নাহিদ চৌধুরী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ যেন হাঁসফাঁস করছে। ১৪ আগস্ট ২০২৬ সন্ধ্যায় সামিট এলএনজি টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু করে। প্রথমে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয় এবং শনিবার ভোর নাগাদ তা প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছানোর কথা ছিল। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের মধ্যে এই সরবরাহ কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে স্বস্তি সাময়িক। বরং এই ঘটনাই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
একটি টার্মিনাল ২৪ ঘণ্টারও কম সময় বন্ধ থাকলেই দেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, সরবরাহ সামান্য বাড়িয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়।
সংকটের শিকড় কোথায়
বাংলাদেশের গ্যাস সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের কাঠামোগত অবহেলা। একসময় দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ছিল তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়েনি। পরপর বিভিন্ন সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের চেয়ে বিদ্যমান মজুতের ব্যবহারকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
গ্যাসের মজুত কমে আসার বিষয়টি যখন আর অস্বীকার করার উপায় থাকল না, ততদিনে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান এতটাই বেড়ে গেছে যে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র দিয়ে তা পূরণ করা আর সম্ভব হচ্ছিল না।
প্রয়োজনের তাগিদে আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দিকে ঝুঁকেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই ব্যবস্থাও তৈরি করেছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। মহেশখালীর উপকূলে দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। সামিট গ্রুপ ও এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এসব ইউনিটের মাধ্যমে এলএনজি গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বিকল্প সক্ষমতা খুবই সীমিত।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সামিটের ইউনিটে এলএনজি শেষ হয়ে গেলে সরবরাহ দ্রুত কমে যায়। একই সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনালও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল না। দুটি স্থাপনায় আংশিক সমস্যা দেখা দেওয়াই পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। ফলে যে অবকাঠামোকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সেখানে কার্যত একটি একক নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এলএনজি আমদানির অর্থায়ন ব্যবস্থাও সংকটকে আরও গভীর করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনশীল খোলা বাজার থেকে বাংলাদেশকে এলএনজি কিনতে হয় এবং এর জন্য তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে গেলে সময়মতো এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থ পরিশোধে বিলম্ব সরাসরি সরবরাহে বিলম্ব ঘটায়। ফলে চলতি সপ্তাহের সংকট কোনো প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের কারণে নয়, বরং সময়মতো এলএনজি কার্গো দেশে না আসার কারণেও তৈরি হয়েছে।
সামিটের সরবরাহ পুনরায় চালুর প্রভাব
সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়া আপাতত পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে সরবরাহ ৫৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার ওপর চাপ কিছুটা কমবে। গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে এই দুই খাতেই দ্রুত এবং দৃশ্যমান ক্ষতি হয়।
কারিগরি ও সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরবরাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার সামিটের উদ্যোগ একটি দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক পদক্ষেপ। একই সঙ্গে সংকটের সময়ে জাতীয় গ্রিড সচল রাখতে বেসরকারি খাতের পরিচালকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তবে সরবরাহ পুনরুদ্ধার মূল সমস্যার সমাধান নয়। এটি সংকটের উপসর্গ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র। পুরো ব্যবস্থা এখনো এমন অবস্থায় রয়েছে যে আরেকটি এলএনজি কার্গো সময়মতো না এলেই একই ধরনের সংকট আবার দেখা দিতে পারে।
তাৎক্ষণিকভাবে যা করতে হবে
স্বল্পমেয়াদে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এলএনজি ক্রয় চুক্তির কাঠামো এমনভাবে সাজানো, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা থাকলেও ন্যূনতম পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। শুধু খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনার ওপর নির্ভর না করে একাধিক রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করা প্রয়োজন। এতে সরবরাহের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে এবং বর্তমান ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা কমবে।
দ্বিতীয়ত, দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটের মধ্যে চুক্তিগত ও পরিচালনাগত সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে হবে। একটি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা কারিগরি ত্রুটির সঙ্গে যেন অন্য টার্মিনালের সরবরাহ সংকট একই সময়ে না ঘটে, সে জন্য কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর সামগ্রিক চাপ থাকলেও এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধকে সেই চাপ থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
কারণ এলএনজি কার্গো কেনার অর্থ বিলম্ব করে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যায়, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে অর্থনীতির ক্ষতি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের পথে
টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশের বিদ্যমান জ্বালানি উৎস ও অবকাঠামো উভয় ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনতে হবে। স্থলভিত্তিক একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। ভাসমান টার্মিনালের তুলনায় স্থলভিত্তিক অবকাঠামো আবহাওয়া ও সমুদ্রপথের বিঘ্নের তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকে।
একই সঙ্গে গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন জরুরি। সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো একটি স্থানে সমস্যা দেখা দিলে যাতে তার প্রভাব পুরো দেশে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য বিকল্প সঞ্চালন পথ ও পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
দেশের সমুদ্রসীমায় এখনো পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়নি। সমুদ্রভিত্তিক নিজস্ব গ্যাসের সম্ভাবনাও তাই নতুন করে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন। কোনো আমদানি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব গ্যাসের বিকল্প হতে পারে না।
গ্যাসের বাইরেও আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে বাংলাদেশের দ্রুত সরে আসা প্রয়োজন। দেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা যথেষ্ট। এই খাতে আরও শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও ভবনে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উন্নত মানদণ্ড চালু করা গেলে গ্যাসের ওপর সামগ্রিক চাহিদার চাপ কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি কৌশলে গ্যাসকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্বর্তীকালীন জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে বর্তমানের জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার পথও তৈরি হবে।
সংকটের প্রকৃত শিক্ষা
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্যাস সংকট কেবল সরবরাহের ঘাটতির গল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতার ঘাটতি।সামিটের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ পুনরায় চালু হও য়ায় বাংলাদেশ আপাতত কিছুটা সময় পেয়েছে। কিন্তু সেই সময় কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা।
বাংলাদেশ কি বারবার সাময়িক সংকট সামাল দেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, এখন মূল প্রশ্ন সেটিই।
