ড. নাঈমা পারভীন
কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি, ,যুক্তরাজ্য
অংশগ্রহণের বাইরে: উৎপাদনশীল অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জ
গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন গল্প। রপ্তানি বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং শিল্প সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হলেও এই সাফল্যের পেছনে নারীর ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৬৮ শতাংশে পৌঁছায়, যা আগের দশকগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ, গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এবং শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি লাখ লাখ বাংলাদেশি নারীকে আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে এবং জাতীয় উৎপাদনে সরাসরি অবদান রাখতে সহায়তা করেছে।
তবে বাংলাদেশের সামনে এখন মূল নীতিগত প্রশ্ন আর নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারছে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, তাদের এই অংশগ্রহণ কি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় রূপান্তরিত হচ্ছে কি না। বাংলাদেশ যখন উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন নারীর উৎপাদনশীল অন্তর্ভুক্তি শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক অগ্রগতির অপরিহার্য শর্ত হয়ে উঠেছে।
নারীর কর্মসংস্থানে পরিবর্তনের যাত্রা
১৯৯০ এর দশক থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নারীর কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তৈরি পোশাক শিল্প বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীদের জন্য অভূতপূর্ব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অনেক পরিবারের জন্য নারীর আয় আর্থিক নিরাপত্তা, উন্নত পুষ্টি, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির পথ তৈরি করেছে।
এর অর্থনৈতিক সুফল শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নারীর শ্রম রপ্তানি সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধি করতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম গ্রামীণ নারীদের হাঁস মুরগি পালন, গবাদিপশু পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং আত্মকর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।
এই পরিবর্তন একটি মৌলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে: যখন অধিক সংখ্যক মানুষ উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হয়, তখন একটি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতির সম্ভাব্য আকারও সম্প্রসারিত হয়। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পেছনে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ তাই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
উৎপাদনশীলতার চ্যালেঞ্জ
এই অগ্রগতির পরও বাংলাদেশ এখন উৎপাদনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করেছে, কিন্তু শুধু অংশগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। একজন শ্রমিক কত পরিমাণ উৎপাদন করতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মূলত তার ওপর নির্ভর করে। নারী কর্মসংস্থানের একটি বড় উদ্বেগ হলো, তা এখনো সীমিত কিছু শ্রমঘন খাতে কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত বেশি। এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অসাধারণ সাফল্য এনে দিলেও একটি নির্দিষ্ট শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
উৎপাদনশীলতা তখন বৈশ্বিক চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা, মজুরি প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, অনেক নারী এখনো কম মূল্য সংযোজনকারী কাজে নিয়োজিত, যেখানে দক্ষতা উন্নয়ন ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ সীমিত। অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও ব্যাপক। নারীর অর্থনৈতিক অবদান অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকভাবে হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
কৃষিকাজ, পারিবারিক ব্যবসা, গৃহভিত্তিক উৎপাদন এবং পরিচর্যামূলক কাজে যুক্ত নারীরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও অনেক সময় তারা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, আয়ের নিরাপত্তা বা উৎপাদনশীল সম্পদের সুযোগ পান না। ফলে একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে: নারীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছেন, কিন্তু তাদের পূর্ণ উৎপাদনশীল সম্ভাবনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
নারীর উৎপাদনশীলতার পথে কাঠামোগত বাধা
নারীর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সীমিত করে এমন কয়েকটি আন্তঃসম্পর্কিত বাধা রয়েছে।
অবৈতনিক পরিচর্যার চাপ
নারীরা ঘরের কাজ, সন্তান লালনপালন এবং বয়স্কদের পরিচর্যার বড় অংশ বহন করেন। এসব অবৈতনিক কাজের কারণে তাদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং পেশাগত অগ্রগতির জন্য সময় কমে যায়। অর্থনীতিবিদরা ক্রমেই স্বীকার করছেন যে অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ শ্রম উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা।
অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও সীমিত সামাজিক সুরক্ষা
অনেক নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে মজুরি কম, আইনি সুরক্ষা সীমিত, অর্থায়নের সুযোগ কম এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও সীমাবদ্ধ। অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কর্মীদের উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দেয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথ বাধাগ্রস্ত করে।
দক্ষতার সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্য
বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে এখন ডিজিটাল দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক কাজের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক (STEM) ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। ফলে দ্রুত বিকাশমান ও উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত থাকছে।
চলাচল ও নিরাপত্তার সমস্যা
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, সহিংসতা এবং সামাজিক বাধার আশঙ্কা অনেক নারীকে নিজ এলাকার বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করে।
সম্পদ ও ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা
জমির মালিকানা, সম্পত্তির অধিকার এবং আনুষ্ঠানিক ঋণ সুবিধায় নারীর সীমিত প্রবেশাধিকার উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে। উৎপাদনশীল সম্পদের অভাবে অনেক নারী কম বিনিয়োগনির্ভর ও কম উৎপাদনশীল কাজে আটকে থাকেন।
নীতিগত করণীয়: নতুন প্রবৃদ্ধির কৌশল
গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। এখন প্রয়োজন নারীর কর্মসংস্থানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
১. পরিচর্যা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ
সাশ্রয়ী শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, কমিউনিটি কেয়ার সুবিধা এবং বয়স্কদের পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে সামাজিক ব্যয় হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এসব উদ্যোগ নারীদের শ্রমবাজারে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে এবং পরিবারের শ্রম ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে।
২. কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বৈচিত্র্যময় করা
নারী কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হিসেবে শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আর্থিক সেবা এবং উন্নত উৎপাদন খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কৌশলগত বিনিয়োগ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য উৎপাদনশীল প্রবৃদ্ধির আরও স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি করবে।
৩. প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি
কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, কোডিং প্রশিক্ষণ এবং STEM শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্বের মাধ্যমে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
৪. কর্মক্ষেত্রের মান উন্নয়ন
মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, সমান মজুরি এবং হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর বাস্তবায়ন কর্মীদের ধরে রাখা এবং পেশাগত উন্নয়নে সহায়তা করবে। উৎপাদনশীল শ্রমবাজারের জন্য এমন পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে কর্মীরা নিরাপদ ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন।
৫. আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ
সম্পত্তির অধিকার সংস্কার, ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ তৈরি করবে। নারী পরিচালিত ব্যবসার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা বড় হওয়ার পথে বেশি বাধার মুখোমুখি হন।
৬. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার যথেষ্ট নয়, যদি সামাজিক মানসিকতা নারীর সুযোগ সীমিত করে রাখে। সচেতনতামূলক প্রচার, কমিউনিটি উদ্যোগ এবং শিক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং পেশাজীবনে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। তবে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে অংশগ্রহণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে উৎপাদনশীলতানির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হতে হবে। চ্যালেঞ্জ এখন শুধু নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসা নয়, বরং তাদের দক্ষতা, প্রতিভা এবং আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা।
পরিচর্যার দায়িত্ব, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাধাগুলো দূর করতে পারলে নারীরা বাংলাদেশের উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং জাতীয় সমৃদ্ধির আরও শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারবেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কত সংখ্যক নারী কাজ করছেন তার ওপর নয়, বরং তারা কতটা উৎপাদনশীল, নিরাপদ এবং সমান সুযোগের সঙ্গে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছেন তার ওপর।
তথ্যসূত্র
Bangladesh Bureau of Statistics (BBS). (2023). Labour Force Survey 2022. Dhaka: Government of Bangladesh.
International Labour Organization (ILO). (2024). Women in the Labour Market and Economic Development in Bangladesh. Geneva: International Labour Organization.
Kabeer, N. (2012). Women’s Economic Empowerment and Inclusive Growth: Labour Markets and Enterprise Development. International Development Research Centre.
Mahmud, S., Shah, N. M., & Becker, S. (2012). Measurement of women’s empowerment in rural Bangladesh. World Development, 40(3), 610–619.
Rahman, R. I., & Islam, R. (2013). Female Labour Force Participation in Bangladesh: Trends, Drivers and Barriers. Bangladesh Development Studies, 36(4), 1–34.
World Bank. (2023). Bangladesh Development Update: New Frontiers in Poverty Reduction. Washington, DC: World Bank.
World Economic Forum. (2024). Global Gender Gap Report 2024. Geneva: World Economic Forum.
United Nations Development Programme (UNDP). (2023). Human Development Report 2023/24. New York: United Nations Development Programme.
Asian Development Bank. (2023). Bangladesh: Promoting Gender-Inclusive Growth. Manila: Asian Development Bank.
Organisation for Economic Co-operation and Development (OECD). (2023). Gender Equality and Economic Growth: Policy Perspectives. Paris: OECD.
