কামরুন নাহার মাহমুদ
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বাংলাদেশের শ্রম আইন সম্প্রতি ব্যাপক আইনগত সংস্কারের মধ্যে দিয়ে পরিবর্তন হয়েছে । ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে কার্যকর হওয়া সংশোধনীসমূহ পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে দেশের শ্রম আইন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনা হয় ।
সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলো গত কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রম আইনের সবচেয়ে বিস্তৃত সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে । জনপরিসরে শ্রমিকের অধিকার সম্প্রসারণ এবং ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও, এই সংস্কারের প্রকৃত তাৎপর্য আরও গভীর। নতুন আইন একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন করার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের বাস্তবতার সঙ্গে দেশের শ্রম সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার উদ্যোগও নিয়েছে।
আইনগত পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরকার শ্রম আইনকে আধুনিকায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই এই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তবে সংশোধিত আইনের বেশ কিছু বিধানের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
সংস্কার প্রক্রিয়া ও আইন প্রণয়নের পটভূমি
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর শ্রম আইন সংস্কারের গতি বৃদ্ধি পায় । পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল শ্রম আইন সংস্কার কমিশন গঠন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন অনুমোদন। এগুলো হলো কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কনভেনশন নং ১৫৫, পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন কাঠামো সম্পর্কিত কনভেনশন নং ১৮৭, এবং কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধবিষয়ক কনভেনশন নং ১৯০।
শ্রম আইন সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সরকারের কাছে তাদের সুপারিশ জমা দেয়। এরপর ১৭ নভেম্বর ২০২৫ শ্রম আইন সংশোধনের অধ্যাদেশ জারি হয়। অবশেষে ১০ এপ্রিল ২০২৬ সংসদে সংশোধিত আইন পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর প্রায় নব্বইটি ধারা সংশোধন, সংযোজন ও বিলুপ্ত করা হয়। তবে কমিশনের দেওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুপারিশ চূড়ান্ত আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারই ছিল সংস্কারের প্রধান চালিকা শক্তি
শ্রম আইন সংস্কারের পেছনে যে ইতিহাস তা অনেক পুরোনো। ২০১৯ সালের জুন মাসে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (ITUC)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন।
আইএলওর তদারকি ব্যবস্থায় উল্লেখিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ প্রক্রিয়াগুলোর একটি। অভিযোগে বলা হয়, বাংলাদেশ শ্রম পরিদর্শন বিষয়ক কনভেনশন নং ৮১, সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা বিষয়ক কনভেনশন নং ৮৭, এবং সংগঠন ও সমষ্টিগত দরকষাকষির অধিকার সম্পর্কিত কনভেনশন নং ৯৮ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর আগে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা, সমষ্টিগত দরকষাকষির অধিকার এবং শ্রম আইন প্রয়োগে বিদ্যমান দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। শ্রমিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন অভিযোগ নথিভুক্ত করে, ধারাবাহিক প্রচারাভিযান পরিচালনা করে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি উত্থাপন করে।
এর প্রেক্ষাপটে আইএলওর গভর্নিং বডি বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি সময়সীমাভিত্তিক সংস্কার রোডম্যাপ চায়। সরকার ২০২১ সালের ২৩ মে সেই রোডম্যাপ জমা দেয়। সেখানে শ্রম আইন সংস্কার, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন, শ্রম পরিদর্শন, আইন প্রয়োগ এবং শ্রমিকবিরোধী বৈষম্য ও সহিংসতা প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের সংশোধনীগুলো মূলত সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং ধারাবাহিক সংস্কার চাপে গৃহীত হয়েছে। এখন দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে পারে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল শ্রম আইন, ২০১৯-এর সংশোধনের দিকে, বিশেষ করে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে।
দ্বৈত শ্রম আইন কাঠামো বহাল
বাংলাদেশে এখনও শ্রমিকরা দুটি পৃথক আইনগত কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হন।আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য প্রধান আইন হচ্ছে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬। তবে দেশের অধিকাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত হওয়ায় তাদের বড় অংশ এই আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল শ্রম আইন, ২০১৯। এই আইনে ট্রেড ইউনিয়নের পরিবর্তে ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (WWA) গঠনের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমমানের আলোকে দীর্ঘদিন ধরেই এই কাঠামো সমালোচিত হয়ে আসছে, কারণ এটি কনভেনশন নং ৮৭ এবং কনভেনশন নং ৯৮-এ স্বীকৃত সংগঠন গঠনের স্বাধীনতার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটায় না।
শ্রমিক সুরক্ষা ও আইনের আওতা সম্প্রসারণ
সংশোধিত আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো পূর্বে আইনের বাইরে থাকা কিছু খাতকে শ্রম আইনের আওতায় আনা। এখন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও আইনের সুরক্ষা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
প্রথমবারের মতো গৃহকর্মীদেরও সীমিত পরিসরে “শ্রমিক” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যদিও ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং চাকরিজনিত বিভিন্ন সুবিধা এখনও তাদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়, তবুও দীর্ঘদিন অবহেলিত একটি শ্রমগোষ্ঠীকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।একই সঙ্গে শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে।
কাজে সাময়িক বিরতির ক্ষতিপূরণপাওয়ার জন্য পূর্বে এক বছর ধারাবাহিক চাকরির শর্ত থাকলেও এখন মাত্র তিন মাস চাকরি করলেই সেই অধিকার সৃষ্টি হবে। লেঅফের মেয়াদ যতই হোক না কেন, শ্রমিককে অন্তত মূল বেতনের অর্ধেক প্রদান করতে হবে।
চাকরির এক বছর পূর্ণ হলেই মৃত্যুকালীন ক্ষতিপূরণের অধিকারও কার্যকর হবে। আগে এর জন্য ন্যূনতম দুই বছরের চাকরির প্রয়োজন ছিল।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো বরখাস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ। এক বছর পূর্ণ করা শ্রমিক চাকরির প্রতিটি সম্পূর্ণ বছরের জন্য পনেরো দিনের মজুরি পাবেন। একইভাবে চাকরি থেকে পদত্যাগের ক্ষেত্রেও চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বাড়তি আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে।নিয়োগকর্তা প্রদত্ত বাসস্থান খালি করার নোটিশের সময়সীমাও বাড়িয়ে ছয় মাস করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের আবাসন নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ
সংশোধিত আইন কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।নতুন বিধান অনুযায়ী কোনো শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ বা অনিরাপদ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন এবং আইএলও কনভেনশন নং ১৫৫-এর নীতির প্রতিফলন।
মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। বার্ষিক উৎসব ছুটিও ১১ দিন থেকে ১৩ দিনে উন্নীত হয়েছে।
ন্যূনতম মজুরি প্রতি তিন বছর অন্তর পর্যালোচনার বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধিত সব ট্রেড ইউনিয়নের জন্য চেক অফ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানজনিত আঘাত ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের বিধানও যুক্ত হয়েছে।
আগে শুধু কারখানায় নিরাপত্তা কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখন ৫০ বা তার বেশি শ্রমিক কর্মরত এমন সব প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা কমিটি গঠন করতে হবে।
এসব পরিবর্তন শ্রমিক কল্যাণকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না।
কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির আইনগত স্বীকৃতি
সংশোধিত আইনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও অসদাচরণের স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ।এখন আইনে জোরপূর্বক শ্রম, সহিংসতা ও হয়রানি, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি এবং কালো তালিকাভুক্তির মতো বিষয়গুলো পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
বিশেষ করে আইএলও কনভেনশন নং ১৯০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব ধারণা অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমতার প্রশ্নে আরও শক্তিশালী আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।তবে এসব বিধান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও বাস্তবায়ন কাঠামো প্রণয়নের ওপর। বিস্তারিত বিধি ছাড়া অনেক বিধানই বাস্তবে প্রয়োগে জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
“শ্রমিক” শব্দের নতুন সংজ্ঞা
সংশোধিত আইনের ২(৬৫) ধারায় “শ্রমিক” শব্দের সংজ্ঞায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী সরাসরি অথবা ঠিকাদারের মাধ্যমে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দক্ষ, অদক্ষ, কারিগরি, দাপ্তরিক, প্রচারণামূলক কিংবা শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিরা শ্রমিক হিসেবে গণ্য হবেন। শিক্ষানবিশদেরও এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে ধারা ২(৪৯)(খ)-এর অর্থে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক বা তদারকি দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরা এখনও শ্রমিকের সংজ্ঞার বাইরে থাকবেন।বাস্তবে এই সীমারেখা নির্ধারণ অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধের সৃষ্টি করতে পারে। কোনো কর্মচারী প্রকৃতপক্ষে ব্যবস্থাপনা বা তদারকি পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা নির্ধারণ প্রায়ই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। যদিও বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে, বিদ্যমান সংজ্ঞাগুলো এখনও বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে গেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ধারা ১৭৫(১)-এ। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের উদ্দেশ্যে “শ্রমিক” শব্দের পরিধি বাড়িয়ে স্বনিয়োজিত ব্যক্তি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের বাস্তবতা বিবেচনায় এটি একটি অগ্রসর পদক্ষেপ। তবে তাদের অন্তর্ভুক্তি শুধু ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখায় আইনগত সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি অসম কাঠামো সৃষ্টি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নতুন আইনগত প্রশ্ন ও নীতিগত বিতর্কের জন্ম দিতেপারে।
সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা ও শ্রমিক প্রতিনিধিত্বে পরিবর্তন
সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা সংশোধনীসমূহের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।সংশোধিত আইনের ২(১৫) ধারায় “ট্রেড ইউনিয়ন”-এর সংজ্ঞা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমন ব্যক্তিদের সংগঠনও ট্রেড ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হবে, যারা আইনগতভাবে “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞার আওতায় নাও পড়তে পারেন।
এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১৭৫ ও ১৭৬ ধারায় বৈষম্যহীনভাবে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন এবং তাতে যোগদানের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পর্যায়ের কর্মচারীদেরও তাঁদের পেশাগত স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পৃথক সংগঠন গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের ধারণাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের মতোই ২০ জন শ্রমিক যৌথভাবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে সদস্যসংখ্যার শর্ত এখন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকের মোট সংখ্যার ভিত্তিতে ধাপভিত্তিক নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৩০০ জন শ্রমিক কর্মরত, সেখানে ন্যূনতম ২০ জন সদস্য থাকতে হবে। শ্রমিক সংখ্যা ৩০১ থেকে ৫০০ হলে সদস্যসংখ্যা হবে ৪০ জন। ৫০১ থেকে ১,৫০০ জন শ্রমিক থাকলে ন্যূনতম ১০০ জন সদস্য প্রয়োজন হবে। ১,৫০১ থেকে ৩,০০০ জন শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে সদস্যসংখ্যা হতে হবে ৩০০ জন এবং শ্রমিক সংখ্যা ৩,০০০ অতিক্রম করলে ন্যূনতম ৪০০ জন সদস্যের শর্ত প্রযোজ্য হবে।
ট্রেড ইউনিয়ন গঠনকে সহজতর করার উদ্দেশ্যে এই কাঠামো প্রণয়ন করা হলেও, নির্দিষ্ট কিছু পর্যায়ে সদস্যসংখ্যার শর্ত হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণে বাস্তবে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধি পেলেও নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার আশঙ্কা তৈরি করে।
শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই এবং কর্মচারীদের যথাযথ শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও বাস্তবিক উদ্বেগ রয়ে গেছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, নিয়োগকর্তাকে অনুরোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকসংখ্যা প্রত্যয়ন করতে হবে। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মচারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণের জটিলতা এখনও বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২০ জন সদস্যের শর্ত পূরণ করতে হবে।এছাড়া কনফেডারেশনকে প্রথমবারের মতো ট্রেড ইউনিয়নের আইনগত সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে উচ্চতর পর্যায়ের শ্রমিক সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিক আইনগত স্বীকৃতি পেলেও একই সঙ্গে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার আওতায় চলে এসেছে।
বহুস্তরীয় সমষ্টিগত দরকষাকষির সূচনা
সংশোধিত আইন সমষ্টিগত দরকষাকষির পরিসরকে শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং আরও বিস্তৃত পর্যায়ে সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।নতুন বিধান অনুযায়ী, ফেডারেশন ও কনফেডারেশন এখন খাতভিত্তিক কিংবা জাতীয় পর্যায়সহ বৃহত্তর পরিসরে সমষ্টিগত দরকষাকষিতে অংশ নিতে পারবে। বাংলাদেশের শিল্প সম্পর্ক ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।তবে আইন এই নতুন কাঠামো সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।
কোন কোন পর্যায়ে এই ধরনের দরকষাকষি পরিচালিত হবে, তার সুনির্দিষ্ট পরিধি আইনে নির্ধারণ করা হয়নি। একইভাবে কোন ফেডারেশন বা কনফেডারেশন শ্রমিকদের পক্ষে আলোচনা পরিচালনার বৈধ কর্তৃত্ব রাখবে, সেই বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা অনুপস্থিত। যেখানে একাধিক ফেডারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেখানে প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো সংগঠন প্রকৃত অর্থে কতজন শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করছে, তার যাচাইযোগ্য সদস্যতথ্য উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ফলে প্রতিনিধিত্বের বৈধতা, চুক্তির কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারে।
প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সমষ্টিগত দরকষাকষির প্রতিনিধি বা Collective Bargaining Agent (CBA)নির্ধারণের বিদ্যমান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে নতুন নিবন্ধন কাঠামোর কারণে তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো ট্রেড ইউনিয়নও একমাত্র সিবিএ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।
একই সঙ্গে নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে নির্ধারিত আইনগত সময়সীমার মধ্যে সিবিএ নির্বাচন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে শ্রম অধিদপ্তরের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ভবিষ্যতের পথরেখা
২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনী নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চাভিলাষী শ্রম আইন সংস্কার উদ্যোগ। শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষা সম্প্রসারণ, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন ও হয়রানি সম্পর্কিত নতুন আইনগত ধারণার অন্তর্ভুক্তি, সংগঠন গঠনের স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক শক্তিশালী করা এবং সমষ্টিগত দরকষাকষির কাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমে শ্রম আইনকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে কেবল আইন সংশোধনের মধ্যেই এই সংস্কারের সাফল্য নির্ধারিত হবে না। বাস্তবায়ন, ব্যাখ্যা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বেশ কিছু বিধান কার্যকর করতে বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে কাঠামোগত কিছু অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে আরও আইনগত সংশোধনের দাবি তৈরি করতে পারে।
এই সংস্কারের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার ওপরকার্যক্রম এবং শ্রমিক, নিয়োগকর্তা ও সরকারের মধ্যে গঠনমূলক অংশগ্রহণ সংস্কারের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তা সত্ত্বেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের বেশ কয়েকটি দাবি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। গৃহকর্মীদের জন্য সীমিত আইনগত সুরক্ষা, প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির শ্রমিকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইনগত কাঠামোর অনুপস্থিতি এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে বিদ্যমান।
ভবিষ্যতের সংস্কার কার্যক্রমে ট্রেড ইউনিয়নবিরোধী বৈষম্যের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী আইনগত সুরক্ষা, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে থাকা শ্রমিকদের জন্য বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।
আইন ও নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংশোধনীসমূহকে বাংলাদেশের শ্রম আইন সংস্কারের সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা অধিকতর যৌক্তিক। সরকার, নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক ত্রিপক্ষীয় সংলাপ, অধিকতর আইনগত স্বচ্ছতা, কার্যকর প্রয়োগ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে অব্যাহত সামঞ্জস্যই শেষ পর্যন্ত এই সংস্কার কর্মসূচির পূর্ণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠবেবলে এ ধারণা করা যায়।
