ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক
প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে বাংলাদেশে ঘটে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জনস্রোত। লাখো মানুষ ছুটে যান নিজেদের শিকড়ের টানে, গ্রামে ফেরা এই যাত্রা যেন এক আবেগঘন সামাজিক উৎসব। কিন্তু আনন্দময় এই ঘরে ফেরা বছরের পর বছর পরিণত হচ্ছে এক গভীর জননিরাপত্তা সংকটে। মহাসড়ক, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট কিংবা ফেরিঘাটে অতিরিক্ত ভিড়, অযত্নে চলা যানবাহন, দুর্বল অবকাঠামো এবং বিশৃঙ্খল টিকিট ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছরই ঘটছে দুর্ঘটনা, দীর্ঘ ভোগান্তি এবং বহু প্রাণহানি। অথচ এই বাস্তবতা কখনোই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। ঈদের সময় যাত্রীচাপ বেড়ে গেলে পরিবহন মালিকরা প্রায়ই নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করেন। অনুমোদিত বাস ও ট্রেনের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় সুযোগ নেয় অনিয়ন্ত্রিত ও অননুমোদিত পরিবহন ব্যবস্থা। রাস্তায় নামে অযোগ্য চালক ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন। নদীপথেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক লঞ্চ ও ফেরি অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বহন করে, ফলে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় সবসময়।
সড়কপথে যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকের লাইসেন্স যাচাই এবং অতিরিক্ত বোঝা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শিথিলতা বহুদিনের সমস্যা। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতি এবং নজরদারির ঘাটতির কারণে কাগজে থাকা নিয়ম বাস্তবে প্রয়োগ হয় না। টার্মিনাল কিংবা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, আইন আছে কিন্তু তার কার্যকর উপস্থিতি নেই।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে কেবল অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। সড়ক ও নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি জাতীয় ঈদ যাতায়াত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে। অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই অতিরিক্ত নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা চালু করলে শেষ মুহূর্তের বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক ই টিকিট ব্যবস্থা এবং যাত্রী ধারণক্ষমতার রিয়েল টাইম তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে যাত্রীরা সহজেই জানতে পারবেন কোথায় আসন খালি আছে, আর টিকিট না পেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাও কমবে।
ঈদের সময় দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে আগাম অ্যাম্বুলেন্স, ট্রমা টিম এবং উদ্ধারকারী নৌযান মোতায়েন করলে দুর্ঘটনার পর প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন অপারেটরদের একটি সীমিত ও সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে নিরাপদ পরিবহন সক্ষমতাও বাড়বে।
বাংলাদেশের সামর্থ্যের অভাব নেই। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর বাস্তবায়ন এবং জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা। ঈদের ঘরে ফেরা মানুষের জন্য আনন্দের হওয়ার কথা, আতঙ্ক কিংবা মৃত্যুর নয়। এই ঐতিহ্য আরও নিরাপদ, মানবিক ও সুশৃঙ্খল হওয়ার দাবি রাখে।
