জামিল শাহেদ
স্বতন্ত্র সাংবাদিক
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ক্রিকেটপ্রেমী দেশ হিসেবে ইতোমধ্যে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে। সেই আবেগের অর্থনৈতিক গুরুত্বও এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া তুলনামূলক নবীন ক্রিকেট দেশটি আজ বছরে আনুমানিক ৪ থেকে ৪ কোটি ৩৫ লাখ মার্কিন ডলারের ক্রীড়া বাজার গড়ে তুলেছে। এর সিংহভাগই ক্রিকেটনির্ভর।
তবে বিপুল আবেগ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ক্রীড়া অর্থনীতি এখনো কাঠামোগতভাবে দুর্বল। আন্তর্জাতিক আয় বণ্টনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং কৌশলগত চুক্তি আলোচনার দুর্বলতা এই খাতের বিকাশকে সীমিত করছে। সামনে এগোতে হলে শুধু বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ব্যবস্থার সঙ্গেও আরও দক্ষ ও কৌশলীভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে।
বর্তমান আর্থসামাজিক প্রভাব
বাংলাদেশে ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়। এটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের বার্ষিক মোট রাজস্ব থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পায় ৪.৪৬ শতাংশ, যার পরিমাণ আনুমানিক ২ কোটি ৬৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৯০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের মোট বার্ষিক আয় আনুমানিক ৬০ কোটি মার্কিন ডলার।
তুলনা করলে ব্যবধানটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই তহবিল থেকে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড পায় ৩৮.৫ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ২৩ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের আয়ের তুলনায় তা প্রায় নয় গুণ বেশি। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস পায় ৪ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার, অস্ট্রেলিয়া ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার, পাকিস্তান ৩ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশের চেয়ে সামান্য বেশি, ২ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার ডলার পায়।
পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। এই অবস্থান একদিকে বৈশ্বিক ক্রিকেট বাণিজ্যে বাংলাদেশের তুলনামূলক কম অবদানকে প্রতিফলিত করে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের রাজস্ব বণ্টন কাঠামোর অন্তর্নিহিত বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে আনে।
অবকাঠামোগত ঘাটতি
শুধু আয় দিয়ে টেকসই ক্রীড়া অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়, যদি এর ভৌত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল থাকে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মাঠের সংখ্যা এখনো সীমিত। অধিকাংশ মাঠে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, শরীরচর্চা কেন্দ্র, উচ্চমানের খেলোয়াড় বিশ্লেষণ ব্যবস্থা এবং দর্শকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নেই।
দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোও মূলত ঢাকা ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। ফলে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের তরুণেরা প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের উপযুক্ত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর অভাবে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা খোঁজার কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। নারী ক্রিকেটের অবকাঠামো আরও বেশি অবহেলিত। আলাদা মাঠ, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক লিগের সুযোগ এখনো সীমিত।
ক্রীড়া সরঞ্জামের বাজার সম্প্রসারিত হলেও মানসম্পন্ন ক্রিকেট সরঞ্জামের জন্য বাংলাদেশ এখনো আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশীয়ভাবে উচ্চমানের ক্রিকেট সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতাও সীমিত। অধিকাংশ মাঠের বৈদ্যুতিক আলোকব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন প্রযুক্তি এবং পিচ রক্ষণাবেক্ষণের মান বিশ্বের শীর্ষ ক্রিকেট দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
এই অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করা না গেলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের সক্ষমতা বাড়াতে পারবে না, প্রতিভার গভীর ভাণ্ডার তৈরি করতে পারবে না এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের অর্থ বণ্টনের ওপর নির্ভরতা কমানোর মতো দেশীয় বাণিজ্যিক আয়ও তৈরি করতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সঙ্গে চুক্তির কাঠামো
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের রাজস্ব বণ্টন ব্যবস্থা চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিকেটের ইতিহাস, আগের ১৬ বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিযোগিতায় পারফরম্যান্স, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের বাণিজ্যিক আয়ে অবদান এবং পূর্ণ সদস্যপদের সমান ওজন।
বাংলাদেশের তুলনামূলক কম অংশীদারিত্বের পেছনে দেশের ঐতিহাসিক অবদান এবং ছোট সম্প্রচার বাজার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে এই বণ্টন কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের বার্ষিক আয়ের আনুমানিক ৮৫.৩ শতাংশ আসে ভারত থেকে। ফলে রাজস্ব বণ্টন নিয়ে আলোচনায় ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।
এই কাঠামোর মধ্যেই বাংলাদেশকে আরও কৌশলগতভাবে আলোচনা করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন দেখিয়েছে, সম্মিলিত দরকষাকষির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায় করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের চক্রে আরও একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল প্রতিযোগিতা আয়োজনের অধিকার পেয়েছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে ২০৩১ সালের একদিনের বিশ্বকাপ আয়োজনেও বাংলাদেশের সহআয়োজক হিসেবে থাকার কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের অর্থনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নয়টি শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে মোট ১৬৬ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করেছিল। বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে সরাসরি আয় আসে। পাশাপাশি পর্যটন, আবাসন, আতিথেয়তা এবং নগর অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে তৈরি হয় পরোক্ষ অর্থনৈতিক সুবিধা।
ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্যদেশগুলোর অংশগ্রহণ চুক্তিতে বাংলাদেশকে আরও বেশি আয়োজনের সুযোগ, পারফরম্যান্সের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত রাজস্ব এবং বিরোধের সময় আর্থিক চাপ প্রয়োগ ঠেকানোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক চুক্তি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অপ্রয়োগিত বাণিজ্যিক সম্ভাবনার একটি রয়েছে দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেটে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ভারত ও পাকিস্তানের একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ সম্প্রচার, পৃষ্ঠপোষকতা, টিকিট, পণ্য বিক্রি এবং করপোরেট আতিথেয়তা মিলিয়ে ২ হাজার ২০০ কোটি থেকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি ভারতীয় রুপি পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই মাত্রার অর্থনৈতিক পরিসর না থাকলেও ভারতীয় দল বাংলাদেশ সফরে এলে সম্প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ সফরের জন্য ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের নির্ধারিত কর্মসূচি, যা বর্তমানে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অনিশ্চিত, দেখিয়ে দেয় ক্রিকেটের বাইরের কারণও কীভাবে দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের উচিত প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে, আরও শক্তিশালী চুক্তির কাঠামো তৈরি করা। এসব চুক্তিতে বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি, নির্দিষ্ট সময় অন্তর সফরের নিশ্চয়তা, একতরফাভাবে সফর বাতিলের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানা এবং সম্প্রচার ও ডিজিটাল স্বত্ব থেকে আয় বণ্টনের সুস্পষ্ট নিয়ম থাকতে হবে।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। দলভিত্তিক এই প্রতিযোগিতা থেকে পৃষ্ঠপোষকতা, গণমাধ্যম স্বত্ব এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তবে আয় বাড়াতে হলে লিগের পরিচালনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ভবিষ্যৎ সফরসূচির সঙ্গে সময়সূচির সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। এর ফলে শীর্ষ খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং বাণিজ্যিক আয়ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিন দেশের যৌথ সিরিজ এবং সীমান্তপারের প্রতিভা বিনিময় কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব। তবে অংশগ্রহণকারী ক্রিকেট বোর্ডগুলোর মধ্যে রাজস্বের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে চুক্তিতে স্পষ্ট শর্ত থাকতে হবে।
ভবিষ্যৎ নির্মাণের সময় এখনই
বাংলাদেশের ক্রিকেট অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের সংখ্যা বিপুল এবং ক্রমাগত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও ইতোমধ্যে প্রমাণিত।
কিন্তু আধুনিক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সঙ্গে ন্যায্য ও কার্যকর চুক্তি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেটের অর্থনৈতিক কাঠামোর নিম্নস্তরেই আটকে থাকবে।
চ্যালেঞ্জ শুধু ভালো ক্রিকেট খেলা নয়। কোন শর্তে ক্রিকেট পরিচালিত হবে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজের স্বার্থ নিশ্চিত করবে এবং দেশের ক্রিকেটপ্রেমকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যাবে, সেই প্রশ্নগুলোরও উত্তর খুঁজতে হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তাই মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি নির্ভর করছে সঠিক বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দূরদর্শী অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর।
