রিমশা সিথি
নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষার্থীর সাফল্যকে মূলত পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে বিচার করে এসেছে। পরীক্ষার ফল সহজে পরিমাপ করা যায় এবং প্রশাসনিকভাবেও তা সুবিধাজনক। কিন্তু আজীবন শেখার যে মানসিকতা প্রয়োজন, তা গড়ে তুলতে পরীক্ষার ফল একা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে নম্বর বা গ্রেডের জন্য নয়, নিছক জানার আগ্রহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল থেকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেক পিছিয়ে। দেশের অধিকাংশ স্কুল ও কলেজে এই অভ্যাস প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের অভাবের চেয়ে শিক্ষা কাঠামো ও পাঠদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাই বেশি দায়ী।
শিক্ষাক্রম সংস্কার নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে যে ভৌত ও ডিজিটাল অবকাঠামো প্রয়োজন, গ্রন্থাগার, সহজলভ্য বইয়ের সংগ্রহ, ডিজিটাল বইয়ের ভাণ্ডার এবং পাঠের উপযোগী পরিবেশ, সেসব বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ ও বিনিয়োগ দেখা গেছে। বড় পরিসরে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে এই ঘাটতিগুলো দূর করা জরুরি। এই আলোচনার ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যেই এই নিবন্ধ।
পরীক্ষার বাইরেও গ্রন্থাগার কেন গুরুত্বপূর্ণ
একটি কার্যকর বিদ্যালয় গ্রন্থাগার শুধু পাঠ্যবইয়ের বিকল্প নয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা গল্প, জীবনী, ইতিহাস ও সাধারণ জ্ঞানের নানা বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়, যেসব বিষয় আনুষ্ঠানিক পাঠ্যসূচিতে অনেক সময় পর্যাপ্তভাবে থাকে না। এর মাধ্যমে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বাইরে শব্দভাণ্ডার, পাঠবোধ এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা গড়ে ওঠে।
দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও বই পড়ার সুযোগ তৈরিতে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্বল্পমূল্যে বই বিতরণ, বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার পরিচালনা এবং গল্প বলার আয়োজনের মাধ্যমে তারা শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিশুদের কল্পনাশক্তি ও ভাষাগত দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করছে। কিছু স্কুল আরও এক ধাপ এগিয়ে ছোট ও বড় শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পাঠকক্ষের ব্যবস্থা করেছে, যাতে বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত সম্পর্ক তৈরি হয়।
বিদ্যালয় গ্রন্থাগারের বর্তমান চিত্র
বাস্তবে দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই মান থেকে অনেক দূরে। বাংলাদেশে স্কুল ও কলেজের গ্রন্থাগার নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন মূল্যায়নে অবকাঠামো, পাঠের পরিবেশ, বইয়ের সংগ্রহ এবং গ্রন্থাগারিকদের দক্ষতার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ঘাটতি উঠে এসেছে। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার থেকে পাওয়া সুযোগ নিয়ে সন্তুষ্ট নয়।
অনেক স্কুলে গ্রন্থাগার নামেই আছে। সেখানে পুরোনো বইয়ে ভর্তি একটি কক্ষ থাকে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু আবিষ্কার করার মতো প্রাণবন্ত পাঠপরিবেশ থাকে না। বিভিন্ন গবেষণায় পর্যাপ্ত ও শব্দমুক্ত পাঠের জায়গা, প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারিক, হালনাগাদ তথ্য ও রেফারেন্স বই এবং ইন্টারনেট সংযুক্ত কম্পিউটারের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসব সুবিধা এখনও সর্বত্র নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠেনি।
পাঠাভ্যাসের কৌশল ছাড়া শিক্ষাক্রম সংস্কার কতটা কার্যকর
২০২৪ সালের শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের পর শিক্ষাক্রম সংশোধনের ক্ষেত্রে ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর পুনর্বিন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলা, ইংরেজি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক পাঠ্যবইয়ে গণআন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষগুলোতেও আরও কিছু পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতিহাসের যথাযথ উপস্থাপন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। তবে শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি প্রবণতাও এখানে স্পষ্ট হয়। পাঠ্যক্রমে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর পুনর্বিন্যাসকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য সমান গুরুত্ব দিয়ে কোনো সুসংগঠিত কৌশল নেওয়া হয়নি।
একটি শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের সঠিক ইতিহাস শেখাতে পারে। কিন্তু শুধু পাঠ্যসূচির মাধ্যমে আনন্দের জন্য বই পড়া, কৌতূহল থেকে পড়া কিংবা সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করা যায় না। শিক্ষার এই দ্বিতীয় লক্ষ্যটিও সমান প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মনোযোগের ইঙ্গিত
বিষয়টি এখন দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আলোচনায় আসছে। বর্তমান সরকারপ্রধান শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এমন বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটির গুরুত্ব সম্পর্কে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কোনো সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগের প্রথম ধাপ হিসেবে এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সচেতনতা এখনও পর্যাপ্ত অর্থায়নসহ দেশব্যাপী সমন্বিত কর্মসূচিতে রূপ নেয়নি। গ্রন্থাগার নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন মূল্যায়নে যে ঘাটতিগুলো উঠে এসেছে, তার তুলনায় বর্তমান মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উদ্যোগগুলোকে একটি সমন্বিত গ্রন্থাগার উন্নয়ন কৌশল বলা কঠিন।
পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দক্ষতার সঙ্গে চলছে এবং শিক্ষাক্রম সংশোধনের কাজও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ গ্রন্থাগারের জায়গা, দক্ষ জনবল এবং ডিজিটাল সুবিধার ঘাটতি দূর করছে না। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার এখনও কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের কাজে আসছে না।
ডিজিটাল পাঠের প্ল্যাটফর্ম ও ই বইয়ের সুযোগ গ্রামাঞ্চল এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব সুবিধা এখনও বিচ্ছিন্নভাবে রয়েছে, সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশের গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, তারা ডিভাইস মূলত বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্যই বেশি ব্যবহার করে। কাঠামোবদ্ধ শিক্ষামূলক অ্যাপের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম। ফলে শুধু মোবাইল, কম্পিউটার বা ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ালেই পাঠাভ্যাস তৈরি হবে না। শিক্ষার্থীরা কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, তার জন্য সুস্পষ্ট পাঠ পরিকল্পনা ও শিক্ষক নির্দেশনা প্রয়োজন।
আরও কী করা প্রয়োজন
এ ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রতিটি স্কুল ও কলেজের জন্য ন্যূনতম গ্রন্থাগার মান নির্ধারণ করতে হবে। সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ পাঠের জায়গা, প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারিক এবং নিয়মিত হালনাগাদ বইয়ের সংগ্রহ থাকা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এই মান পূরণের সঙ্গে সরকারি অর্থায়নকে যুক্ত করতে হবে। শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগের ওপর গ্রন্থাগার উন্নয়ন ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাক্রমে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্দিষ্ট বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী বইয়ের তালিকা, বই পড়ার পর পর্যালোচনা লেখা এবং সপ্তাহে নির্দিষ্ট পাঠের সময় রাখা যেতে পারে। বই পড়াকে শুধু সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে দেখলে চলবে না। কারণ ব্যক্তিগত শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিংবা অতিথি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে সবার কাছে সমান সুযোগ পৌঁছাবে না।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জাতীয় ডিজিটাল গ্রন্থাগার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই সেখানে উপযোগী বই ও পাঠসামগ্রী থাকতে পারে। তবে শুধু ডিজিটাল বইয়ের সুযোগ তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। শিক্ষকরা কীভাবে শিক্ষার্থীদের সেই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে উৎসাহিত করবেন এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে ডিজিটাল পাঠকে কীভাবে যুক্ত করবেন, তার জন্যও কাঠামোবদ্ধ নির্দেশনা প্রয়োজন। কারণ শুধু বই সহজলভ্য হলেই পাঠাভ্যাস তৈরি হয় না; তার সঙ্গে পরিকল্পিত শিক্ষাক্রমের সংযোগও জরুরি।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে একটি প্রকৃত পাঠসংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই আমাদের হাতে রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কাজ করছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ছে এবং ডিজিটাল অবকাঠামোও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
যা এখনও অনুপস্থিত, তা হলো এসব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার সুস্পষ্ট নীতি। ন্যূনতম গ্রন্থাগার মান, শিক্ষাক্রমে নিয়মিত বই পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় এবং একটি কার্যকর ডিজিটাল গ্রন্থাগারকে একসঙ্গে নিয়ে অর্থায়নসহ একটি জাতীয় কর্মসূচি তৈরি করা প্রয়োজন।
বিচ্ছিন্ন কিছু ভালো উদ্যোগ কিংবা পরীক্ষামূলক প্রকল্প দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পাঠসংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু ভালো পরীক্ষার্থী তৈরি করা নয়, এমন পাঠক তৈরি করা, যারা কৌতূহল থেকে পড়বে, প্রশ্ন করবে, নিজের মতো করে ভাববে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শেখার আগ্রহ ধরে রাখবে।
