ফারাহ জেহির
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলা অববাহিকাকে দীর্ঘদিন ধরে যে ভূতাত্ত্বিক নীরবতা সংজ্ঞায়িত করেছিল, তা কার্যত ভেঙে যায় ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সকালে, যখন নরসিংদীর নিকটবর্তী অঞ্চলে ৫.৫–৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। মাত্র ২৬ সেকেন্ডের কম্পনে দশজন মানুষের মৃত্যু এবং শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্বেগজনক ছিল; তবে এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে অন্যত্র।
এই ভূমিকম্প প্রমাণ করেছে যে ঢাকার ভূকম্পন-ঝুঁকি পূর্ববর্তী মডেলগুলোর তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত এবং জটিল। ডিসেম্বর মাসে সংঘটিত পরবর্তী কম্পনসহ এই ঘটনাগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল পরিচিত সক্রিয় ফল্টলাইনের দক্ষিণে অবস্থিত একটি পুনঃসক্রিয় ভূগর্ভস্থ ফল্ট থেকে, যার আচরণ এখনো পর্যাপ্তভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি। এটি আঞ্চলিক টেকটোনিক গতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের অস্থিতিশীল সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সাম্প্রতিক সম্ভাবনাভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ৬.০ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭৫.৬ শতাংশ। এই পরিস্থিতিকে আর ‘সম্ভাব্য ঝুঁকি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই; এটি কার্যত একটি গাণিতিক বাস্তবতা, যার জন্য রাজধানী এখনো মৌলিকভাবে অপ্রস্তুত।
এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে অতিরিক্ত জনঘনত্ব এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের যুগপৎ উপস্থিতি। প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বসবাসকারী ঢাকা এমন এক মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে দ্রুত নগর সম্প্রসারণের চাপে কাঠামোগত নিরাপত্তা বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। রামপুরা, তুরাগসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাভূমি ভরাটের ফলে মাটির তরলীকরণ -এর ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকম্পের সময় পানিসিক্ত মাটি তার দৃঢ়তা হারিয়ে কার্যত তরল অবস্থায় রূপ নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিবছর প্রায় তিন মিটার পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, যা নগরজুড়ে ভবনগুলোর ভিত্তিকে ক্রমাগত দুর্বল করে তুলছে।
যদিও বাংলাদেশ জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি 2020) নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী কারিগরি কাঠামো প্রদান করে, বাস্তবে এর প্রয়োগ নগর প্রশাসনের কাঠামোর ভেতরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে আছে। ঢাকার প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভবনের অধিকাংশই বিধিমালার পূর্ণ অনুসরণ ছাড়া নির্মিত বা ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নগরটি এমন এক মানবসৃষ্ট দুর্যোগের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা কেবল একটি প্রাকৃতিক ভূমিকম্পের মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সংকট সমানভাবে প্রাতিষ্ঠানিক। সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ নিয়মের অভাব নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী প্রয়োগ-ব্যর্থতা এবং বিভক্ত প্রশাসনিক জবাবদিহি। বর্তমানে রাজউক, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এবং ফায়ার সার্ভিসের মধ্যকার ওভারল্যাপিং কর্তৃত্ব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে কার্যত স্থবির করে রেখেছে। এর ফলে ভূমিকম্প প্রতিরোধ ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এমন একটি প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেখানে কোনো একক কর্তৃপক্ষ প্রকৃত দায়ভার বহন করছে না।
টোকিও বা ইস্তানবুলের মতো সহনশীল বৈশ্বিক নগরগুলোর বিপরীতে ঢাকায় এখনো মেয়র-নেতৃত্বাধীন সমন্বিত কমান্ড কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এই প্রশাসনিক জটিলতা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার ফল নয়; এটি মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার বহিঃপ্রকাশ। কারণ ইউটিলিটি সংযোগ এবং ব্যাংক ঋণের সঙ্গে BNBC অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগের নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন।
একইসঙ্গে ‘অতিরিক্ত ব্যয়’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ বিলম্বিত করার যুক্তিও ভ্রান্ত। একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৬৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা প্রতি এক ডলার ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার ব্যয়ের প্রায় চার ডলার সাশ্রয় করতে সক্ষম।
অতএব, অনিবার্য ঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষয়ক্ষতি ব্যবস্থাপনা থেকে সরে এসে সক্রিয় কাঠামোগত সহনশীলতার দিকে অগ্রসর হতে হবে। এর সূচনা হতে পারে স্কুল, হাসপাতাল এবং জরুরি সেবাকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বাধ্যতামূলক ঝুঁকিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ও রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্বল্পব্যয়ের অ্যাক্সেলরোমিটার স্থাপন করে একটি ভূমিকম্প পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি, যা ঢাকাকে গ্যাসলাইন বন্ধ করা এবং গণপরিবহন থামিয়ে দেওয়ার জন্য মূল্যবান কয়েক সেকেন্ড সময় দিতে পারে। এর পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু করা প্রয়োজন, বিশেষত সেই ৬৫ শতাংশ নাগরিকের জন্য, যাঁদের কোনো আনুষ্ঠানিক দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ নেই।
২০২৫ সালের নরসিংদী ভূমিকম্প ছিল না চূড়ান্ত বিপর্যয়; বরং এটি ছিল এক শেষ সতর্কবার্তা, একটি দেরিতে পাওয়া, কিন্তু এখনো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাসম্পন্ন সতর্কতা। শতভাগ ভবন বিধিমালা বাস্তবায়ন এবং দুর্যোগ প্রশাসনের কাঠামোগত পুনর্গঠনের জন্য এখনো সময় রয়েছে। কিন্তু টেকটোনিক প্লেটগুলো যেমন ক্রমাগত সরে যাচ্ছে, তেমনি দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে প্রস্তুতির সেই সময়সীমাও।
তথ্যসূত্র-
1. Samm-A, A., Kamal, A.S.M.M., Hossain, M.S., & Rahman, M.Z. (2025). Probabilistic seismic hazard mapping for Bangladesh using updated source models. Geomatics, Natural Hazards and Risk. https://doi.org/10.1080/19475705.2025.2454537
2. Sumon, M. (2025, November 22). Earthquake risk in Dhaka under magnitude 6.5, 7.0, and 8.0 events. Nature Insights. https://www.natureinsights.earth/post/earthquake-risk-in-dhaka-under-magnitude-6-5-7-0-and-8-0-events
3. Rezwan, M.M. (2025). Seismic hazard assessment for Bangladesh: Integration of statistical analysis and machine learning following the 2025 Narsingdi earthquake. Zenodo. https://zenodo.org/doi/10.5281/zenodo.17685817
4. DeshKal News. (2025, November 20). Dhaka’s earthquake risk exposed amid growing seismic activity. https://www.deshkalnews.com/news/9934
5. Observer BD. (2025, December 3). Earthquake risks and structural vulnerabilities in Bangladesh. https://observerbd.com/news/556598
6. The Diplomat. (2025, December 2). The latest earthquake was a warning sign: Bangladesh isn’t ready. https://thediplomat.com/2025/12/the-latest-earthquake-was-a-warning-sign-bangladesh-isnt-ready/
7. Noor, M.A. (2025, November 27). After Narsingdi’s jolt, a national push for seismic resilience is overdue. The Daily Star. https://www.thedailystar.net/opinion/views/news/after-narsingdis-jolt-national-push-seismic-resilience-overdue-4044326
8. Ansary, M.A. (2025, April 4). Beyond the fault lines: A roadmap to earthquake resilience for Bangladesh. The Business Standard. https://www.tbsnews.net/thoughts/beyond-fault-lines-roadmap-earthquake-resilience-bangladesh-1107971
9. Rahman, M.M., Asikunnaby, Chaity, N.J., Abdo, H.G., & Almohamad, H. (2023). Earthquake preparedness in an urban area: the case of Dhaka city, Bangladesh. Geoscience Letters, 10, 28. https://doi.org/10.1186/s40562-023-00281-y10. Al-Hussaini, T.M., Hamza, S., Nakib, M.A., Islam, S., & Kamal, M. (2023). Low-cost methods for early warning to geohazards. IUGG 2023. https://gfzpublic.gfz.de/pubman/item/item_5021751
