ড. নুরুজ্জামান খান
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের চারটি প্রধান বিনিয়োগ সংস্থা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাই টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) একীভূত করে ইউনিফাইড ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ইউআইডিএ) নামে একটি নতুন সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সংস্কারের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বাংলাদেশকে একটি সমন্বিত বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা।
তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই একীভূতকরণের সম্ভাব্য সুবিধা মূলত সীমিত প্রশাসনিক পর্যায়ে। বিপরীতে এর অর্থনৈতিক ব্যয়, প্রতিযোগিতামূলক ঝুঁকি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষয় এবং বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে, যা প্রস্তাবটির সমর্থকেরা হয়তো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন না।
এই নিবন্ধে বিষয়টি নিয়ে একটি প্রাথমিক আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ও গভীর আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়।
সম্ভাব্য সুবিধা: প্রশাসনিক সমন্বয়, কাঠামোগত পরিবর্তন নয়
এই একীভূতকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন প্রকল্পের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী একাধিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। অনুমোদন, জমি বরাদ্দ এবং অবকাঠামোগত সেবা সমন্বয়ের জন্য একটি একক যোগাযোগকেন্দ্র থাকলে বিনিয়োগকারীদের সময় ও ব্যয় দুটোই কমবে।
একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে কাস্টমস ছাড়পত্র, পরিবেশগত অনুমোদন এবং বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া গেলে জবাবদিহি বাড়বে। বর্তমানে বিভক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে, তা কমানো সম্ভব হতে পারে।
চারটি সংস্থার পৃথক প্রশাসনিক কার্যক্রম একীভূত করার মাধ্যমে কিছু ব্যয় সাশ্রয়ও হতে পারে। তবে এই সুবিধাগুলো মূলত প্রক্রিয়াগত সমস্যা সমাধান করবে, কাঠামোগত সমস্যার নয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান বাধা কেবল সঠিক সংস্থা খুঁজে পাওয়া নয়, বরং সঠিক সংস্থা খুঁজে পাওয়ার পরও কাজ সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় ও জটিলতার মুখোমুখি হওয়া। বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সেবা প্রদান করে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০টির বেশি। প্রস্তাবিত একীভূতকরণ কেবল চারটি সংস্থাকে একত্র করছে। বাকি লাইসেন্স, নিবন্ধন ও অনুমোদনের জটিলতা আগের মতোই থাকবে। একটি গোলকধাঁধার সামনে একটি নতুন প্রবেশদ্বার তৈরি করলেই পথ সহজ হয়ে যায় না।
অর্থনৈতিক ব্যয়: একীভূতকরণের চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষয়
ভিন্ন আইনগত কাঠামো, কর্মসংস্থান ব্যবস্থা এবং আলাদা কর্মসংস্কৃতির চারটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাকে একীভূত করা সহজ বা ব্যয়হীন কোনো প্রক্রিয়া নয়। পরিবর্তনের সময় কর্মীদের পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সমন্বয় এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পুনর্নির্ধারণের কারণে নতুন ধরনের বিলম্ব ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে যে বিনিয়োগকারী জানেন বিডা কীভাবে ওয়ার্ক পারমিট প্রক্রিয়া করে বা বেজা কীভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ দেয়, তাঁরা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারেন, যেখানে পুরোনো নিয়ম আর কার্যকর থাকবে না, আবার নতুন ব্যবস্থাও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে উঠবে না।
এর চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো, বিশেষায়িত দক্ষতার ক্ষয়। চারটি সংস্থাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলাদা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। বেজার রয়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, হাই টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, আর পিপিপিএ জটিল সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামো তৈরিতে বিশেষায়িত ভূমিকা রেখেছে।
এসব দক্ষতাকে একটি সাধারণ বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার অধীনে নিয়ে এলে বিশেষায়িত জ্ঞান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একটি সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রকল্পে কাজ করা কর্মকর্তা যদি এমন একটি বোর্ডের অধীনে কাজ করেন, যার প্রধান অগ্রাধিকার বিনিয়োগ আকর্ষণ, তাহলে তাঁর ভূমিকা আর আগের মতো থাকবে না।
এই একীভূতকরণ ধরে নিচ্ছে যে সমন্বয় এবং বিশেষায়ন একে অপরের বিকল্প। বাস্তবে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
প্রতিযোগিতামূলক ঝুঁকি: পিপিপি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার মাধ্যমে। বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত কম এবং সহজ শর্তের বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ কমে আসছে। ফলে অবকাঠামো উন্নয়নে পিপিপি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ৪১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি প্রকল্প পাইপলাইন তৈরিতে সহায়তা করেছে। এই পরিমাণ শুধু পরিকল্পনার প্রতিফলন নয়, বরং বেসরকারি অংশীদারদের আস্থারও প্রতিফলন, যারা এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছে যার দায়িত্ব ও কাঠামো স্পষ্ট। এই প্রতিষ্ঠানকে একটি বৃহত্তর কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ে গেলে সরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা পিপিপি প্রকল্পে অংশ নেন চুক্তির নিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ওপর আস্থা রেখে। এমন একটি কর্তৃপক্ষ, যার সিদ্ধান্তে সরকারের প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকতে পারে, তার প্রতিশ্রুতি বেসরকারি অংশীদারদের কাছে সব সময় পুনর্বিবেচনাযোগ্য বলে মনে হতে পারে।
এই প্রতিযোগিতামূলক ক্ষতি কেবল তাত্ত্বিক নয়। এর অর্থ হতে পারে, একজন বিনিয়োগকারী যেখানে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতেন, সেখানে তিনি অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আরও স্থিতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের আশায়।
স্বার্থের ভারসাম্যহীনতা: বিনিয়োগ প্রচার বনাম নিয়ন্ত্রণ
প্রস্তাবিত একীভূত কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে বিনিয়োগ প্রচার, প্রকল্প অনুমোদন, নীতি প্রণয়ন এবং অবকাঠামো সমন্বয়। ফলে একই প্রতিষ্ঠানের হাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে।
এই কাঠামো স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ প্রচারের দিকে বেশি ঝুঁক তৈরি করবে। যে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য পরিমাপ করা হবে কত বেশি বিনিয়োগ আনা গেল, তার ওপর ভিত্তি করে, সেই প্রতিষ্ঠান দ্রুত অনুমোদন দেওয়া, যাচাই কমানো এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন, শ্রম অধিকার কিংবা যথাযথ যাচাইয়ের মতো সুরক্ষামূলক প্রক্রিয়াকে সহজ করার চাপ অনুভব করতে পারে।
বর্তমান চারটি সংস্থার বিভক্ত কাঠামোতে কিছুটা ভারসাম্য ছিল। বিডা বিনিয়োগ প্রচার করেছে, বেজা জমি ও অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা করেছে, পিপিপিএ সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের ঝুঁকি কাঠামো তৈরি করেছে। একক কর্তৃপক্ষের অধীনে এই ভারসাম্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিনিয়োগে প্রভাব: স্বল্পমেয়াদি আস্থা, দীর্ঘমেয়াদি সংশয়
স্বল্পমেয়াদে এই একীভূতকরণ ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে। বিনিয়োগ কাঠামো সংস্কারে সরকার আগ্রহী, এমন ধারণা তৈরি হতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত কেবল ইতিবাচক বার্তার ওপর নির্ভর করে না। বিনিয়োগকারীরা বিবেচনা করেন প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরযোগ্যতা, নিয়ন্ত্রক স্থিতিশীলতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের স্বাধীনতা। আর একটি রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত বৃহৎ কর্তৃপক্ষের অধীনে একীভূতকরণ এসব বৈশিষ্ট্যকে দুর্বল করতে পারে।
এই প্রস্তাব মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিভক্তির একটি উপসর্গের সমাধান করতে চায়। কিন্তু মূল সমস্যা, অর্থাৎ ৫০টির বেশি সংস্থার মধ্যে বিভক্ত এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মিলে যাওয়া দায়িত্বের জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামো, তেমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে না।
বিনিয়োগ কেবল একটি প্রবেশদ্বার অনুসরণ করে আসে না। বিনিয়োগ আসে ফলাফলের ভিত্তিতে। আর সেই ফলাফল নির্ভর করে, যে প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকল্প অনুমোদন করছে, সেই প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কতটা বিশ্বাসযোগ্য। বর্তমান প্রস্তাব সেই আস্থা তৈরির বিষয়ে এখনো যথেষ্ট নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
