সুমাইয়া হাসি
জনসংযোগ সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
স্বাস্থ্যসেবার যে শাখাটি জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সংকীর্ণ সীমারেখায় কাজ করে, নিবিড় পরিচর্যা বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার তার অন্যতম প্রধান উদাহরণ। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত একজন তরুণ, শ্বাসযন্ত্রের জটিলতায় আক্রান্ত একজন প্রবীণ অথবা সংক্রমণে কাহিল একটি শিশু, এদের প্রত্যেকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেকাংশে নির্ভর করে তার নিকটস্থ হাসপাতালে একটি কার্যকর আইসিইউ আছে কি না, তার ওপর। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের সহসভাপতি ডা. শাইফুল আজম সাজ্জাদ জেলা হাসপাতালে আইসিইউ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জনবল সংকটকে মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ যথার্থ, কিন্তু সমস্যাটির পরিধি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি কেবল জনবলের প্রশ্ন নয়, বরং পরিসংখ্যান, অর্থনীতি, সুশাসন এবং পরিচালনাগত বাস্তবতার এক জটিল জালে আবদ্ধ।
আইসিইউ সংকটের বর্তমান চিত্র: সংখ্যা বাড়লেও বৈষম্য রয়ে গেছে
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল কেয়ার জার্নালে প্রকাশিত একটি জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য কোভিডবহির্ভূত নিবিড় পরিচর্যা শয্যা ছিল মাত্র ১.৭০টি, যেখানে ঢাকা জেলায় এই সংখ্যা ১২.৩২, আর ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৮টি জেলায় কোনো ক্রিটিক্যাল কেয়ার শয্যাই ছিল না।
আন্তর্জাতিক নির্দেশিকার সর্বনিম্ন মান বিবেচনা করলেও বাংলাদেশের জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন অন্তত পাঁচ হাজার আইসিইউ শয্যা, যে কথা নিউ এজ পত্রিকার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। মহামারির সময় থেকে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে বর্তমানে বাহাত্তরটি প্রতিষ্ঠানে এক হাজার তিনশো বাহাত্তরটি আইসিইউ শয্যা এবং একান্নটি প্রতিষ্ঠানে এক হাজার চুয়ান্নটি সিসিইউ শয্যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা মহামারির আগের চারশো আটানব্বই শয্যার তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
তবু দ্য অবজারভার পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী কার্যকর শয্যার পঞ্চান্ন শতাংশ, অর্থাৎ সাতশো আটান্নটি শয্যা, ঢাকার মাত্র বাইশটি হাসপাতালে কেন্দ্রীভূত। সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটলেও ভৌগোলিক বৈষম্য তাই অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
জনবল সংকট: অবকাঠামো আছে, পরিচালনার মানুষ নেই
জনবলের সংকট আরও গভীর। ২০২১ সালে সরকার চারশো নয়জন অ্যানেস্থেসিয়া কনসালট্যান্ট নিয়োগ দিলেও আলাদাভাবে আইসিইউ বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার ফিজিশিয়ান নিয়োগের কোনো সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে অনেকেই পরবর্তীতে নিজ নিজ মূল পদে ফিরে গেছেন এবং আইসিইউগুলো শূন্য বা অকার্যকর থেকে গেছে।
২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনে প্রথম স্নাতকোত্তর এমডি কোর্স চালু হলেও বছরে মাত্র চৌদ্দ থেকে আঠারোজন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান, যা আইএমসি জার্নাল অব মেডিকেল সায়েন্সে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুযায়ী দেশের প্রয়োজনীয় অন্তত ছয়শো স্নাতকোত্তর যোগ্যতাসম্পন্ন ইনটেনসিভিস্টের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের প্রধান জানিয়েছেন, দেশে প্রতি পাঁচ বছরে কেবল একশো পঞ্চাশ থেকে দুইশো জন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ তৈরি হন, কারণ এই বিশেষায়নে ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসের সুযোগ সীমিত থাকায় তরুণ চিকিৎসকদের আগ্রহ কম।
মহামারির সময় সাময়িকভাবে নিয়োজিত এক হাজারের বেশি চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের চুক্তি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার পর নবায়ন করা হয়নি, ফলে অবকাঠামো টিকে থাকলেও পরিচালনার জনশক্তি হারিয়ে গেছে।
অর্থায়ন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা
আর্থিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো সংকটের শিকড় আরও গভীরে নিয়ে যায়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী গত বিশ বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট জিডিপির এক শতাংশেরও কম থেকেছে, এবং সরকারি ও বেসরকারি মিলিত বিনিয়োগ জিডিপির ২.৩৪ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৫.১ শতাংশের অর্ধেকেরও কম।
বনিকবার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মোট সরকারি ব্যয়ের মধ্যে স্বাস্থ্যের অংশ মাত্র ১.১৯ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৪.৫৯ শতাংশের তুলনায় বহু দূরে।
এই সীমিত বরাদ্দের কারণে রোগীদের নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের অংশ মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের তিয়াত্তর থেকে চুয়াত্তর শতাংশে পৌঁছে গেছে। এই আর্থিক শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসা বেসরকারি খাত নিজেই বৈষম্যের নতুন উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিএমসিতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা নিবন্ধ অনুযায়ী দেশের মোট আইসিইউর আটাত্তর শতাংশ বেসরকারি মালিকানায়, যেখানে দৈনিক শয্যা ভাড়া পনেরো হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে এই খরচ দিনে মাত্র একশো টাকার কাছাকাছি।
জেলা পর্যায়ে বৈষম্য ও সুশাসনের সংকট
প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে অন্তত বাইশটি জেলায় সরকারি হাসপাতালে কোনো আইসিইউ সুবিধাই নেই, ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো প্রায়শই চিকিৎসার খরচ মেটাতে জমিজমা বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষজ্ঞদের অনুপস্থিতি এবং জবাবদিহিতার অভাবের মতো সুশাসনগত দুর্বলতা, যা কাঠামো নির্মাণের পরেও তা সচল রাখার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু আইসিইউ নির্মাণ কি যথেষ্ট?
কেবল পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ নির্মাণের ওপর নির্ভর করাটাই একমাত্র সমাধান কি না, তা নিয়েও ভাবার অবকাশ আছে। নিউ এজ পত্রিকার একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে স্থাপিত আইসিইউ শয্যার অর্ধেকের বেশি জনবল সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অলস পড়ে আছে।
রাজশাহী বিভাগে চুরানব্বইটি শয্যার মধ্যে প্রায় পঞ্চাশটি কার্যকর থাকলেও চুয়াল্লিশটি শয্যা জনবলের অভাবে বন্ধ থাকার কারণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর প্রবল চাপ পড়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ মাসেই আইসিইউ শয্যার অপেক্ষায় থাকা একানব্বইজন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, অবকাঠামো নির্মাণ করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না।
এমন পরিস্থিতিতে হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট, সাধারণ ওয়ার্ডে আদর্শ মাত্রার জরুরি ক্রিটিক্যাল কেয়ার প্রোটোকল, এবং বিভাগীয় বা মেডিকেল কলেজ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে ভিডিও সংযোগে পরিচালিত টেলি আইসিইউ ব্যবস্থার মতো অন্তর্বর্তী মডেলগুলো বিবেচনার দাবি রাখে।
জাতীয় আইসিইউ মান উন্নয়ন কাঠামো নথিতে উল্লেখিত হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটের ধারণা দেশে নতুন নয়। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আগে থেকেই এমন ইউনিট পরিচালিত হচ্ছে। সীমিত বিশেষজ্ঞ জনবলকে কেন্দ্রীভূত না রেখে দূরবর্তী জেলা হাসপাতালে ছড়িয়ে দেওয়ার বদলে প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই বিশেষজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার এই কৌশল বাংলাদেশের মতো জনবল ঘাটতির দেশে তুলনামূলক কম খরচে বেশি রোগীর কাছে মানসম্পন্ন সেবা পৌঁছানোর একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
পরিচালনাগত দুর্বলতা ও প্রাক হাসপাতাল সংকট
পরিচালনাগত বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত এক জাতীয় মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলোর মধ্যে মাত্র সাতাশ দশমিক তিন শতাংশ সব ইউনিটে রোগীর শয্যার মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখতে পেরেছে।
তিয়াত্তর শতাংশ হাসপাতাল কেবল প্রাথমিক বা মৌলিক পর্যায়ের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ মান অর্জন করতে পেরেছে। একই জরিপে কোনো হাসপাতালেই হাসপাতাল অর্জিত সংক্রমণ চিহ্নিতকরণের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সুবিধা জরিপ অনুযায়ী গ্রামীণ ও জেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি নগর এলাকার তুলনায় একুশ শতাংশ পিছিয়ে আছে।
সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিও একটি বড় কারণ। যেমন বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির শতবেডের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী জনবল সংকটে আশিটি শয্যা এখনো বন্ধ রয়ে গেছে, যদিও উদ্বোধনের তিন বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাক হাসপাতাল সময়ের সংকট। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা প্রায়শই অপ্রশিক্ষিত পরিবহনে দীর্ঘ সময় পার করে জেলা হাসপাতালে পৌঁছান, যার ফলে জীবন রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ঘণ্টাগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং পথেই রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে।
উপসংহার: একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রয়োজন
সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়, জেলা হাসপাতালে আইসিইউ প্রতিষ্ঠা কোনো একমাত্রিক সমস্যা নয়। কেবল জনবল নিয়োগ করলেই সমাধান আসবে না, যদি না তার সঙ্গে যুক্ত হয় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, স্বচ্ছ পদায়ন নীতি, রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা এবং সক্ষমতার ভিত্তিতে স্তরবিন্যস্ত সেবা মডেল। ডা. সাজ্জাদের প্রস্তাবিত ২০২৪ সালের জনবল কাঠামো বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে একটি জরুরি পদক্ষেপ। তবে এর সঙ্গে যদি স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা যুক্ত না হয়, তাহলে ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
যেখানে দামি যন্ত্রপাতি স্থাপিত হয়, কিন্তু তা চালু রাখার মানুষ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই অধ্যায় আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন: রাষ্ট্র তার নাগরিকের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে কতটা প্রস্তুত থাকতে চায়, এবং সেই প্রস্তুতিকে অর্থ ও অগ্রাধিকারের ভাষায় অনুবাদ করতে আদৌ কতটা ইচ্ছুক।
