জুনায়েদ হাবিব
মিডলসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
এক দশকেরও কম সময়ে বাংলাদেশের স্ট্রিমিং শিল্প কয়েকটি পরীক্ষামূলক অ্যাপ থেকে একটি সম্ভাবনাময় ডিজিটাল অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। দেশীয় প্ল্যাটফর্ম যেমন বিস্কোপ, চরকি, বঙ্গ ও টফি এখন নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই বাজারের বর্তমান আকার প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। আগামী কয়েক বছরে তা প্রায় ২০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, তুলনামূলক কম দামে মোবাইল ডাটা সুবিধা, ইন্টারনেট প্যাকেজের সঙ্গে স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন যুক্ত করার টেলিকম অংশীদারিত্ব এবং বাংলা ভাষার কনটেন্টের প্রতি তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক আগ্রহ। এখন নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতি কতটা দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই করা সম্ভব হবে। নাকি শিল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা এর সম্ভাবনাকে সীমিত করে দেবে।
অর্থ কোথা থেকে আসে এবং কোথায় যায়
বর্তমানে ওটিটি খাত মূলত দুটি সমান্তরাল আয়ের মডেলের ওপর পরিচালিত হচ্ছে। চরকি ও হইচইয়ের মতো সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো মাসিক বা বার্ষিক ফি গ্রহণ করে এবং সেই আয়ের একটি অংশ নতুন চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণে বিনিয়োগ করে। এর ফলে পরিচালক, অভিনয়শিল্পী, সম্পাদক এবং প্রযুক্তিগত কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যারা একসময় প্রায় সম্পূর্ণভাবে টেলিভিশন ও সিনেমা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
অন্যদিকে টফি ও বিস্কোপের মতো বিজ্ঞাপনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো লাইভ খেলা ও বিনামূল্যের কনটেন্ট থেকে বিজ্ঞাপন আয়ের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে। এর ফলে যারা সাবস্ক্রিপশনের জন্য অর্থ ব্যয় করতে চান না বা পারেন না, তারাও ডিজিটাল কনটেন্ট উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন। উভয় মডেলই টেলিকম অংশীদারিত্বের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ দর্শক হোম ব্রডব্যান্ডের পরিবর্তে মোবাইল ডাটার মাধ্যমে এসব সেবা গ্রহণ করেন।
তবে একই সঙ্গে সাবস্ক্রিপশন আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। শুধু নেটফ্লিক্স বাংলাদেশের গ্রাহকদের কাছ থেকে বছরে দুই কোটি মার্কিন ডলারের বেশি আয় করে বলে ধারণা করা হয়। এই অর্থের বড় অংশ স্থানীয় কনটেন্ট উৎপাদন, কর প্রদান বা কর্মসংস্থান তৈরিতে পুনর্বিনিয়োগ হয় না।
দেশে নিবন্ধিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া পরিচালিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর স্থানীয় কনটেন্ট ইকোসিস্টেমে অবদান রাখার চাপ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ তারা একই দর্শক ও ভোক্তা ব্যয়ের জন্য দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে।
শিল্পের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা
পাইরেসি বা অবৈধ কনটেন্ট প্রচার এখনো এই খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। অনুমোদনহীন টরেন্ট সাইট ও অবৈধ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এমন দর্শকদের আকৃষ্ট করছে, যারা বৈধভাবে কনটেন্ট দেখতে অর্থ প্রদান করতে পারতেন। ফলে স্থানীয় প্রযোজনার জন্য প্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দুর্বল ডিজিটাল কপিরাইট প্রয়োগের কারণে জনপ্রিয় কোনো ওয়েব সিরিজ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবৈধভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে প্রযোজকদের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং কনটেন্টের বাণিজ্যিক জীবনকাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বিভিন্ন সময়ে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপর আলাদা কর বা ফি আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করেছে। ন্যায্য কর কাঠামো অবশ্যই একটি যৌক্তিক নীতিগত লক্ষ্য। তবে শিল্প যখন এখনও গ্রাহকভিত্তি তৈরি করছে, তখন অপরিকল্পিত বা অতিরিক্ত কর আরোপ করলে সাবস্ক্রিপশনের খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মূল্য সংবেদনশীল দর্শকদের একটি অংশ বৈধ প্ল্যাটফর্ম থেকে আবারও পাইরেসির দিকে ফিরে যেতে পারে।
কনটেন্ট শ্রেণিবিন্যাস বা বয়সভিত্তিক নির্দেশনাও এখনো স্পষ্ট নয়। কোন ধরনের কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার করা যাবে, সে বিষয়ে অস্পষ্টতা প্রযোজকদের জন্য আইনি ঝুঁকি তৈরি করছে এবং বড় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
শিল্পের টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংস্কার
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য সম্প্রচার টেলিভিশনের নিয়ম থেকে আলাদা একটি সুস্পষ্ট ও আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। এই কাঠামোর মাধ্যমে কনটেন্ট শ্রেণিবিন্যাস, লাইসেন্সিং এবং ভোক্তা সুরক্ষার বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পুরোনো সম্প্রচারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলতে হবে।
বড় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো যদি বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করে, তবে তাদের কাছ থেকে ন্যায্য রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে যারা স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে যারা বাংলাদেশি কনটেন্ট, অভিনয়শিল্পী ও নির্মাণ দলের পেছনে বিনিয়োগ করবে, তাদের জন্য কর ছাড় বা বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ডিজিটাল পাইরেসি বন্ধে আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ জন্য ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বিশেষায়িত ডিজিটাল পাইরেসি প্রতিরোধ ইউনিট গঠন করা যেতে পারে, যা দ্রুত অবৈধ কনটেন্ট অপসারণে কাজ করবে।
পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দর্শকদের বোঝাতে হবে যে পাইরেসি স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাণ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে আরও বিস্তৃত সংযোগ তৈরি করা গেলে সাবস্ক্রিপশন গ্রহণ আরও সহজ হবে।
বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের কনটেন্টের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের কনটেন্ট শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন।বাংলা ভাষাভাষী দর্শক শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসী এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্রের বড় বাজার রয়েছে।
ভারতীয় প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে যৌথ প্রযোজনা, আন্তর্জাতিক কনটেন্ট মার্কেটে অংশগ্রহণ এবং বিদেশে বাংলাদেশি কনটেন্ট প্রচারে সরকারি সহায়তা এই শিল্পকে একটি রপ্তানিমুখী খাতে রূপান্তর করতে পারে। বাংলাদেশের ওটিটি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ, প্রতিভা, দর্শক এবং প্রাথমিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে।
এখন প্রয়োজন এমন নীতিগত শৃঙ্খলা, যা স্থানীয় আয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, নিয়ন্ত্রক পরিবেশকে স্পষ্ট করবে এবং শিল্পের বিকাশকে অনিশ্চয়তার ওপর ছেড়ে না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
