রিমশা সিথি
নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
ডিজিটাল পরিসরে ব্যক্তির স্বাধীনতা কি কখনো সামষ্টিক সামাজিক মূল্যবোধের কাছে কিছুটা ছাড় দিতে হতে পারে? পশ্চিমা গবেষণার প্রচলিত ধারায় এমন প্রশ্ন খুব একটা সামনে আসে না। উদারনৈতিক চিন্তাধারায় ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রায় অলঙ্ঘনীয়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবেন, সেই সিদ্ধান্তের পরিণতিও তাঁকেই বহন করতে হবে, আর সমাজ হস্তক্ষেপ করবে তখনই, যখন সুস্পষ্ট ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যাবে।
কিন্তু বাংলাদেশে অনলাইনে অবৈধ ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই প্রচলিত কাঠামোকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। দ্য অনিকেত বুলেটিনে প্রকাশিত ফারাহ জেহিরের প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিবাহবহির্ভূত ও অনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়, পরিবারে অস্থিরতা তৈরি করে এবং বিশেষ করে নারীদের সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাইরের একজন পর্যবেক্ষকের কাছে প্রবন্ধটির তাৎপর্য শুধু আলোচিত বিষয়টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে এই ঘটনাগুলো ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে, সেটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে সামনে আসে।
সাংস্কৃতিক বাধা: যেখানে মর্যাদাই হয়ে ওঠে কারাগার
মূল প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে অনলাইনে অবৈধ সম্পর্কের পেছনে নিঃসঙ্গতা, দাম্পত্য অসন্তোষ, মানসিক অবহেলা এবং ডিজিটাল মাধ্যমের দেওয়া পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের অন্য সমাজেও এসব মানসিক কারণ অপরিচিত নয়। পার্থক্য তৈরি হয় সেই সাংস্কৃতিক পরিসরে, যেখানে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়। বাংলাদেশে সামাজিক মর্যাদা শুধু ব্যক্তির নিজস্ব বিষয় নয়, বরং তা অনেকাংশেই একটি পারিবারিক ও সামষ্টিক সম্পদ।
সামাজিক সুনাম, পারিবারিক সম্মান এবং সামাজিক অবস্থান এখানে পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজনের কথিত অনৈতিক আচরণও একটি পুরো পরিবার কিংবা আত্মীয়তার বন্ধনকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। অনলাইনের কোনো সম্পর্ক যখন প্রকাশ্যে চলে আসে, তখন তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিব্রত করে না; বরং একটি পরিবারের সামাজিক ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দিতে পারে।
এই সাংস্কৃতিক কাঠামো মানসিক যন্ত্রণাকে আরও তীব্র করে। মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো সম্পর্ক প্রকাশ্যে চলে এলে দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর শিশুরাও নিরাপত্তাহীনতা, আচরণগত সমস্যা এবং পড়াশোনায় অবনতির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। আরও গুরুতর ক্ষেত্রে আত্মক্ষতি এবং আর্থিক শোষণের ঘটনাও সামনে আসে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য। একই ধরনের ঘটনায় পুরুষের তুলনায় নারীদের সামাজিক সমালোচনা, দোষারোপ এবং অনলাইন হয়রানির মুখে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। ফলে সাংস্কৃতিক কাঠামো শুধু কোনো বিচ্যুতির প্রতিক্রিয়া জানায় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা অসমভাবে শাস্তিও দেয়। যে সামাজিক ব্যবস্থা মর্যাদা রক্ষার কথা বলে, শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থাই কখনো কখনো ব্যক্তির মর্যাদা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ব্যক্তিস্বাধীনতার যুক্তি: একটি গভীর পর্যালোচনা
মূল প্রবন্ধে স্বীকার করা হয়েছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মূল্যবোধ। তবে সেই স্বাধীনতার পাশাপাশি জীবনসঙ্গী, পরিবার এবং বৃহত্তর সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধও রয়েছে। প্রবন্ধটি এমন কোনো সংস্কারের পক্ষে নয়, যেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বরং সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নৈতিক আচরণ এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, যার সম্পূর্ণ উত্তর প্রবন্ধে পাওয়া যায় না। কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রয়োগের জন্য যদি সামাজিক মূল্য দিতে হয় অত্যন্ত কঠিন এবং গভীর, তাহলে সেই স্বাধীনতাকে কতটা অর্থপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব?
এমন সংস্কৃতির বাইরে থাকা একজন গবেষকের দৃষ্টিতে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি যদি নিঃসঙ্গতা, মানসিক অবহেলা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতার কারণে অনলাইনে কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সেই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছার প্রকাশ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাই তখন প্রভাবিত হতে পারে সেই পরিস্থিতি দ্বারা, যা তাকে ওই সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সুতরাং, এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ দায়ী করা যেমন তার বাস্তব অবস্থাকে অস্বীকার করে, তেমনি সব দায় থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়াও সঙ্গত নয়। কারণ তার সিদ্ধান্তের ফলে জীবনসঙ্গী, সন্তান এবং পরিবারের ওপর বাস্তব ক্ষতি নেমে আসতে পারে। ফলে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এই দ্বন্দ্বকে কোনো একপক্ষের সম্পূর্ণ বিজয়ের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
বাধা পেরিয়ে: ভারসাম্যের একটি কাঠামোর দিকে
বাংলাদেশের জন্য সমাধান হতে পারে না কেবল কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা সীমাহীন ডিজিটাল স্বাধীনতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া। মূল প্রবন্ধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করা, দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ ও আবেগীয় বোধসম্পন্নতার বিষয়ে ডিজিটাল নাগরিকত্বের শিক্ষা চালু করা এবং পরিবারে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহমর্মিতা বাড়াতে সম্পর্কবিষয়ক শিক্ষা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। তবে এগুলো যথেষ্ট হবে না, যদি মর্যাদার অর্থ ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক ধারণারও পরিবর্তন না ঘটে।
বাংলাদেশে মর্যাদাকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর অর্থ সামাজিক মূল্যবোধ পরিত্যাগ করা নয়। বরং এমন একটি ধারণা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ভুল বা ব্যর্থতা তার মানবিক মর্যাদাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবে না।
সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব, যাদের ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশীদার হওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাদেরও কলঙ্ক আরোপের বদলে সহমর্মিতা এবং শাস্তির বদলে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে হবে।
একই সঙ্গে অনলাইন সম্পর্কের দিকে মানুষকে ঠেলে দেওয়া মানসিক চাহিদাগুলো নিয়েও সমাজকে আরও সৎ ও খোলামেলা ভাষা তৈরি করতে হবে। নিঃসঙ্গতা, অবহেলা কিংবা দাম্পত্য অসন্তোষ নিয়ে পরিবারের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা সম্ভব না হলে সেই অনুভূতিগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং অনেক সময় তা চলে যায় ইন্টারনেটের অপেক্ষাকৃত গোপন ও অনিয়ন্ত্রিত পরিসরে।
পারস্পরিক আস্থা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দায়িত্বশীল ডিজিটাল যোগাযোগ গড়ে তুলতে হলে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে নিজের আবেগ ও মানসিক চাহিদা প্রকাশ করাকেই অপরাধ বা সামাজিক লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হবে না।
উপসংহার
বাংলাদেশ যে সমস্যার মুখোমুখি, তা একেবারে অনন্য নয়। তবে এর সাংস্কৃতিক বিন্যাস সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা নিজেদের মধ্যে স্বভাবগতভাবে পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফারাহ জেহিরের প্রবন্ধটি এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। তবে প্রস্তাবিত সমাধানগুলো প্রয়োজনীয় হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য আরও গভীর সাংস্কৃতিক রূপান্তর প্রয়োজন। ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং অনলাইন আচরণে সংযমের মধ্যে সত্যিকারের ভারসাম্য তখনই তৈরি হতে পারে, যখন স্বাধীন ইচ্ছাকে বিকৃত করে দেওয়া বাস্তবতাগুলোকে আমরা সরাসরি মোকাবিলা করব। মানসিক অবহেলা, আবেগীয় বঞ্চনা, লিঙ্গভিত্তিক শাস্তি এবং মর্যাদাকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।
তা না হলে ডিজিটাল পরিসর বারবার সেই জায়গাটিই তৈরি করে দেবে, যা সমাজ অনেক মানুষকে দিতে ব্যর্থ হয়: এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ অন্তত কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে শোনা ও বোঝা মনে করতে পারে, যদিও সেই আশ্রয় কখনো কখনো বিপজ্জনকও হয়ে উঠতে পারে।
তথ্য
