জয়নাব বানু
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব তদারকির জন্য ক্ষমতাসীন দলের ৩০ জন সংসদ সদস্যকে দায়িত্ব দেয়। তাঁদের মধ্যে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও রয়েছেন।
সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মাদক পাচার প্রতিরোধ এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সিদ্ধান্তটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং ঢাকার বাইরে বসবাসকারী নাগরিকদের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে।
প্রজ্ঞাপনে কী বলা হয়েছে
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য তিনটি প্রধান ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুতর অপরাধসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁরা জেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলোকে পরামর্শ দেবেন। দ্বিতীয়ত, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন তদারকি করবেন। তৃতীয়ত, তাঁরা জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। এই তদারকি কাঠামোর কারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কিংবা সংবিধান ও আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো সংস্থার আইনগত ক্ষমতা খর্ব হবে না। সরকার এই ব্যবস্থা গ্রহণের আইনগত ভিত্তি হিসেবে সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফা এবং সরকারের কার্যবিধির উল্লেখ করেছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের যুক্তিও স্পষ্ট। প্রজ্ঞাপনে আগের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা ব্যাপকভাবে লুটপাট করা হয়েছে। সেই অর্থ বিদেশে পাচার কিংবা মাদক ও সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার তাই নতুন ব্যবস্থাকে একটি সংশোধনমূলক পদক্ষেপ এবং তদারকি কাঠামো হিসেবে তুলে ধরছে, যাতে অতীতের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
পরিচিত কাঠামো, উদ্বেগজনক অভিজ্ঞতা
এই ব্যবস্থার মূল সমস্যা এর ঘোষিত উদ্দেশ্য নয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য লক্ষ্য। প্রশ্ন হলো, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কাঠামো বেছে নেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশে তার সঙ্গে পরিচিত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর অতীতের সেই অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
২০২৪ সালের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করেছেন। উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন, ঠিকাদার নিয়োগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্ধারণে অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আইন ও প্রশাসনিক বিধির অধীনে দায়িত্ব পালন করা জেলা প্রশাসকরাও অনেক সময় এমন পরিবেশে কাজ করেছেন, যেখানে সংসদ সদস্যের কার্যালয় থেকে আসা রাজনৈতিক নির্দেশনা তাঁদের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের চেয়ে বাস্তবে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ফলাফল দুর্নীতি কমানো ছিল না। বরং অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে।
ভারতের অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে বিবেচনার দাবি রাখে। ১৯৯৩ সালে চালু হওয়া সংসদ সদস্য স্থানীয় এলাকা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন তহবিল ব্যবহারে সরাসরি ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল।
তিন দশকের বিভিন্ন নিরীক্ষা ও গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এই তহবিল রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়েছে। স্থানীয় প্রয়োজনের পরিবর্তে দৃশ্যমান ছোট প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় পরিকল্পনা কাঠামোকে পাশ কাটানোর অভিযোগও উঠেছে।
এর ফলে আইন প্রণেতারা প্রশাসনিক কার্যক্রমেও ভূমিকা নিতে শুরু করেন। আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যকার সাংবিধানিক সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে উভয় ব্যবস্থার জন্যই ক্ষতিকর। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রাদেশিক প্রশাসনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তদারকির দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
ব্যবস্থার ভেতরের কাঠামোগত দ্বন্দ্ব
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন তদারকি ব্যবস্থা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা খর্ব করবে না। আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বক্তব্যটি সতর্কভাবে লেখা। কিন্তু বাস্তব প্রশাসনিক পরিবেশে এই সীমারেখা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
কোনো জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন মন্ত্রী যখন জেলা পর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন নিয়ে পরামর্শ দেবেন, তখন জেলা প্রশাসনের কাছে সেই পরামর্শের গুরুত্ব সাধারণ কারও পরামর্শের মতো হবে না।
দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক প্রভাব যেখানে প্রশাসনিক বাস্তবতার অংশ, সেখানে একজন মন্ত্রীর পরামর্শ বাস্তবে নির্দেশনা হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রজ্ঞাপনের ভাষায় তাকে পরামর্শ বলা হলেও প্রশাসনিক সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায় না। এখানেই নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি কাঠামোগত প্রশ্ন তৈরি হয়।
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জনগণের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক বৈধতা পান এবং স্থানীয় জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন।
একই ভৌগোলিক এলাকায় কেন্দ্র থেকে নিয়োগ পাওয়া একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী তদারকির দায়িত্ব পালন করলে নাগরিকদের সামনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে, স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কার কর্তৃত্ব কার্যকর। বাস্তবে উত্তরটি প্রায় সব সময় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে বেশি প্রবেশাধিকার থাকা ব্যক্তির দিকেই ঝুঁকতে পারে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ এবং নাগরিকের অধিকার
প্রজ্ঞাপনে বাস্তবায়নসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ওপর জেলা তদারকির দায়িত্ব তাঁদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের অতিরিক্ত। একজন মন্ত্রী জাতীয় পর্যায়ের একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এক বা একাধিক জেলার কার্যকর ও নিয়মিত তদারকি কতটা করতে পারবেন, সেটি বাস্তব প্রশ্ন।
দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। হয় কেন্দ্রীয় দায়িত্বের কোনো অংশ উপেক্ষিত হবে, অথবা জেলা তদারকির দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে। উভয় ক্ষেত্রেই তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। নাগরিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজশাহী বা নোয়াখালীর কোনো নাগরিক যদি মনে করেন, তাঁর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তদারকির ক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করছেন না বা তাঁর পরামর্শের কারণে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের কোনো বৈধ সিদ্ধান্ত উপেক্ষিত হচ্ছে, তাহলে সেই নাগরিক কোথায় অভিযোগ করবেন?
তদারকিকারীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী? নতুন কোনো কর্তৃত্বের স্তর তৈরি করে যদি তার বিপরীতে নাগরিকের অভিযোগ ও প্রতিকারের সমান কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না তোলা হয়, তাহলে জবাবদিহি বাড়ে না। ক্ষমতার বণ্টন বদলায়, কিন্তু জবাবদিহির কাঠামো একই জায়গায় থেকে যায়।
রাজনৈতিক তদারকির বাইরে কী করা যেতে পারে
দুর্নীতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যর্থতা নিয়ে সরকারের উদ্বেগ বাস্তব এবং তার প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান প্রয়োজন।তবে সেই সমাধান রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণনির্ভর না হয়ে কাঠামোগত হওয়া প্রয়োজন। নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন বাজেট ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় ভোটারদের কাছে কার্যকর জবাবদিহির আওতায় আনা হলে দুর্নীতির মূল কারণগুলোর ওপর সরাসরি কাজ করা সম্ভব।
আর্থিকভাবে স্বনির্ভর, কারিগরি সহায়তাপ্রাপ্ত এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে আইনগত সুরক্ষা পাওয়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি প্রতিরোধে পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক তদারকির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
জেলা পর্যায়ে একটি স্বাধীন ন্যায়পাল কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দায়িত্বশীল উভয়ের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে।
এর পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে জেলা পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে আরও কার্যকর ভূমিকা দেওয়া যেতে পারে। এসব কমিটি কোনো একক রাজনৈতিক ব্যক্তির পরিবর্তে আইনসভার কাঠামোর মধ্যে দায়িত্ব পালন করে।
জেলা প্রশাসনকে নিয়মিতভাবে উন্নয়ন ব্যয়ের তথ্য সহজবোধ্য ও সবার জন্য উন্মুক্ত আকারে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করাও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তথ্য প্রকাশের সুযোগ থাকলে নাগরিক ও নাগরিক সমাজ নিজেরাই একটি কার্যকর তদারকি শক্তিতে পরিণত হতে পারেন।
উপসংহার
সরকার যে লক্ষ্যগুলো সামনে রেখে এই ব্যবস্থা চালু করেছে, সেগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের বৈধ দায়িত্ব।
তবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বেছে নেওয়া কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের অতীতের পরিচিত কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসনিক তদারকির ক্ষমতা দেওয়া অনেক সময় নাগরিকের জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেয়ে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বিস্তারে বেশি কার্যকর হয়েছে।
তাই এই সিদ্ধান্তের সাফল্য শুধু একটি আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে নিশ্চিত করা যাবে না। প্রয়োজন হবে দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট করা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতা বাস্তবে সুরক্ষিত রাখা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নাগরিকদের জন্য একটি কার্যকর অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
অন্যথায় নতুন কাঠামো সুশাসনের একটি অতিরিক্ত স্তর তৈরি করলেও প্রশ্ন থেকে যাবে, সেই তদারকি শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা করছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোর, নাকি সেই নাগরিকদের, যাঁদের নামে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র
