ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক
সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রকৃত অর্থ হলো, সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে আলাদা বা বিশেষভাবে দেখানো নয়, বরং তাদের সমান অংশগ্রহণের পথে যে কাঠামোগত বাধাগুলো রয়েছে, সেগুলো দূর করা।
কিন্তু বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে এই দুই বিষয়কে এক করে দেখার প্রবণতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলে এমন এক ধরনের সংবাদ ও উপস্থাপনা তৈরি হচ্ছে, যা উপরিভাগে সহানুভূতিশীল মনে হলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই পৃষ্ঠপোষকতামূলক এবং অজান্তেই সেই প্রান্তিকতাকেই আরও দৃঢ় করছে, যাকে চ্যালেঞ্জ করার দাবি করা হয়।
‘প্রেরণাদায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ ফাঁদ
বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে ‘প্রেরণার গল্প’ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ক্ষতিকর কাঠামোগুলোর একটি। প্রায়ই দেখা যায়, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী কোনো শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেছেন, কিংবা শ্রবণপ্রতিবন্ধী কোনো কারুশিল্পী ছোট ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, এসব গল্প বিশেষ সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে প্রচার করা হয়।
কিন্তু এই উপস্থাপনার ভেতরে একটি সমস্যাজনক বার্তা লুকিয়ে থাকে। এতে বোঝানো হয় যেন ব্যক্তি তার প্রতিবন্ধকতাকে পরাজিত করেছেন, অথচ বাস্তবে তিনি লড়েছেন এমন এক নগর ব্যবস্থা, শিক্ষা কাঠামো এবং কর্মসংস্থানের পরিবেশের বিরুদ্ধে, যা কখনোই তাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়নি।
এখানে কাঠামোগত ব্যর্থতা গল্পের অংশ হয়ে ওঠে না, বরং ব্যক্তির ‘অদম্য ইচ্ছাশক্তি’ কেই মূল বিষয় বানানো হয়। পাঠক আবেগাপ্লুত হন, কিন্তু বাস্তবতা বদলায় না। এখনো বাংলাদেশের শহরগুলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম প্রবেশযোগ্য নগরগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য। ব্যক্তিগত সাফল্য উদযাপন করে কিন্তু কাঠামোগত বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, এমন গণমাধ্যম চর্চা এই অবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতেই ভূমিকা রাখছে।
নারী নেতৃত্বকে পেশাজীবী নয়, ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা
পেশাগত নেতৃত্বের অবস্থানে থাকা নারীদের সংবাদ উপস্থাপনাতেও একই ধরনের বিকৃতি দেখা যায়। কোনো নারী বিচার বিভাগ, করপোরেট খাত বা প্রশাসনের উচ্চপদে নিয়োগ পেলে সংবাদে প্রায় সবসময়ই প্রথম গুরুত্ব পায় তার লিঙ্গ পরিচয়। শিরোনামে উঠে আসে ‘প্রথম নারী’ হিসেবে তার নিয়োগ, আর প্রতিবেদনে বিস্তর আলোচনা হয় কীভাবে তিনি পরিবার ও কর্মজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করছেন।
কিন্তু এখানে অদৃশ্যভাবে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, নেতৃত্বের আসনে একজন নারীর উপস্থিতি এখনও অস্বাভাবিক বলেই তা সংবাদযোগ্য। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং নারীর দক্ষতা দেখে বিস্মিত হওয়ার সংস্কৃতি।
প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি হলে একজন নারীর নিয়োগকে ঠিক সেভাবেই দেখা হতো, যেভাবে একজন পুরুষের ক্ষেত্রে দেখা হয়, অর্থাৎ তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মপরিকল্পনা এবং পেশাগত সাফল্যের ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশি গণমাধ্যমে “প্রথম নারী” ফ্রেমের পুনরাবৃত্তি দর্শক ও পাঠকের কাছে বারবার এই বার্তাই পৌঁছে দেয় যে নারী নেতৃত্ব এখনও ব্যতিক্রমী কিছু, যার জন্য আলাদা স্বীকৃতি দরকার। অথচ অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির লক্ষ্যই হলো এই মানসিকতা ভেঙে ফেলা।
আদিবাসীদের নাগরিক নয়, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হিসেবে দেখা
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যেমন চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারোসহ অন্যদের নিয়ে গণমাধ্যমের উপস্থাপনাও একই সমস্যার আরেকটি দিক তুলে ধরে। অধিকাংশ সময় তাদের নিয়ে সংবাদ বা অনুষ্ঠান সীমাবদ্ধ থাকে উৎসব, ঐতিহ্যবাহী পোশাক বা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যে। বৈসাবি কিংবা ওয়াংগালার মতো উৎসব এলেই তাদের দৃশ্যমানতা বাড়ে।
ফলে এই জনগোষ্ঠীগুলোকে যেন এক ধরনের জীবন্ত ঐতিহ্য জাদুঘর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে তাদের উপস্থিতির শর্ত হলো, তারা যেন বাঙালি দর্শকের সামনে নিজেদের “ভিন্নতা” প্রদর্শন করে।
অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি অধিকার সংকট, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে আদিবাসী পরিবারগুলোর উচ্ছেদ কিংবা উচ্চশিক্ষায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বাধাগুলো খুব কমই মূলধারার সংবাদ কাঠামোতে জায়গা পায়।
গণমাধ্যম যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কেবল তখনই, যখন তারা সাংস্কৃতিকভাবে আকর্ষণীয় এবং রাজনৈতিকভাবে “নিরাপদ” থাকে। কিন্তু যখন তারা অধিকার বা আইনি দাবির প্রশ্ন তোলে, তখন ইতিবাচক সংবাদ কাভারেজের জায়গা দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়।
অধিকার নয়, দানকে কেন্দ্র করে নির্মিত বয়ান
সবচেয়ে বড় বিকৃতির জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। বাংলাদেশের গণমাধ্যম সামাজিক অধিকারের প্রশ্নের চেয়ে দান বা সহায়তাকেন্দ্রিক গল্পকে বেশি গুরুত্ব দেয়। অ্যাসিড হামলার শিকারদের জন্য অর্থ সংগ্রহ, পথশিশুদের ইফতার বিতরণ, এতিমখানায় করপোরেট অনুদান, এসব সংবাদ সহজেই ইতিবাচক প্রচার ও দর্শকপ্রিয়তা পায়।
কিন্তু কেন অ্যাসিড হামলাকারীরা অনেক সময় লঘু শাস্তি পেয়ে যায়, কেন শিশুশ্রমবিরোধী আইন দুর্বলভাবে প্রয়োগ হয়, কিংবা কেন সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ আঞ্চলিক মানদণ্ডের তুলনায় এত কম, এসব নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন খুবই বিরল।
দানভিত্তিক ধারণা মানুষকে অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হিসেবে তুলে ধরে। আর অধিকারভিত্তিক ধারণা বলে, একজন নাগরিক রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে কিছু পাওয়ার অধিকার রাখে।
এই পার্থক্য কেবল ভাষাগত নয়, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রশ্ন। যখন গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে অধিকারের পরিবর্তে দানের কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তারা দর্শক ও নীতিনির্ধারকদের শেখায় যে সামাজিক বৈষম্যের সমাধান জবাবদিহি নয়, কেবল সহানুভূতি।
অন্তর্ভুক্তির ভিন্ন মানদণ্ড
বাংলাদেশি গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য যে খারাপ, তা নয়। কিন্তু শুধুমাত্র সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সামাজিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবাদিকতা প্রশ্ন তোলে না, “এই প্রান্তিক মানুষটি এত বাধার মধ্যেও কী অসাধারণ কাজ করলেন?” বরং প্রশ্ন তোলে, “কোন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তার পথকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে তুলেছে, এবং সেই দায় কার?”
দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত গণমাধ্যমের সহানুভূতি হয়তো দর্শককে সাময়িকভাবে আবেগপ্রবণ করবে, কিন্তু বৈষম্যের মূল কাঠামো একই রকম থেকে যাবে।
