ওয়াহিদুল ইসলাম
ডিটেক বাংলাদেশ
প্রবৃদ্ধি ও বিদ্যমান ঘাটতি
গত দুই দশকে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ সুবিধার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। ২০০৫ সালে যেখানে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ছিল ২০ লাখেরও কম, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৮ কোটি ৮০ লাখের বেশি হয়েছে। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০১৮ সালের প্রায় ২৫.৬ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৪৪.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৮ সালে চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল সেবা চালু এবং ২০২৪ সালে ঢাকায় পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে গভীর কাঠামোগত বৈষম্য। টেলিযোগাযোগের সম্প্রসারণ মূলত মোবাইলনির্ভর ও শহরকেন্দ্রিক হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি অপারেটরদের এমন একটি নীতিপরিবেশের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে রাজস্ব আহরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী ব্রডব্যান্ড সংযোগের বিস্তার এখনো অত্যন্ত সীমিত। গ্রামীণ এলাকার শেষ প্রান্তের সংযোগব্যবস্থা গুরুতরভাবে দুর্বল। প্রযুক্তিগত সংমিশ্রণের পরিবর্তন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়ন্ত্রক কাঠামোও আধুনিকায়ন করা যায়নি।
যে সরকারি পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল, কিন্তু নেওয়া হয়নি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতাগুলোর একটি হলো একটি সুসংহত ও আধুনিক তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা নীতির অনুপস্থিতি। ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সরকার তরঙ্গকে মূলত রাজস্ব আহরণের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করেছে। উচ্চমূল্যের তরঙ্গ ফি আরোপ এবং এমন শর্তে নিলাম আয়োজন করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্ক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে। পুরোনো প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত তরঙ্গ নতুন প্রজন্মের নেটওয়ার্কে পুনর্বণ্টনের জন্য যে তরঙ্গ পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত জরুরি, তা এখনো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে অপারেটরদের খণ্ডিত ও অপর্যাপ্ত তরঙ্গের ওপর নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করতে হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নেটওয়ার্কের মান এবং বিস্তারের ওপর।
টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর আরোপিত করব্যবস্থাও সমানভাবে ক্ষতিকর হয়েছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতে অপারেটর ও গ্রাহক উভয়ের ওপরই উচ্চমাত্রার খাতভিত্তিক কর আরোপ করা হয়। মোবাইল সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক, ইন্টারনেট ব্যবহারে মূল্য সংযোজন কর এবং অন্যান্য খাতের তুলনায় টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের ওপর অধিক হারে কর আরোপের ফলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে পুনর্বিনিয়োগের জন্য যে মূলধন প্রয়োজন, তার একটি বড় অংশ বেরিয়ে যাচ্ছে।
টেলিযোগাযোগকে একটি অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে যেখানে কর প্রণোদনা দেওয়ার কথা, সেখানে সরকার খাতটিকে অনেকটা নিশ্চিত রাজস্বের উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছে। এর ফলে একদিকে বিনিয়োগ কমেছে, অন্যদিকে গ্রাহকের ব্যয় বেড়েছে।
লাইসেন্স সংস্কারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে। লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে অস্বচ্ছ, অনিশ্চিত এবং প্রক্রিয়াগতভাবে স্বেচ্ছাচারী হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা দেশীয় ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বৈশ্বিক সর্বোত্তম চর্চার তুলনায় বাংলাদেশে লাইসেন্সের মেয়াদও তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি প্রযুক্তি নিরপেক্ষতার নীতি এখনো কার্যকরভাবে গ্রহণ করা হয়নি। এই নীতির আওতায় অপারেটররা তাদের বরাদ্দকৃত তরঙ্গ ব্যবহার করে উপযুক্ত যেকোনো অনুমোদিত প্রযুক্তি স্থাপনের স্বাধীনতা পেয়ে থাকে।
অবকাঠামো ভাগাভাগির বিষয়টিও এখনো যথাযথভাবে নীতির আওতায় আনা হয়নি। অথচ টাওয়ার, ফাইবারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো যৌথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক স্থাপনের ব্যয় কমানো এবং গ্রামীণ এলাকায় দ্রুত সংযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন তুলনীয় বাজারে এমন ব্যবস্থা কার্যকর ফল দিয়েছে।
সর্বজনীন সেবা নিশ্চিত করার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও অর্থায়নে ব্যর্থতা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘাটতিগুলোর একটি। গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে ব্রডব্যান্ড সংযোগ পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এমন কাঠামো গড়ে তোলার আইনগত ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শেষ প্রান্তের সংযোগ সম্প্রসারণ অনেকাংশে বেসরকারি অপারেটরদের বাণিজ্যিক হিসাবের ওপর নির্ভরশীল। অথচ গ্রামীণ এলাকায় নেটওয়ার্ক স্থাপনের আর্থিক লাভ অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়।
নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা রয়েছে। টেলিযোগাযোগ, সম্প্রচার ও ইন্টারনেট সেবা প্রযুক্তিগতভাবে ক্রমশ একীভূত হয়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনো পৃথক এবং অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা বিদ্যমান। এই সমন্বিত ডিজিটাল পরিবেশ পরিচালনার জন্য কোনো একক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে একাধিক প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ারের সংঘাত, নীতিগত অসংগতি এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন উভয়ের ওপর।
এখন যে সংস্কারগুলো অপরিহার্য
প্রথমত, তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় তরঙ্গ নিলাম ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এর সঙ্গে থাকতে হবে যৌক্তিক প্রাথমিক মূল্য, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ লাইসেন্স এবং অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত তরঙ্গকে চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্কে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস কর্মসূচি। তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে রাজস্ব আহরণের পরিবর্তে শিল্পনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে এর ভূমিকা বিবেচনা করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর করের চাপ আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। মোবাইল সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর মূল্য সংযোজন কর বাতিল অথবা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের করহার সাধারণ করহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার। খাতটি থেকে কর হিসেবে নেওয়া প্রতিটি টাকা নেটওয়ার্কের টাওয়ার, ফাইবার এবং গ্রামীণ সংযোগ সম্প্রসারণে বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
তৃতীয়ত, লাইসেন্স ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো, নবায়নের স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণ এবং প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্তত ২০ বছরের লাইসেন্স মেয়াদ এবং সুস্পষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত নবায়ন প্রক্রিয়া থাকলে অপারেটররা দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী বিনিয়োগের পরিকল্পনা করতে আরও বেশি নিশ্চয়তা পাবেন।
চতুর্থত, বাধ্যতামূলক ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা সর্বজনীন সেবা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিল্প খাতের ওপর স্বচ্ছ পদ্ধতিতে আরোপিত নির্দিষ্ট চাঁদার মাধ্যমে এই তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এরপর প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। গ্রামীণ সংযোগকে শুধু বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বর্তমান পদ্ধতি যে কার্যকর হয়নি, তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
পঞ্চমত, সক্রিয় অবকাঠামো ভাগাভাগির জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। টাওয়ার, ফাইবার এবং তরঙ্গ ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মূলধনী ব্যয় কমবে। একই এলাকায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের অযৌক্তিক পুনরাবৃত্তিও কমানো সম্ভব হবে।
ষষ্ঠত, নিয়ন্ত্রক কাঠামো পুনর্গঠন করে টেলিযোগাযোগ, সম্প্রচার ও ডিজিটাল সেবার জন্য একটি স্বাধীন ও সমন্বিত নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক নির্দেশনা থেকে স্বাধীন রাখতে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়োগের পরিবর্তে প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন জনবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে।
সপ্তমত, দেশের ইন্টারনেট বিনিময় কেন্দ্রগুলোর সম্প্রসারণ ও ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। বর্তমানে নিবন্ধিত নেটওয়ার্কের মাত্র ৭.৫ শতাংশ জাতীয় বিনিময় কেন্দ্রগুলোতে পারস্পরিক সংযোগ স্থাপন করেছে। ফলে দেশের অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট তথ্যপ্রবাহ আন্তর্জাতিক সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে ব্যয় ও তথ্য পৌঁছাতে সময় দুটিই বাড়ছে, পাশাপাশি নেটওয়ার্কের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেটওয়ার্কগুলোর পারস্পরিক সংযোগকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেওয়া এবং বিষয়বস্তু সরবরাহ নেটওয়ার্ক আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
অষ্টমত, উপগ্রহভিত্তিক সংযোগ, বিশেষ করে সম্ভাব্য স্টারলিংক সেবা চালুর বিষয়টি একটি সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে একই সঙ্গে স্থলভিত্তিক অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা বিদ্যমান অপারেটরদের বাণিজ্যিক সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এই সংস্কারের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার মতো প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামোর তুলনায় দেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে টেলিযোগাযোগ খাত জাতীয় উন্নয়নের সহায়ক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে উন্নয়নের পথে একটি স্থায়ী বাধা হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ শুধু নতুন প্রযুক্তি চালুর ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি নীতিকাঠামো, যা বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সংযোগ পৌঁছে দেওয়াকে উন্নয়নের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করবে।
