয়ে আছে, তার মধ্যে জাহানারা ইমামের নাম সবচেয়ে উজ্জ্বল। তিনি কেবল একজন লেখক বা একজন শহীদের জননীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি জাতির বিবেক, একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অক্লান্ত প্রহরী। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে আমাদের সমগ্র দেশ ও জাতি গর্ববোধ করে, কেননা তিনিও আমাদের মতোই একজন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপ্রেমী বাংলাদেশী।
১৯২৯ সালের ৩ মে বাংলার উর্বর ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন জাহানারা ইমাম। শৈশব থেকেই মেধাবী এই মানুষটি শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর প্রতিভা কোনো একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, সংগঠক এবং জাতীয় চেতনার সাহসী কণ্ঠস্বর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর একমাত্র পুত্র শফি ইমাম রুমী দেশের জন্য শহীদ হন। সেই মুহূর্ত থেকে ব্যক্তিগত শোক আর জাতীয় বেদনা তাঁর জীবনে অভিন্ন হয়ে যায়। ‘শহীদ জননী’ উপাধিতে ভূষিত এই মহীয়সী নারী ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ ও উত্তরাধিকার অমর হয়ে আছে।
একাত্তরের দিনগুলি: ইতিহাসের জীবন্ত দলিল
জাহানারা ইমামের শ্রেষ্ঠ কীর্তি নিঃসন্দেহে ‘একাত্তরের দিনগুলি’। ১৯৭১ সালে লেখা এই দিনপঞ্জিটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অসামান্য মানবিক দলিল। বইটি কোনো শুষ্ক ইতিহাস গ্রন্থ নয়; এটি একজন মায়ের হৃদয়ের ভেতর দিয়ে দেখা একটি জাতির সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। পুত্র রুমীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, তাঁর বন্দিত্ব এবং অবশেষে শাহাদাত, এই যন্ত্রণার আখ্যানকে তিনি এতটাই নির্মোহ ও সাহসী ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন যে পাঠক একই সঙ্গে কাঁদেন এবং শক্তি সঞ্চয় করেন। বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় দেশপ্রেম শুধু আবেগ হিসেবে নয়, একটি সক্রিয় দায়িত্ব হিসেবে প্রকাশ পায়। এটি বাংলা সাহিত্যে যুদ্ধসাহিত্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন।
ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস: মানবিক সাহসের আলেখ্য
‘ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস’ বইটিতে জাহানারা ইমাম অত্যন্ত সৎ ও অকুতোভয় ভঙ্গিতে তাঁর দীর্ঘ অসুস্থতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। মৃত্যুকে সামনে রেখেও যে মানুষ আপোস করেননি, না নিজের বিশ্বাসে, না দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্বে, এই বইটি সেই অটল মনোবলের প্রমাণ। শারীরিক যন্ত্রণার মাঝেও তিনি লেখা থামাননি, আন্দোলন থামাননি। বইটি পাঠককে শেখায় যে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় মানবিক মর্যাদা ও সাহস কীভাবে ধরে রাখতে হয়। এটি কেবল একটি রোগ-বর্ণনা নয়; এটি একটি দার্শনিক প্রতিস্পর্ধার গল্প, যেখানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষ তার নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না।
অন্য জীবন: আত্মানুসন্ধানের আখ্যান
‘অন্য জীবন’ বইটিতে জাহানারা ইমাম তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং আত্মগঠনের কথা বলেছেন। একজন নারীর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নিজের পরিচয় তৈরির যে যাত্রা, তা এই বইয়ে সরল কিন্তু গভীর ভাষায় চিত্রিত হয়েছে। বইটি পাঠ করলে বোঝা যায়, তাঁর দেশপ্রেম কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ আত্মজিজ্ঞাসা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর দৃঢ় ভিত্তি স্থাপনের ফল।
জাহানারা ইমামের দেশপ্রেম কোনো বাগাড়ম্বর ছিল না। এটি ছিল কর্মে প্রমাণিত একটি জীবনদর্শন। পুত্রশোককে তিনি ব্যক্তিগত গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। সেই শোককে তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন জাতীয় আন্দোলনের শক্তিতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালে তিনি গণআদালত প্রতিষ্ঠা করেন, মৃত্যুশয্যায়ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়ে লড়াই করেছেন। তাঁর লেখা ও জীবন এই বার্তা দেয় যে দেশপ্রেম মানে শুধু পতাকা হাতে মিছিল নয়, দেশপ্রেম মানে সত্যের জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য নিজের সর্বোচ্চ মূল্য চুকিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার বিবেকবান মানুষের সাহসে।
