আরিফ রেশাদ
ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স, যুক্তরাজ্য
গত দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রযুক্তি খাতে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের গল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই তালিকায় বাংলাদেশের উপস্থিতি খুবই সীমিত।
ভারত প্রথমে বিশ্বমানের সফটওয়্যার সেবা খাত গড়ে তোলে। পরে তার ওপর ভিত্তি করে দেশীয় স্টার্টআপ পরিবেশ বিস্তৃত করে, যার মাধ্যমে অর্থপ্রদান, সরবরাহব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সফটওয়্যার খাতে আন্তর্জাতিক পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোম্পানি তৈরি হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ছোট অর্থনীতি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও শ্রীলঙ্কা তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সেবা খাতে একটি সম্মানজনক অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে।
নিরাপত্তা ও সামষ্টিক অর্থনীতির নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পাকিস্তানে উল্লেখযোগ্য আকারের ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি হার্ডওয়্যার ও আর্থিক প্রযুক্তি খাতেও কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেখা গেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা মূলত তৈরি পোশাকশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। প্রযুক্তি খাতে এখনও তুলনামূলক কম মূল্যসংযোজনের কোডিং সেবা, আমদানি করা যন্ত্রাংশ সংযোজন এবং বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রবণতাই বেশি। দেশে স্মার্টফোন সংযোজন কারখানা রয়েছে এবং ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারতীয় বড় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের মতো আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকারী, কিংবা শ্রীলঙ্কার মাঝারি আকারের সফল আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের সমপর্যায়ের কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারেনি।
যে সরকারি প্রণোদনা বাস্তব রূপ পায়নি
এই পরিস্থিতির একটি বড় কারণ প্রণোদনা কাঠামোর দুর্বলতা। দক্ষিণ এশিয়ার সফল দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি কর অবকাশ, গবেষণা অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে পেরেছে। ভারতে সফটওয়্যার প্রযুক্তি পার্ক কর্মসূচি এবং পরবর্তী সময়ে স্টার্টআপভিত্তিক বিভিন্ন প্রণোদনা একাধিক সরকারের পরিবর্তনের পরও টিকে ছিল। কারণ প্রযুক্তি খাতকে সেখানে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাতের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি প্রায়ই ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থায়ন ছিল অনিয়মিত, ব্যবস্থাপনা ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ, আবার কিছু সুবিধা প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হলেও সেই গবেষণাকে বাণিজ্যিক পণ্য বা প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়ার কার্যকর কাঠামো গড়ে ওঠেনি। গবেষণাগার ও শিল্পখাতের মধ্যে যে প্রাতিষ্ঠানিক সেতুবন্ধন প্রয়োজন, তা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল।
নেতৃত্ব ও নীতিনির্দেশনায় রাজনৈতিক প্রভাব
প্রযুক্তি খাতকে পরিচালনা ও সহায়তা করার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সংস্থার নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অনেক সময় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে যারা মান নির্ধারণ, প্রণোদনা বণ্টন বা অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন, তাঁদের সবার পক্ষে প্রকৃত উদ্ভাবনের সম্ভাবনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না।
এর ফলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হন। কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, কোন ধরনের উদ্ভাবন রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবে কিংবা ভবিষ্যৎ নীতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে নীতিগত অবস্থান বদলে যাওয়ার প্রবণতাও উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় কাঠামোগত অসুবিধার মুখে পড়তে পারে, প্রযুক্তির মান বা উদ্ভাবনী সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও।
তদবির ও নীতিনির্ধারণের নিয়ন্ত্রণ
শিল্পখাতের বিভিন্ন সংগঠন অনেক ক্ষেত্রে বৃহত্তর উদ্ভাবনী পরিবেশের প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে সীমিতসংখ্যক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। ফলে আমদানি নীতি, কর কাঠামো এবং লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের তুলনায় প্রতিষ্ঠিত আমদানিকারক ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সুবিধা পেতে পারে।
দেশীয়ভাবে নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য তৈরির চেয়ে বিদেশে তৈরি প্রযুক্তি দেশে আনা এবং সংযোজনের ব্যবসা অনেক সময় নীতিগতভাবে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। এর পেছনে আমদানিকারকদের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং দ্রুত তদবির করার সক্ষমতা ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলাফল হিসেবে এমন একটি নীতিগত পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে প্রযুক্তি নকশা, গবেষণা ও উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিবর্তে বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি ও বাজারজাতকরণ বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে।
আমদানি নির্ভরতা ও অবৈধ চোরাচালানের বিস্তার
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রযুক্তি অর্থনীতি এখনও ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে প্রস্তুত ডিভাইস এবং প্রাতিষ্ঠানিক সফটওয়্যার লাইসেন্স পর্যন্ত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। দেশীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
যখন উচ্চ শুল্ক, লাইসেন্স জটিলতা বা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে বৈধ আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়, তখন দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ বাজার সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করে। চোরাই পথে ইলেকট্রনিক পণ্য ও যন্ত্রাংশ দেশে প্রবেশের ফলে বৈধ আমদানিকারক ও দেশীয় সংযোজনকারী উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হয়।
যে রাজস্ব প্রযুক্তি গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করা যেত, তার একটি অংশ হারিয়ে যায় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির কারণে। এর ফলে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়। দেশীয় উদ্ভাবন দুর্বল থাকায় আমদানি নির্ভরতা বাড়ে। বৈধ আমদানি নানা বাধার মুখে পড়লে চোরাচালানের সুযোগ তৈরি হয়। আর রাজস্ব হারানোর কারণে উদ্ভাবন ও গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
প্রতিবেশী দেশগুলো কীভাবে এগিয়েছে
ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান প্রত্যেকেই নিজ নিজ সময়ে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তবে প্রযুক্তি খাতের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল নীতির ধারাবাহিকতা। এই দেশগুলো প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। শিল্প ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোও কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে নির্দিষ্ট মাত্রার স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষ করে ভারত সফটওয়্যার শিল্প ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে শুরু থেকেই কৌশলগত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যেন পুরো খাতের নীতিগত ভিত্তি বদলে না যায়, সে ধরনের একটি কাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে।
উপসংহার
আঞ্চলিক প্রযুক্তি নেতৃত্বের বাজার ধরতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার মূল কারণ প্রতিভার অভাব নয়। সমস্যার গভীরে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে হলে প্রযুক্তি খাত পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। উদ্ভাবনভিত্তিক প্রণোদনা ব্যবস্থা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যনীতি ও অনানুষ্ঠানিক চোরাচালাননির্ভর বাজারের মধ্যকার ব্যবধান কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মেধাবী তরুণ, দক্ষ প্রযুক্তিকর্মী এবং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার অভাব নেই। এখন প্রয়োজন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, যেখানে উদ্ভাবন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, সক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও বাস্তব সম্ভাবনার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে। প্রযুক্তি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে পারলেই বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রযুক্তি বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পাবে।
