ওয়াহিদুল ইসলাম
ডিটেক বাংলাদেশ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বাংলাদেশের জীবনযাত্রাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি সেবা ও প্রশাসন পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে এমন কিছু ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে, যেগুলো নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। দৈনন্দিন জীবনে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সময়ে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন ও বিকাশমান কাঠামোও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
এই দুই প্রবণতার সমন্বিত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে এআই গবেষণার দিক ও অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি। সেই আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যেই এই নিবন্ধ।
এআই, চিন্তার স্বাধীনতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
এআইয়ের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা এমন একটি প্রবণতা তৈরি করছে, যাকে গবেষকেরা ক্রমশ ‘কগনিটিভ সারেন্ডার’ বা চিন্তাগত আত্মসমর্পণ হিসেবে অভিহিত করছেন। এর অর্থ হলো, ধীরে ধীরে নিজের বিশ্লেষণী ও যুক্তিবোধের ওপর নির্ভরতা কমে গিয়ে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা রচনা লেখার ক্ষেত্রে এআইয়ের সহায়তা নিয়েছেন, তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ স্বাধীনভাবে লেখা শিক্ষার্থীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। একই সঙ্গে এআইয়ের সহায়তায় তৈরি করা লেখার বিষয়বস্তু মনে রাখার ক্ষেত্রেও তাদের দুর্বলতা দেখা গেছে।
এই প্রবণতা এআই নির্ভরতার কারণে স্মৃতি ও শেখার সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করে। গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদি ‘কগনিটিভ লেজিনেস’ বা চিন্তাগত অলসতা নিয়েও সতর্ক করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিজের চিন্তার পরিবর্তে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা ভবিষ্যতে জটিল মানসিক ও জ্ঞানীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ দ্রুত এআইনির্ভর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। অথচ শৈশব ও কৈশোর মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই পর্যায়ে স্বাধীন চিন্তার জায়গা যদি নিয়মিতভাবে এআইয়ের সহায়তা দিয়ে পূরণ করা হয়, তাহলে একটি প্রজন্মের সমালোচনামূলক চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকি শুধু জ্ঞানীয় সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ কমিয়ে দিতে পারে, সামাজিকভাবে সমস্যা সমাধানের প্রচলিত অভ্যাস দুর্বল করতে পারে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের একটি নিষ্ক্রিয় সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এর ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে এবং মানুষের মানসিক দৃঢ়তা ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেখানে ইতোমধ্যেই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে, সেখানে প্রযুক্তিনির্ভরতার সম্ভাব্য মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তথ্য সুরক্ষার ঘাটতি
বাংলাদেশে ব্যবহৃত যেকোনো এআই ব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও তৈরি করবে। অথচ এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য দেশের নতুন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আইনটির প্রয়োগ কাঠামো নিয়ে ইতোমধ্যে সমালোচনা রয়েছে। আইনের ৪৯ ধারায় জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার মতো কারণ দেখিয়ে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে সরকারের নির্দেশনা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই বিধান কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে এবং একটি কার্যকর স্বাধীন তদারকি সংস্থার পরিবর্তে তাকে অনেকটা অভিযোগ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
এর বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (GDPR) তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জরিমানাও আরোপ করা যায়। কেনিয়াও ২০১৯ সালে একটি স্বাধীন তথ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে।
বাংলাদেশের তথ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাও ইতোমধ্যে নানা ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে। শপনোর তথ্য ফাঁস, ফেসবুকে ভোটার তালিকা বিক্রির অভিযোগ এবং টেলিগ্রাম বট ও বিভিন্ন API ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বারবার প্রকাশ পাওয়ার ঘটনা একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
এ ছাড়া তথ্যের তথাকথিত ‘শ্যাডো কপি’ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বৈধ যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা তথ্য অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নজরদারি বা অডিট ব্যবস্থা ছাড়াই দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃত নেটওয়ার্কে এমন তথ্যের অনিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এগুলোকে কেবল বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এগুলো দেশের তথ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এমন দুর্বল তথ্যব্যবস্থার ওপর এআই মডেল প্রশিক্ষিত হলে কিংবা এসব তথ্যভান্ডারে এআইয়ের প্রবেশাধিকার দেওয়া হলে নজরদারি, বৈষম্য এবং মানসিক ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
তথ্য ফাঁস হলে নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে জানানোর সুস্পষ্ট বিধানের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কোনো এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলেও নাগরিক হয়তো তা জানতেই পারবেন না। ফলে নিজের তথ্য সুরক্ষা কিংবা কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশে এআই গবেষণার অগ্রাধিকার কোথায় হওয়া উচিত
এই ঝুঁকি এবং দেশের দুর্বল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাস্তবতায় বাংলাদেশকে শুধু বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া জেনারেটিভ এআইয়ের উন্মাদনার পেছনে ছুটলে চলবে না। বরং এমন ক্ষেত্রকে গবেষণার অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেখানে এআইয়ের সামাজিক সুফল সবচেয়ে বেশি এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
- কৃষি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দেশের কর্মশক্তির একটি বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মেশিন লার্নিংভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে বপনের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ, ফসলের রোগ শনাক্তকরণ এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা সম্ভব।
- স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নির্ণয় আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চিকিৎসক ও রোগীর অনুপাত অন্যতম কম। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অতিরিক্ত চাপের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে এআই বুকের এক্স-রে বিশ্লেষণ, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক পরীক্ষায় চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে।
- বন্যা পূর্বাভাস বাংলাদেশের জন্য জাতীয় গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বদ্বীপভূমির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। আরও নির্ভুল পূর্বাভাস ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে আগাম সতর্কতা, উদ্ধার কার্যক্রম এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
- বাংলা ভাষাভিত্তিক অভিযোজিত শিক্ষা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। স্থানীয় ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এআইনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দায়িত্বশীল এআই ব্যবস্থার জন্য অগ্রাধিকার
প্রথমত, উচ্চমানের ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বাংলা ভাষার করপাস তৈরিতে জরুরি বিনিয়োগ প্রয়োজন। শক্তিশালী ভাষাগত তথ্যভান্ডার ছাড়া আইনি নথি বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনগণের জন্য সরকারি সেবার চ্যাটবট তৈরি পর্যন্ত এআইয়ের বহু সম্ভাবনাময় ব্যবহার সীমিত থেকে যাবে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাকারী এবং ক্রিপ্টোগ্রাফিকভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য কাঠামো নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। বর্তমান দুর্বল তথ্য অবকাঠামো থেকে একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য প্রযুক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি শক্তিশালী গবেষণার প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, এআই ব্যবহারের নৈতিক নির্দেশনা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। তরুণদের এআইয়ের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা দিতে হবে, যাতে প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রতিস্থাপন না করে বরং তাকে আরও কার্যকর করে তোলে। চতুর্থত, এআইয়ের দায়বদ্ধতা, প্রশিক্ষণ তথ্যের গোপনীয়তা এবং অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি নিয়ে বিদ্যমান আইনি শূন্যতা পূরণ করতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনকে একটি চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি চলমান নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সবশেষে, গভীর প্রযুক্তি গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ধৈর্য প্রয়োজন। ই-কমার্স ও ফিনটেকের মতো দ্রুত মুনাফা অর্জনকারী খাতের পেছনে ছুটলেই হবে না। গবেষণা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং নৈতিক শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের এআই উদ্ভাবন শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে কাজ করবে, নাকি নতুন ধরনের শোষণের পথ তৈরি করবে।
প্রশ্নটি এখন আর এআই বাংলাদেশকে কীভাবে বদলে দেবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমনভাবে এআইকে গড়ে তুলতে ও ব্যবহার করতে পারবে, যা মানুষের চিন্তাশক্তি, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা সুরক্ষিত রাখবে?
এর উত্তর নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে এবং আইন প্রণয়নের টেবিলে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের এআই ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।
