সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
দেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে বিশাল এক মাইলফলক হতে যাচ্ছে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের এই মেগা উদ্যোগ। যেকোনো দেশের চিকিৎসাসেবার মেরুদণ্ড মজবুত করতে দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবলের বিকল্প নেই। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ এই আওয়াজ জোরালো হয়েছে যে, ‘আর কোনো ভুল নয়’।
প্রশাসনিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ
এর আগে বিভিন্ন সময়ে বড় বড় সরকারি নিয়োগে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা, প্রশ্ন ফাঁস, স্বজনপ্রীতি কিংবা আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির যে তিক্ত নজির আমরা দেখেছি, এই মেগা নিয়োগকে সেই বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি সংবেদনশীল খাতে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক জনবল যুক্ত করার প্রক্রিয়াটি যেমন আশাব্যাঞ্জক, ঠিক তেমনি তা এক বিশাল প্রশাসনিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে।
মেধা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক এবং স্বচ্ছ একটি রূপরেখা তৈরি করা। যখন লাখো প্রার্থীর ভাগ্য এবং কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এর সাথে জড়িয়ে থাকে, তখন সামান্যতম বিচ্যুতিও পুরো খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ধসিয়ে দিতে পারে।
অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার শুরু থেকেই একটি নিখুঁত ও আধুনিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। লিখিত পরীক্ষা থেকে শুরু করে মৌখিক পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত মনোনয়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপ বা জালিয়াতির সুযোগ না থাকে। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদারকি কমিটির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা জরুরি।
কৌশলগত পদায়ন ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ
শুধু নিয়োগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং এই বিশাল জনবাহিনীকে কোথায় এবং কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, তাও এক বড় বিবেচ্য বিষয়। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় সংকট হলো গ্রামীণ বা প্রান্তিক অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার চরম ঘাটতি।
শহরকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এই নতুন স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় অংশকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পদায়ন করা প্রয়োজন। যদি সঠিক বণ্টন না করে আগের মতোই শহরমুখী নিয়োগের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে এই মেগা নিয়োগের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে। একই সাথে, নিয়োগ পাওয়ার পরপরই তাদের জন্য যুগোপযোগী এবং মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা মাঠপর্যায়ে গিয়েই দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
পরিশেষে বলা যায়, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের এই মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চেহারা বদলে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ। এটিকে কেবল একটি নিয়মিত চাকুরির বিজ্ঞপ্তি হিসেবে না দেখে, জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
অতীতের লুপহোল বা ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করে যদি সততা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এই নিয়োগ সম্পন্ন করা যায়, তবে তা দেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সাধারণ মানুষের অধিকার আর রাষ্ট্রের সদিচ্ছার মধ্যে যেন কোনো গ্যাপ না থাকে, এবারের নিয়োগে এটাই হোক একমাত্র অঙ্গীকার।
