শেখ সেলিম
গত দুই দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানদণ্ডে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দেশের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার বর্তমান অবস্থার মধ্যে যে বৈপরীত্য বিদ্যমান, তা একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এই বাস্তবতা আমাদের গবেষণার লক্ষ্য, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল কেন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ের নিচের দিকে অবস্থান করছে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কি সঠিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছি? আমাদের গবেষণা সক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য কি সঠিক সূচক ব্যবহার করা হচ্ছে? এবং আমরা কি এমন একটি লক্ষ্য অনুসরণ করছি, যা আমাদের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?
নিঃসন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, সাফল্য এবং প্রভাব বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে গবেষণার মান নির্ধারণে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক সূচকগুলো কতটা বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
আন্তর্জাতিক মানদন্ডে অবস্থানের সংকট
২০২২ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ই ৮০১ থেকে ১০০০ অবস্থানের মধ্যে স্থান পায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ৬০১ এর উপরের অবস্থানে ছিল, সেখান থেকে ধীরে ধীরে আরও নিচে নেমে এসেছে। একই সময়ে ভারতের আটটি এবং পাকিস্তানের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে।
কিউএস র্যাঙ্কিং ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন করে। এগুলো হলো একাডেমিক সুনাম, নিয়োগদাতাদের মূল্যায়ন, শিক্ষক শিক্ষার্থী অনুপাত, শিক্ষকপ্রতি উদ্ধৃতি সংখ্যা, আন্তর্জাতিক শিক্ষক এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর অনুপাত। এই সূচকগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান দুর্বল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কোন ক্ষেত্রে ভালো করছি, এবং সেই সাফল্যগুলো কি আদৌ এসব সূচকের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে?
বিশেষ করে শিক্ষকপ্রতি গবেষণা উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা উদ্বেগজনক। স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত বহু গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় না, এবং বৈশ্বিক গবেষণা আলোচনায় খুব কমই উদ্ধৃত হয়। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের গবেষণা উদ্ধৃতির হার দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত বুয়েট আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশ করলেও তার পরিমাণ এখনও সীমিত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি প্রকাশনার সংখ্যায় কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে গবেষণার প্রভাব, উদ্ধৃতি এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
কেন একাডেমিক গবেষণার বিকাশ বাধাগ্রস্ত
বাংলাদেশে গবেষণার দুর্বলতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক ব্যর্থতার ফল নয়; বরং একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার প্রতিফলন। দেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ঐতিহাসিকভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, যা ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত ৬ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এই সীমিত অর্থায়নের কারণে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীর সদস্যপদ গ্রহণ এবং গবেষকদের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও গবেষণা উপস্থাপনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য এমন একটি নমনীয় কর্মপরিকল্পনা গড়ে তোলা সম্ভব হয় না, যা মেধাবী গবেষকদের অধিক সময় ও মনোযোগ গবেষণায় নিবেদিত করার সুযোগ দিতে পারে।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক ও গবেষণা যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর ফলে গবেষণামুখী মেধাবী শিক্ষক তৈরির ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দক্ষ গবেষকের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
সমস্যাটিকে আরও জটিল করেছে গবেষণায় আগ্রহী স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর অভাব। বুয়েটের এক সাবেক প্রকৌশল অনুষদের ডিনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অধিকাংশ স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী গবেষণার প্রতি আন্তরিক আগ্রহ থেকে নয়, বরং কর্মজীবনে অতিরিক্ত যোগ্যতা অর্জনের উদ্দেশ্যে উচ্চতর ডিগ্রিতে ভর্তি হয়। ফলে গবেষণার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যে উদ্যমী ও দক্ষ গবেষক শিক্ষার্থী গোষ্ঠীর প্রয়োজন, তা গড়ে ওঠে না। অথচ শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মিত হয় গবেষণামুখী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা কাঠামোও ধারাবাহিক গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। দেশের অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম শর্ত পূরণ করা। অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতি অর্জনের পর গবেষণা কার্যক্রম ও উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় সম্পৃক্ততা ও ধারাবাহিক জ্ঞানসৃষ্টির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
এশিয়া ও পাশ্চাত্যের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদোন্নতির পর গবেষণার জবাবদিহিতা, মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক অবদানের সংস্কৃতি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। গবেষণাকে পেশাগত অগ্রগতির একটি শর্ত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও জ্ঞানসৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
চিত্র ১: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গবেষণা কার্যসম্পাদন ও সম্ভাবনা, ২০২৪

চিত্র ১, স্কোপাস থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যসম্পাদনের তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। নীল রঙের স্তম্ভে বর্তমান গবেষণা পরিস্থিতি এবং সবুজ রঙের স্তম্ভে বিদ্যমান সম্ভাবনার চিত্র দেখানো হয়েছে।
গবেষণার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকের আলোকে দেখা যায়, প্রয়োগভিত্তিক গবেষণাই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য নিকট ভবিষ্যতে অগ্রগতির সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা বর্তমানে অত্যন্ত সীমিত এবং এ ক্ষেত্রের সম্ভাবনাও প্রত্যাশার তুলনায় কম। একইভাবে গবেষণা প্রকাশনার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
এই চিত্রটি স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হলে কেবল আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে বাস্তব সমস্যা সমাধানকারী, শিল্প ও সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত প্রয়োগভিত্তিক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ব্যবহারিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা: আরও বিচক্ষণ ও কার্যকর একটি পথ
ব্যবহারিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা এমন একটি গবেষণা পদ্ধতি, যার লক্ষ্য হলো বাস্তব জীবনের অথবা স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করা এবং এমন ফলাফল তৈরি করা, যা সরাসরি কাজে প্রয়োগ করা যায়। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু অভিযোজন এবং শিল্প উৎপাদনশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জরুরি চাহিদা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা সমাজ ও অর্থনীতিতে সরাসরি পরিমাপযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে, যা অনেক সময় কেবল তাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশের বাস্তবতা এই শ্রেণির মধ্যেই পড়ে। তাই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, আচরণবিজ্ঞান, প্রয়োগভিত্তিক বিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞানের এমন গবেষণায়, যা জাতীয় সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে। এখানেই আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। আমরা কি বাংলাদেশের গবেষণা সক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য সঠিক মানদণ্ড ব্যবহার করছি? নাকি গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি সংখ্যা, জার্নালের মান বা কোয়ার্টাইল র্যাঙ্কিংয়ের মতো সূচকগুলোকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি?
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োগভিত্তিক গবেষণার সফলতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর সহযোগী সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উচ্চ ফলনশীল, বন্যা সহনশীল এবং লবণাক্ততা সহনশীল বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এসব উদ্ভাবন সরাসরি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রেখেছে এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে দেশকে ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত এই গবেষণা লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। দেশের কোনো তাত্ত্বিক গবেষণা কর্মসূচি এই ধরনের সরাসরি জাতীয় প্রভাবের দাবি করতে পারে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রকৌশল খাতেও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ ভূপ্রকৃতি এবং ভূমিকম্প ঝুঁকির উপযোগী কম খরচে নিরাপদ ভবন নির্মাণ নকশা তৈরিতে বুয়েটের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যখন এসব গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তব নির্মাণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব সৃষ্টি করে।
শিল্পখাতের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে প্রয়োগভিত্তিক গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব গবেষণা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন এবং অংশীদারিত্ব আকর্ষণ করেছে। যদিও এসব প্রকল্পের অনেকগুলো স্কোপাস সূচিভুক্ত গবেষণাপত্র বা উচ্চ উদ্ধৃতি সংখ্যায় প্রতিফলিত হয়নি, তবুও এগুলো দেশের উন্নয়ন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার শক্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা এখনও প্রচলিত কিছু সূচকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এই সমস্যা বিশেষভাবে দেখা যায় এমন শিক্ষকদের মধ্যে, যারা গবেষণার প্রকৃত প্রভাবের চেয়ে পদোন্নতির শর্ত পূরণে বেশি মনোযোগী। অনেক গবেষক তাদের কাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক বা জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনা না করে কেবল পদোন্নতির নির্ধারিত ফর্ম পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকাশনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর ফলে অনেক সময় গবেষণার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান সৃষ্টি ও সমস্যা সমাধান থেকে সরে গিয়ে একটি সংখ্যাগত প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। এমনও হতে পারে যে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের কাছ থেকেও একই ধরনের সীমিত ধারণা গ্রহণ করছে এবং অজান্তেই গবেষণার প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত নির্দেশনা পাচ্ছে।
আমি আর্তজাতিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার শীর্ষ পর্যায়ে বহু বছর কাজ করেছি। গবেষণার কার্যকারিতা, প্রভাব এবং মূল্যায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশ, গবেষণা অর্থায়ন অর্জন এবং সরকারি নীতিনির্ধারণে গবেষণার অবদান রাখার অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে। পাশাপাশি প্রকাশনা, সম্মেলন, সেমিনার, সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে আমার গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করেছি। আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাবিদ যেই প্রকাশনার প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছেন, তা অনেক সময় গবেষণার প্রকৃত প্রয়োগ ও উপকারিতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যে গবেষণায় তারা সময় দিচ্ছেন এবং প্রকাশ করতে আগ্রহী হচ্ছেন, তার বাস্তব প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থেকে যায়।
এ কারণেই আমরা প্রায়ই এমন গবেষণাপত্র দেখতে পাই, যেখানে বহু সহলেখকের নাম রয়েছে, কিন্তু তাদের অনেকেরই গবেষণায় প্রকৃত অবদান বা সংশ্লিষ্টতা নেই। এমনকি কেউ কেউ সেই গবেষণার মৌলিক বিষয় সম্পর্কেও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম নন।
এই ধরনের অংশগ্রহণ মূলত একাডেমিক পদোন্নতির প্রয়োজনীয়তা পূরণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, গবেষণার মাধ্যমে দেশ, জ্ঞানক্ষেত্র বা নির্দিষ্ট সমস্যার উপকার করার প্রকৃত অঙ্গীকার থেকে নয়। ভুল গবেষণা সূচকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার এটাই সবচেয়ে বড় নৈতিক ঝুঁকি, বা মরাল হ্যাজার্ড। গবেষণার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত তার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জাতীয় প্রভাবের মাধ্যমে, শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বা উদ্ধৃতির হিসাব দিয়ে নয়।
বাংলাদেশের জন্য ব্যবহারিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণার সুফল
ব্যবহারিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুফল তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি খাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ ইতোমধ্যে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের সাফল্য এনে দিয়েছে, যার অর্থনৈতিক মূল্য প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। জনস্বাস্থ্য খাতে মহামারি ও রোগতত্ত্বভিত্তিক গবেষণার কার্যকর প্রয়োগ বাংলাদেশকে শিশু মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত অগ্রসর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পরিচালিত প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা ঘূর্ণিঝড় সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের নীতিমালা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব গবেষণার ফলাফল জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে টেকসই সেচ প্রযুক্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দেশীয় পদ্ধতি উদ্ভাবনেও গবেষণার অবদান রয়েছে।
ব্যবহারিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা সরকারি, বেসরকারি ও বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পখাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সমস্যা সমাধানে কাজ করে, তখন সেই জ্ঞান স্থানান্তর একদিকে যেমন অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। জার্মানির ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউট এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের সমন্বিত গবেষণা মডেল এর সফল উদাহরণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ে এই ধরনের কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে আতিথেয়তা, বিনোদন এবং বিজ্ঞাপন শিল্পের জন্য স্থানীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মপ্রক্রিয়া নকশা নিয়ে প্রয়োগভিত্তিক গবেষণায় অবদান রাখছে। এছাড়া স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন আকর্ষণের সম্ভাবনা বেশি রাখে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত বাস্তব সমস্যা সমাধান ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলভিত্তিক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়।
তাই আমাদের গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে গবেষণার যথার্থতা, উপকারিতা এবং প্রয়োগভিত্তিক সাফল্যের মূল্যায়নে। অর্থনীতি, ব্যবসা, শিল্প এবং জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, আইন ও মানবিক বিষয়গুলোর গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশীয় অবস্থানের সুদৃঢ়তা প্রতিষ্ঠার জন্য বহুভাষিক এবং বহুমাধ্যমে প্রচার ও প্রসার করতে হবে, যেন এসব গবেষণা আন্তর্জাতিক মানের একই বিষয়ক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। শুধু একাডেমিক পদোন্নতির জন্য গবেষণা নয়, বরং দেশের স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে এমন গবেষণাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এর জন্য সবচেয়ে প্রথমে গবেষণা সাফল্যের মূল্যায়নের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বতন্ত্র এবং যৌক্তিক করতে হবে। এর শুরু হবে গবেষকদের এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দিয়ে।
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) শক্তিশালী করার সঠিক পথ
গবেষণা ও উন্নয়নের অগ্রগতির জন্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাস্তবে এটি সহজ না হলেও, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা ও কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে গবেষণার পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব।
প্রথমত, জাতীয় গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত ১ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো অগ্রাধিকার খাতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে মানবিক বিজ্ঞান, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাতেও প্রণোদনার ব্যবস্থাকে যৌক্তিক এবং কৌশলী করতে হবে। এটি অসম্ভব কোনো লক্ষ্য নয়। তবে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার, কার্যকারিতা এবং ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার ধারণা এই কাজটিতে অতীতে যথেষ্ট গাফলতি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রযুক্তি স্থানান্তর ইউনিট এবং শিল্প ও সরকারি সংযোগ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এসব ইউনিটের কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতাকে শিল্প ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকরভাবে যুক্ত করা।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদোন্নতি ও স্থায়ী নিয়োগের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা নয়, বরং গবেষণার বাস্তব প্রভাবকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োগভিত্তিক গবেষণার ফলাফল, পরীক্ষামূলক প্রকল্প, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন এবং সামাজিক বা শিল্পখাতে প্রভাব, এগুলোও উচ্চমানের গবেষণা প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভিত্তি হতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক যদি এমন একটি নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন করেন, যা দুই লাখ কৃষক ব্যবহার করছেন এবং যার মাধ্যমে দেশের কৃষিতে বাস্তব পরিবর্তন এসেছে, তাহলে সেই গবেষককে এমন একজন গবেষকের সমান স্বীকৃতি দেওয়া উচিত, যিনি একটি উচ্চমানের আন্তর্জাতিক জার্নালে তাত্ত্বিক বা বিশ্লেষণধর্মী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
চতুর্থত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা কাজে লাগাতে তাদের প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ গড়ে তোলার জন্য কর সুবিধা এবং গবেষণা অনুদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করতে হবে। এ ধরনের প্রণোদনা ছাড়া অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ভর্তি, ব্যবসায়িক বাস্তবতা এবং গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচিত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি মানসম্মত শিক্ষক কর্মপরিকল্পনা কাঠামো এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষক ক্যারিয়ার মডেল তৈরি করা। এক ধরনের শিক্ষকতা কাঠামো হতে পারে যারা শিক্ষাদান, একাডেমিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবিষয়ক গবেষণায় বিশেষায়িত হতে চান তাদের জন্য। অন্যদিকে আরেকটি কাঠামো হতে পারে গবেষণা নেতৃত্ব, প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা, গবেষণা প্রকাশনা এবং গবেষক তৈরির কাজে আগ্রহী শিক্ষকদের জন্য।
সবশেষে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষানবিশ মডেলের দিকে নিয়ে যেতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন প্রথম সেমিস্টার থেকেই অর্থায়নপ্রাপ্ত এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত হতে পারে। এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কেবল ডিগ্রিমুখী মানসিকতা থেকে বের করে প্রকৃত অনুসন্ধান, উদ্ভাবন এবং জ্ঞান সৃষ্টির পথে নিয়ে যাবে।
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বা জটিল অর্থনৈতিক মডেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নয়। এই ধরণের প্রতিযোগিতা আমাদের জন্য ভুলই বলা যায়। বাংলাদেশের রয়েছে নিজস্ব বাস্তব সমস্যা এবং নিজস্ব উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বা সেটাকে জয় করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একই সাথে যৌক্তিক, কৌশলী, কঠোর, সৃজনশীল, বাস্তবী এবং সময়োপযোগী উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, যথার্থ মনিটরিং এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবহারিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণাই হতে পারে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, কার্যকর এবং টেকসই অগ্রযাত্রার পথ।
