শেখ সেলিম
ভূমিকা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর অধিকাংশ উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর ও অস্তিত্বহীন অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। “বাস্কেট কেস” শব্দবন্ধটির উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সে সময়কার হতাশাজনক দৃষ্টিভঙ্গি তাতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। পাঁচ দশক পরে সেই পূর্বাভাস অনেকটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশটি ২০১৫ সালের মধ্যে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করে এবং সাম্প্রতিক প্রতিকূলতা শুরুর আগে গড়ে বার্ষিক প্রায় ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে (বিশ্বব্যাংক, ২০২৪)।
এই নিবন্ধে হ্যারড ডোমার, ম্যালথুসীয় এবং সলো প্রবৃদ্ধি মডেলের নিরিখে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কোথায় এসব মডেলের পূর্বাভাস সত্য হয়েছে এবং কোথায় ব্যর্থ হয়েছে তা পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি এই বিস্তৃত বিতর্কেরও অনুসন্ধান করা হয়েছে যে বাংলাদেশের এই যাত্রা প্রকৃতপক্ষে একটি “উন্নয়ন বিস্ময়” (মাহমুদ, আহমেদ ও মহাজন, ২০০৮) নাকি কাঠামোগত অভিসৃতির (কনভার্জেন্স) একটি অপেক্ষাকৃত অনুমানযোগ্য দৃষ্টান্ত (বেয়ার ও ওয়াকার, ২০২৩)।
হ্যারড ডোমার দৃষ্টিকোণ: সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও পুঁজি সংগ্রহ
হ্যারড (১৯৩৯) ও ডোমার (১৯৪৬) স্বাধীনভাবে যে মডেল প্রণয়ন করেছিলেন, তাতে বলা হয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে সঞ্চয়ের হার ও পুঁজির উৎপাদনশীলতার ওপর, যা g = s/v সমীকরণে প্রকাশিত। এখানে g হলো প্রবৃদ্ধি, s সঞ্চয়ের অনুপাত এবং v হলো প্রান্তিক মূলধন-উৎপাদন অনুপাত। তাই লক্ষ্যমাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জনে দেশগুলোকে যথেষ্ট সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতে হয়, একই সঙ্গে পুঁজিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়।
বাংলাদেশের প্রাথমিক দশকগুলো এই কাঠামোর সঙ্গে সহজে খাপ খায়নি। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে দেশীয় সঞ্চয় ছিল অত্যন্ত কম, ফলে বিদেশি সাহায্যের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা তৈরি হয়, যা দাতাগোষ্ঠীর অস্থিরতা ও শর্তসাপেক্ষতার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। ১৯৭২ সালে মোট পুঁজি গঠন ছিল জিডিপির প্রায় ৭.৮ শতাংশ, যা পরবর্তীতে ধীরে বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতার পরের প্রথম দুই দশকে প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ৩.৭ শতাংশ, যা এই নিম্ন পুঁজি গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ (মাহমুদ, আহমেদ ও মহাজন, ২০০৮)।
তবে এই মডেল শ্রমঘন শিল্প, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের অবদান যথাযথভাবে পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়। আমিন, সামিয়া ও খান (২০২৪) ১৯৮০ থেকে ২০১৯ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখান, মডেলটি সম্প্রসারিত করার পর সঞ্চয়ের প্রভাব পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থহীন হয়ে পড়ে, যা মডেলের মূল অনুমান, অর্থাৎ সঞ্চয়ই স্বতন্ত্রভাবে প্রবৃদ্ধি চালায়, তার বিপরীত প্রমাণ দেয়। ১৯৮০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের পোশাক খাত তুলনামূলক অল্প পুঁজি নিয়ে বিস্ফোরণাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা কঠোর অর্থে পুঁজি সংগ্রহের বদলে উদ্বৃত্ত শ্রমনির্ভর কৌশলের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ (ইসলাম, ২০২৩)।
২০২৪ সালের মধ্যে মোট পুঁজি গঠন জিডিপির প্রায় ৩১ শতাংশে পৌঁছায়। তবে শুধু সংখ্যার চেয়ে ধারাক্রম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রম সংগঠন ও রপ্তানিমুখী নীতি আগে এসেছিল, যা যুক্তিসঙ্গতভাবে পরবর্তী পুঁজি গভীরতার পথ প্রশস্ত করে, উল্টোটা নয়। হ্যারড ডোমার কাঠামো এই ধরনের ধারাক্রম অনুমান করতে পারেনি। ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি মূলত উপাদান সংগ্রহনির্ভর ছিল, যেখানে মোট উপাদান উৎপাদনশীলতার (টিএফপি) অবদান ছিল সামান্য। এতে বোঝা যায়, শুধু পুঁজির পরিমাণ নয়, বরং দক্ষতার উন্নতিই পরবর্তী প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছিল।
ম্যালথুসীয় চ্যালেঞ্জ
ম্যালথাসের (১৭৯৮) তত্ত্ব অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি খাদ্য ও সম্পদের সরবরাহকে ছাড়িয়ে যাবে। ঘনবসতি ও সীমিত কৃষিজমির কারণে দীর্ঘদিন এই তত্ত্বকে বাংলাদেশের কাঠামোগত ঝুঁকির নির্ধারক মনে করা হতো। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্যই মনে হয়েছিল, কারণ তখন খাদ্য নিরাপত্তা ছিল অনিশ্চিত এবং জনসংখ্যা বার্ষিক ২.৫ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পরবর্তী অভিজ্ঞতা এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে জোরালো প্রমাণ উপস্থাপন করে।
উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ও উন্নত সেচব্যবস্থার সুবাদে খাদ্য উৎপাদন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা, নারী শিক্ষা ও ব্যাপক সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে প্রজনন হার ১৯৭২ সালে নারীপ্রতি ৬.৯ জন থেকে কমে ২০২৪ সালে ২.০-এর নিচে নেমে আসে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এখনো মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে, তবে চৌধুরী ও হোসেন (২০১৮)-এর গবেষণায় দেখা যায়, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কারণে ম্যালথাসের মূল ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
জনতাত্ত্বিক এই রূপান্তর বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামোকে জনতাত্ত্বিকরা যাকে বলেন “জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ” অর্থাৎ নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করে। জনসংখ্যা বাধা না হয়ে বরং শ্রমশক্তির সম্পদে পরিণত হয়, যা পোশাক রপ্তানির উত্থানকে শক্তি জুগিয়েছে এবং ব্যাপক প্রবাসী শ্রমিকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ তৈরি করেছে, যা বর্তমানে জিডিপির প্রায় ৫.৪ শতাংশ। ১৯৭২ সালে গড় আয়ু ছিল প্রায় ৪৬.৫ বছর, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৭৪ বছরের বেশি হয়েছে, যা প্রমাণ করে ম্যালথুসীয় সীমা কেবল স্থগিত নয়, বরং অতিক্রান্ত হয়েছে।
নব্য ধ্রুপদী প্রবৃদ্ধি ও অভিসৃতির সীমাবদ্ধতা
সলো (১৯৫৬) প্রবর্তিত ও মানকিউ, রোমার ও ওয়েইল (১৯৯২) দ্বারা সম্প্রসারিত নব্য ধ্রুপদী প্রবৃদ্ধি তত্ত্ব অনুযায়ী, দরিদ্র দেশগুলো ধনী দেশগুলোর তুলনায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এবং ধীরে ধীরে একই স্থিতিশীল আয়স্তরের দিকে অভিসৃত হয়। গত এক দশকে বাংলাদেশের ধারাবাহিক গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মোটামুটি এই যুক্তির সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে নিম্ন আয়ের সূচনাবিন্দুর সঙ্গে পোশাক খাতে বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে আহরিত পুঁজি ও প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে।
তবে মসৃণ অভিসৃতির ধারণা প্রতিষ্ঠান, সুশাসন ও রপ্তানি বাজারে প্রবেশাধিকারের ভূমিকাকে খাটো করে দেখায়। ১৯৯০-এর দশকের পর মোট উপাদান উৎপাদনশীলতার অবদান ছিল সামান্য (রহমান ও ইউসুফ, ২০১০), যা বোঝায় যে অভিসৃতি মূলত উপাদান সংগ্রহ থেকে এসেছে, প্রকৃত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থেকে নয়।
সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের (২০২৪) তথ্যে দেখা যায় গতি দুর্বল হয়ে আসছে, ২০২২ সালের পর দারিদ্র্য বেড়েছে এবং বৈষম্য প্রসারিত হয়েছে। বেয়ার ও ওয়াকার (২০২৩) ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক উত্থানের কারণ হিসেবে যথেষ্ট মানসম্মত নীতিকে চিহ্নিত করেছেন, যা প্রচলিত গড়ের দিকে প্রত্যাবর্তনের প্রবণতাকে অস্বীকার করে এবং প্রমাণ করে যে সুশাসন নব্য ধ্রুপদী তত্ত্বের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাত্ত্বিক সংশ্লেষণ ও এর তাৎপর্য
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গল্প তিনটি কাঠামোকেই আংশিকভাবে সমর্থন করে, একই সঙ্গে তাদের সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করে। শ্রমঘন রপ্তানি পুঁজি গভীরতার আগে এসেছিল। জনতাত্ত্বিক রূপান্তর জনসংখ্যা-ঝুঁকিকে লভ্যাংশে রূপান্তরিত করেছে। অভিসৃতি ঘটেছে অসমভাবে, যার জন্য শাসনসংস্কার প্রয়োজন হয়েছে, যা ধ্রুপদী মডেলগুলো বিবেচনায় নেয়নি। আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও ভিন্ন পথে এগিয়েছে, ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে করোনা মহামারি পর্যন্ত মাথাপিছু প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক অবস্থা এড়িয়ে গেছে, যা ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কা পারেনি।
এই স্থিতিশীলতার সঙ্গে সীমিত বৈচিত্র্যায়ণও যুক্ত ছিল। পোশাক খাতে কেন্দ্রীকরণ অব্যাহত রয়েছে, এবং ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি কমে ৪.২ শতাংশে নেমে আসা বোঝায় যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শ্রমঘন রপ্তানিনির্ভর মডেল তার কাঠামোগত সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
এসব পর্যবেক্ষণের স্পষ্ট নীতিগত তাৎপর্য রয়েছে। হ্যারড ডোমার মডেল যদি শ্রম সংগঠন ও সংস্কারের চেয়ে পুঁজি সংগ্রহের গুরুত্বকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়, তবে উৎপাদনশীলতার উন্নতি ছাড়া শুধু বিনিয়োগকেন্দ্রিক নীতি ক্রমহ্রাসমান ফল দিতে পারে। ম্যালথুসীয় তত্ত্ব যদি প্রযুক্তির রূপান্তরকারী শক্তিকে খাটো করে দেখায়, তবে কৃষি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগকারী অর্থনীতির জন্য জনতাত্ত্বিক হতাশাবাদ অসমর্থনযোগ্য থেকে যায়। আর নব্য ধ্রুপদী মডেল যদি প্রতিষ্ঠানের অন্তর্নিহিত ভূমিকাকে খাটো করে দেখায়, তবে বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতা কোনো বহির্জাত ধাক্কা নয়, বরং অনুমানযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার ফল।
উপসংহার
বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের যাত্রা প্রবৃদ্ধি তত্ত্ব মূল্যায়নের এক সমৃদ্ধ পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করে, যেখানে কোনো একক মডেল পুরো চিত্র ধারণ করতে পারে না। হ্যারড ডোমার পুঁজির গুরুত্ব তুলে ধরে, কিন্তু পুঁজি গভীরতার আগে ঘটা শ্রমনেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধিকে উপেক্ষা করে। ম্যালথুসীয় তত্ত্ব দেশটির প্রাথমিক দুর্বলতাগুলো তুলে ধরে, কিন্তু পরবর্তী জনতাত্ত্বিক রূপান্তরকে ধরতে ব্যর্থ হয়। সলো মডেল অভিসৃতির যুক্তি তুলে ধরে, কিন্তু তার অসমতা ও প্রতিষ্ঠাননির্ভরতাকে অগ্রাহ্য করে। এই বাস্তবতা থেকে একটি অধিকতর সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা এসব মডেলের সীমা ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গুণমান ও বণ্টনগত গতিশীলতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
তথ্যসূত্র
Amin, S.B., Samia, B.I. and Khan, F. (2024) ‘Does capital efficiency influence economic growth in Bangladesh? Application of the Harrod Domar model’, Journal of Economics, Finance and Administrative Science, 29(58), pp. 1122.
Beyer, R. and Wacker, K.M. (2023) ‘Good enough for outstanding growth: the experience of Bangladesh in comparative perspective’, Development Policy Review, 41(6), e12750.
Chowdhury, M.N.M. and Hossain, M.M. (2018) ‘Population growth and economic development in Bangladesh: Revisited Malthus’, American Economic and Social Review, 8(2), pp. 1108.
Domar, E.D. (1946) ‘Capital expansion, rate of growth, and employment’, Econometrica, 14(2), pp. 137147.
Harrod, R.F. (1939) ‘An essay in dynamic theory’, The Economic Journal, 49(193), pp. 1433.
Islam, R. (2023) ‘Fifty years of development experience of Bangladesh’, in Routledge Handbook of Bangladeshi Economy. London: Routledge.
Mahmud, W., Ahmed, S. and Mahajan, S. (2008) ‘Economic reform, growth, and governance: the political economy aspects of Bangladesh’s development surprise’, World Bank Policy Research Working Paper, No. 4398.
Malthus, T.R. (1798) An Essay on the Principle of Population. London: J. Johnson.
