আরিফ রেশহাদ
ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স, যুক্তরাজ্য
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। কোভিড ১৯ মহামারির সময় পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের হার যথাক্রমে ৪৭ শতাংশ, ৪৭ শতাংশ এবং ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছিল।
মানসিক সুস্থতার জন্য কী কী নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, সে আলোচনা প্রায়ই হয়। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন হলো, প্রতিদিনের এমন কোন অভ্যাসগুলো আমাদের অজান্তেই মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসাও মানসিক সুস্থতার অন্যতম পূর্বশর্ত।
যেসব কারণ ধীরে ধীরে ক্ষতিকর অভ্যাসে পরিণত হয়
নেতিবাচক তথ্যের অবিরাম অনুসরণ ও অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেতিবাচক খবর, সহিংসতা কিংবা উদ্বেগজনক বিষয়বস্তু দেখে যাওয়ার প্রবণতা অনেককে ভয়, হতাশা এবং ক্ষোভের এক অন্তহীন মানসিক চক্রে আটকে ফেলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে প্রতিদিন চার ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। সমস্যার মূল কারণ শুধু নেতিবাচক তথ্য দেখা নয়। এর ফলে পড়াশোনা, সৃজনশীল কাজ কিংবা বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগের মতো ইতিবাচক কর্মকাণ্ড কমে যায়। পাশাপাশি শিক্ষাজীবন ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে আগে থেকেই থাকা অনিশ্চয়তাও আরও তীব্র হয়।
গ্রাম থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে আসা অনেক শিক্ষার্থী একাকিত্ব কাটাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে সেই নির্ভরতা আরও গভীর একাকিত্বের জন্ম দেয় এবং একটি চক্র তৈরি হয়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনুভূতি চেপে রাখার সংস্কৃতি
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নিজের কষ্ট, হতাশা বা ভয় প্রকাশ না করে ভেতরে জমিয়ে রাখার প্রবণতা অনেক গভীরভাবে প্রোথিত। আন্তর্জাতিক তুলনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে আবেগ দমিয়ে রাখার প্রবণতা অনেক বেশি।
বাংলাদেশি কিশোর কিশোরীদের মধ্যে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাকেন্দ্রিক মানসিক প্রতিক্রিয়া গুরুতর মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে অনুভূতি প্রকাশ না করে দমন করার প্রবণতা সীমান্তবর্তী বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ায়। গ্রামীণ সমাজে বিষণ্নতাকে অনেক সময় “চিন্তা রোগ” হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক কারণে মানসিক কষ্ট প্রকাশকে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে অমীমাংসিত মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ কিংবা শারীরিক অসুস্থতার রূপ নিতে পারে।
বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার। সামাজিক নিয়ম তাঁদের অনুভূতি প্রকাশকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের মুখেও নীরব থাকাই সামাজিকভাবে প্রত্যাশিত আচরণে পরিণত হয়।
অতিরিক্ত কাজের চাপ
বাংলাদেশে অতিরিক্ত পরিশ্রমকে প্রায়ই পরিশ্রমী মানুষের গুণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অবিরাম কাজ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর্মরতদের মধ্যে বার্নআউটের হার প্রায় ২০ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশেরও বেশি। কিছু ক্ষেত্রে মানসিক ক্লান্তির হার ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও অনিয়মিত শিফট, পারিবারিক জীবন ব্যাহত হওয়া, বিশ্রামের অভাব, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং ঘুমের সমস্যার কারণে মানসিক চাপ বেড়ে যায়।
অর্থনৈতিক প্রয়োজন মানুষকে আরও বেশি কাজ করতে বাধ্য করে। অতিরিক্ত কাজ মানসিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে, আর দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। ফলে আয়ও কমে যায় এবং এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
বিষাক্ত সামাজিক সম্পর্ক
বাংলাদেশের যৌথ পরিবার অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সহায়তা দিলেও প্রজন্মগত প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সংঘাত থেকে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নারীরা পারিবারিক নির্যাতন কিংবা শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের শিকার হলেও পারিবারিক সম্মান ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক সময় সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না।
গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের বস্তিবাসীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় ছয় গুণেরও বেশি। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
নিয়মিত সকালের নাশতা না খাওয়া বাংলাদেশের কিশোর কিশোরীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস। জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত সকালের নাশতা এড়িয়ে যায়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড, রাস্তার খাবার এবং ফল ও শাকসবজি কম খাওয়ার প্রবণতাও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেক পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য গ্রহণও সম্ভব হয় না।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ১৭ থেকে ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের মান পূরণ করেন। যানজট, খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব, দীর্ঘ যাতায়াত, নিরাপত্তা সমস্যা এবং নগরজীবনের ব্যস্ততা নিয়মিত শরীরচর্চার বড় বাধা।
নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধকতা আরও বেশি। সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক নারী তুলনামূলকভাবে কম শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন এবং দীর্ঘ সময় বসে কাটান। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব সরাসরি মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অনিয়মিত ঘুম
কোভিড ১৯ মহামারির সময় বাংলাদেশের প্রায় ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ কিশোর কিশোরী ঘুমের সমস্যায় ভুগেছে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর ৭৩ শতাংশও কোনো না কোনো ধরনের ঘুমের ব্যাঘাতের কথা জানিয়েছে।
ঘুম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক দুই দিক থেকেই কাজ করে। কম ঘুম, অতিরিক্ত ঘুম কিংবা ঘুমের মান নিয়ে অসন্তুষ্টি, সবই বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়ায়। রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং ভোরে কাজ বা পড়াশোনার বাধ্যবাধকতা এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে।
তামাকের ব্যবহার
বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার এখনো উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ধূমপান নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিশোরদের মধ্যে যেকোনো ধরনের তামাক ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ইসকেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার লক্ষণ আরও বাড়িয়ে দেয়।
অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে আপস
অতিরিক্ত ভিড়, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ এবং নিম্নমানের আবাসনকে অনেকেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেন। পরিবার থেকে দূরে শহরে বসবাসকারী মানুষের জন্য এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয় আর্থিক সংকট, মানিয়ে নেওয়ার চাপ এবং একাকিত্ব। সব মিলিয়ে মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
একে অন্যকে শক্তিশালী করে এমন একাধিক চক্র
এই অভ্যাসগুলো আলাদা আলাদা নয়। একটির সঙ্গে আরেকটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো ঘুম নষ্ট করে। ঘুমের ঘাটতি মানসিক চাপ বাড়ায়। মানসিক চাপ মানুষকে অস্বাস্থ্যকর খাবার কিংবা তামাকের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়।
অতিরিক্ত কাজের কারণে শরীরচর্চা ও সামাজিক সম্পর্কের জন্য সময় কমে যায়। একাকিত্ব বাড়ে, বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়ে। আবেগ দমন, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক প্রত্যাশা অনেক মানুষকে ক্ষতিকর সম্পর্কের মধ্যে আটকে রাখে। অর্থনৈতিক চাপ অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে এবং একই সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার, শরীরচর্চা কিংবা সুস্থ পরিবেশ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।
নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিধিনিষেধ শারীরিক কর্মকাণ্ড সীমিত করে, নির্যাতনমূলক সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসা কঠিন করে তোলে এবং পারিবারিক মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
করণীয়
এই ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো পরিবর্তনের জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র, সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মানসিক সুস্থতার জন্য শুধু নতুন ভালো অভ্যাস গড়ে তোলাই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের জীবনে এমন যেসব অভ্যাস ধীরে ধীরে মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দূর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মানসিক চাপ ও মানসিক অসুস্থতার বোঝা ইতোমধ্যেই অনেক বেশি, সেখানে ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জনের এই পদ্ধতি মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে।
