ওয়াহিদুল ইসলাম
ডিটেক বাংলাদেশ
২০২৬ সালের আগস্টের এক বৃহস্পতিবার বিকেলে সামিট এলএনজি টার্মিনালে গ্যাস সরবরাহ ফুরিয়ে গেলে তাৎক্ষণিক খবর ছিল একটি এলএনজি কার্গো আটকে যাওয়া এবং গ্যাসের জন্য একটি দেশের হাহাকার। কিন্তু এর পেছনের আরও গভীর প্রশ্নটি জনআলোচনায় খুব একটা উঠে আসেনি। কার্গোটি প্রথমে আটকে গেল কেন?
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামাপূর্ণ স্পট মার্কেট থেকে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কেনে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়মতো কার্গো নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এই একটি বাস্তবতার পেছনে রয়েছে আর্থিক ও আইনি দুর্বলতার একটি জটিল জাল। দেশের ঋণমান, ব্যাংক খাতের আর্থিক দুর্বলতা এবং পণ্য বাণিজ্যের সীমিত আইনি কাঠামো একসঙ্গে ব্যাখ্যা করে কেন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বারবার একটি নির্দিষ্ট পেমেন্ট সময়মতো ছাড় হওয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
অনিকেত বুলেটিনে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের ভিত্তিতে এই লেখায় সংকটের আর্থিক ও আইনি দিকগুলো আরও গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ঋণমান ও বাকিতে গ্যাস কেনার খরচ
আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহকারীরা সাধারণত ক্রেতার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কার্গোর মূল্য পরিশোধের শর্ত নির্ধারণ করে। কোনো দেশের সার্বভৌম ঋণমান দুর্বল হলে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ঋণপত্র, বাণিজ্যিক গ্যারান্টি এবং সুবিধাজনক অর্থ পরিশোধের সময়সীমা পাওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ঋণমান দুর্বল হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি আমদানিকারক উভয়কেই বেশি জামানত দিতে হয়। পেমেন্টের জন্য পাওয়া সময় কমে আসে এবং সাময়িক বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দিতে যে নমনীয় শর্ত সাধারণত পাওয়া যায়, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে সেই সুবিধাও কমে যায়।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের গ্যাস সংকটে ইতিমধ্যে দৃশ্যমান স্পট মার্কেটের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শক্তিশালী ঋণমানের একটি দেশ সরবরাহকারীর আস্থার ওপর ভর করে পেমেন্টে সাময়িক বিলম্ব সামাল দিতে পারে। কিন্তু ঋণমান দুর্বল হতে থাকা একটি দেশ ঠিক যখন সেই সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই সেই নিরাপত্তা হারায়।
ব্যাংক খাতের আর্থিক দুর্বলতা ও ঋণপত্রের সংকট
দেশের হাতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা থাকলেও গ্যাস আমদানির জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে ঋণপত্র বা এলসি খুলতে এবং সেই দায় পরিশোধ করতে হয় দেশীয় ব্যাংককে। এখানেই সংকটের দ্বিতীয় স্তর সামনে আসে।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের বোঝা এবং সুশাসনের দুর্বলতার সঙ্গে লড়ছে। ফলে কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকির তুলনায় মূলধন পর্যাপ্ত নয়। এসব বিষয় শুধু ব্যাংকের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহকারীর আচরণেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
কারণ সরবরাহকারীরা শুধু বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিবেচনা করে না। যে নির্দিষ্ট ব্যাংক এলসি খুলছে, সেই ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাও যাচাই করে। তারপরই তারা কার্গো ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
জ্বালানি আমদানির অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকগুলো নিজেরাই যখন চাপের মধ্যে থাকে, তখন তার প্রভাব লেনদেনের প্রতিটি ধাপে দেখা যায়। এলসি খোলার প্রক্রিয়া ধীর হয়, বিদেশি সহযোগী ব্যাংকগুলো ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত নিশ্চয়তা চায় এবং কার্গো ছাড়তে বিলম্ব হয়। সামিটের টার্মিনালকে যে ধরনের পেমেন্ট সংকটের কারণে বিপাকে পড়তে হয়েছিল, সেই একই সমস্যার সঙ্গে এই বিলম্বের সরাসরি যোগ রয়েছে।
অর্থাৎ ব্যাংক খাতের দুর্বলতা শুধু আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে থাকে না। তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি নিরাপত্তায়ও। দেশের একটি অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা শেষ পর্যন্ত বাস্তব জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতিতে পরিণত হয়।
পণ্য বাণিজ্যের প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামোর ঘাটতি
ঋণমান ও ব্যাংকিং সক্ষমতার বাইরে বাংলাদেশের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো পণ্য বাণিজ্যের জন্য পরিণত আইনি ও চুক্তিগত কাঠামোর অভাব। বিশ্বের অনেক দেশে এলএনজি ও এলপিজি আমদানির জন্য যে ধরনের পূর্বানুমানযোগ্য বাণিজ্য কাঠামো রয়েছে, বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির মানসম্মত কাঠামো, কার্যকর সালিশি ব্যবস্থা, মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলায় আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্পষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো এখনো যথেষ্ট উন্নত নয়।
ফলে আমদানিকারকদের অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে স্পট মার্কেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হয়। অথচ একাধিক রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈচিত্র্যময় সরবরাহ চুক্তি থাকলে জ্বালানি সরবরাহ অনেক বেশি পূর্বানুমানযোগ্য হতে পারত।
আইনি কাঠামোর এই দুর্বলতাই ব্যাখ্যা করে কেন স্পট মার্কেটনির্ভর আমদানি বাংলাদেশের জন্য ব্যতিক্রম নয়, বরং প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ঘাটতি ও অনিয়ম
দুটি টার্মিনালনির্ভর গ্যাস আমদানি ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য যে ধরনের বিকল্প সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এখনো সেই পর্যায়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।
সামিট ও এক্সিলারেটের ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় এতটাই দুর্বল ছিল যে একটির কারিগরি সমস্যার সঙ্গে অন্যটির সরবরাহ ফুরিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায় একই সময়ে ঘটে। ফলে একটি কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা সংকটের চাপ শোষণ করতে পারেনি। তার প্রভাব পড়ে পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়।
একই সঙ্গে একাধিক রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান উদ্যোগও যথেষ্ট নয়। এলএনজি আমদানির অর্থায়নের জন্য দেশীয় ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা স্থলভিত্তিক টার্মিনাল ও গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন দ্রুত করার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় গতি দেখা যায়নি।
মন্ত্রণালয় ব্যর্থ কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রমাণ বরং একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়াশীল সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ সংকট দেখা দেওয়ার পর তার লক্ষণ মোকাবিলা করা হচ্ছে, কিন্তু যে আর্থিক ও আইনি কাঠামো থেকে সংকট বারবার তৈরি হচ্ছে, তার স্থায়ী সমাধানে যথেষ্ট দূরদর্শিতা দেখা যাচ্ছে না।
সরকারের এখনই যা করা দরকার
সরকারকে প্রথমেই জ্বালানি আমদানির জন্য নির্দিষ্টভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এলএনজি ও এলপিজির পেমেন্টকে সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ থেকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ একটি কার্গো বিলম্বিত করে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যায়, শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে অর্থনীতির ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
জ্বালানি বাণিজ্যের অর্থায়নে যুক্ত ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন হলে লক্ষ্যভিত্তিক মূলধন সহায়তা বা সরকারি গ্যারান্টি দিতে হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অংশীদার ব্যাংক ও সরবরাহকারীদের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব।
একই সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে জরুরি ভিত্তিতে একাধিক রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। স্পট মার্কেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
সামিট ও এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনাল পরিচালনাকারীদের মধ্যে সমন্বয়ের জন্যও বাধ্যতামূলক ও সুস্পষ্ট কার্যপ্রণালি তৈরি করা প্রয়োজন। যাতে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ বা কারিগরি ত্রুটির সময় দুই উৎসের সংকট একসঙ্গে না পড়ে।
বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এখন শুধু আরও নতুন টার্মিনাল নির্মাণের দিকে তাকালে চলবে না। তার চেয়েও জরুরি হলো সেই আর্থিক ও আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, যার ওপর নির্ভর করছে আগে থেকেই চুক্তিবদ্ধ গ্যাস সময়মতো দেশে পৌঁছাবে কি না।
তথ্যসূত্র:
