শেখ সেলিম
জুনের শুরুতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর কাছে বাংলাদেশের নতুন আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক আবেদন এবং ৪ জুন আইএমএফের সেই আবেদন গ্রহণ দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সরকারি কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের পথে একটি সক্রিয় উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ করলে দেশের মুদ্রানীতি, প্রবৃদ্ধির গতিপথ এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে।
বিদ্যমান কর্মসূচি সম্পন্ন না করে একটি নতুন কর্মসূচির অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত রাজস্ব শৃঙ্খলা, নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বৈদেশিক নির্ভরতার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। একইভাবে, আইএমএফের এই প্রস্তাব গ্রহণের সিদ্ধান্তও সমানভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
অসমাপ্ত একটি কর্মসূচির প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ), এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএফএফ) এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় একটি কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। প্রথমে এর পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা পরে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। এই অর্থের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হয়েছে। ফলে এখনও ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত হয়নি।
অবশিষ্ট অর্থ ছাড় না হওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়। আইএমএফ ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়কে রাজস্ব আহরণ সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের মতো নির্ধারিত শর্ত পূরণের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। কিন্তু এসব শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল না। পূর্ববর্তী কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি পূরণের পরিবর্তে সরকার পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার যুক্তি দেখিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি কর্মসূচির আবেদন করেছে। স্বল্পমেয়াদে এই কৌশল বাস্তবসম্মত মনে হলেও এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার গ্রহণে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আইএমএফ কেন এই প্রস্তাব গ্রহণ করল।
চাপের মুখে মুদ্রানীতি
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে দেশের মুদ্রানীতিতে। বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রানীতি পরিবেশ ইতোমধ্যেই তীব্র চাপে রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছায়। এর পেছনে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ তার তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছে যায়, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশেরও বেশি বেশি। এপ্রিল মাসে সরকার জ্বালানির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ায়, যা পরিবার ও উৎপাদন খাত উভয়ের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করে। খুব সম্ভবত নতুন আইএমএফ কর্মসূচিতে আরও কঠোর মুদ্রানীতি, সুদের হার নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করার মতো শর্ত থাকবে।
দীর্ঘমেয়াদে এসব পদক্ষেপ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী হতে পারে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে, যখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বিনিয়োগের গতি দুর্বল, তখন এসব পদক্ষেপ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও সংকুচিত করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, কিন্তু একই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহও সচল রাখা। অতিরিক্ত কঠোর আইএমএফ শর্ত এই দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করতে পারে।
ঝুঁকির মুখে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে এটি ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। সরকারি লক্ষ্য এবং স্বাধীন পূর্বাভাসের এই ব্যবধানই বর্তমান চ্যালেঞ্জের গভীরতা তুলে ধরে।
বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ শতাংশ। উচ্চ ঋণব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে সীমিত করে রেখেছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু ইরান যুদ্ধজনিত সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় এই শিল্পও চাপে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের দাম বেড়েছে এবং আগামী মৌসুমে কাজের অর্ডার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় নতুন আইএমএফ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রাজস্ব সংযম বা ব্যয় সংকোচনের শর্তগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সরকার যখন সম্প্রসারণমূলক বাজেট ঘোষণা করেছে, তখন দ্রুত আর্থিক সংকোচন জনবিনিয়োগকে সীমিত করতে পারে। অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন যে আইএমএফের কিছু শর্ত বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিফলন হলেও এটি আরেকটি ঝুঁকির দিকও নির্দেশ করে। ইতিহাস বলে, যে আইএমএফ কর্মসূচির পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকে না, সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে অর্থছাড় এবং সংস্কার দুটোই বাধাগ্রস্ত হয়।
জাতীয় ঋণ: বাড়তি বোঝা, কমে আসছে নিরাপত্তা
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঋণভার। ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ২০২৪ সালেও বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করেছিল। সে সময় ঋণের পরিমাণ মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ ছিল। তবে চলমান ইরান যুদ্ধ, বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বাড়তি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ সেই নিরাপত্তার পরিসরকে ক্রমশ সংকুচিত করছে।
আইএমএফ নিজেও সতর্ক করেছে যে চলমান সংঘাত বিশ্বব্যাপী ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফ কেন এই প্রস্তাব গ্রহণ করল।
নতুন কর্মসূচি শর্তসাপেক্ষে হলেও বাংলাদেশের বৈদেশিক দায় আরও বাড়াবে। মূল প্রশ্ন হলো, কর্মসূচির আওতায় প্রস্তাবিত রাজস্ব সংস্কার কি যথেষ্ট রাজস্ব বৃদ্ধি করতে পারবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ ও রাজস্বের অনুপাত কমে আসে। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের একটি কাঠামোগত সমস্যা। আইএমএফও নতুন কর্মসূচির পূর্বশর্ত হিসেবে বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। করব্যবস্থা, কাস্টমস প্রশাসন এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতায় কার্যকর সংস্কার না হলে নতুন ঋণ কেবল এমন একটি চক্রকে শক্তিশালী করবে, যেখানে ঋণ পরিশোধের চাপ উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে সংকুচিত করে।
একটি সংকটময় মোড়ে প্রকৃত সংস্কারের প্রয়োজন
বাংলাদেশের নতুন আইএমএফ কর্মসূচির আবেদনকে সরাসরি ব্যর্থতার লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সংকট এবং মহামারি-পরবর্তী আর্থিক চাপে বিপর্যস্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বহুপাক্ষিক সহায়তা চাওয়া একটি যৌক্তিক নীতিগত পদক্ষেপ। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো আবেদনটির ধরন, এর পেছনের প্রেরণা এবং সেটি গ্রহণের প্রক্রিয়া।
একটি অসমাপ্ত কর্মসূচি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নমনীয় নতুন কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হওয়া, একই সঙ্গে সংস্কার শর্তগুলোর উপযোগিতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলা, বিনিয়োগকারী, বাণিজ্য অংশীদার এবং ভবিষ্যৎ ঋণদাতাদের কাছে দেশের নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করতে পারে। আইএমএফ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট করেছে যে যেকোনো নতুন কর্মসূচিকে শক্তিশালী নীতিগত প্রতিশ্রুতি এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে।
অতএব, বাংলাদেশের নতুন কর্মসূচির সাফল্য কেবল নমনীয়তার ওপর নির্ভর করবে না। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই প্রবৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি একটি প্রকৃত জাতীয় অঙ্গীকার।
