সৌমিলি চ্যাটার্জী
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, দুবাই
ঢাকা ও নয়াদিল্লি কোটি মানুষের কাছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, উন্নত চাকরি, সন্তানের উচ্চশিক্ষা এবং আর্থিক নিরাপত্তার সম্ভাবনার নাম। আঞ্চলিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠা এই দুই মহানগর প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষকে টেনে আনছে। ঢাকার জনসংখ্যা ইতোমধ্যে আড়াই কোটির বেশি, আর দিল্লির জনসংখ্যা ৩ কোটি ৫৫ লাখ ছাড়িয়েছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক সাফল্যের এই চিত্রের নিচে তৈরি হচ্ছে একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। যে বিপুল জনঘনত্ব এই শহরগুলোর অর্থনীতিকে সচল রাখছে, সেই জনঘনত্বই আবার শহর দুটিকে সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমশ বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে।
সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী মানুষ। সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার মতো তাঁদের আয় কম নয়, আবার অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যয়, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক খরচ সামলানোর মতো আয়ও যথেষ্ট নয়। ফলে তাঁরা এমন এক অর্থনৈতিক ফাঁদে আটকে পড়ছেন, যেখানে শহরে কাজ করার প্রয়োজন আছে, কিন্তু শহরে বসবাস করার সামর্থ্য ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
আবাসনের ফাঁদ
ঢাকা ও নয়াদিল্লির নগর সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন। চাহিদা বেশি, কিন্তু নিয়মিত ও সাশ্রয়ী আবাসনের সরবরাহ সীমিত। ফলে বাড়ির মালিকদের ভাড়া নির্ধারণে বড় ধরনের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত বাসাভাড়ায় চলে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে আবাসন ব্যয়ের গ্রহণযোগ্য সীমা যেখানে আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ, সেখানে ঢাকার পরিস্থিতি কতটা চাপ তৈরি করছে, তা সহজেই বোঝা যায়।
নিজের বাড়ির মালিক হওয়াও অনেক পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ১,২০০ বর্গফুটের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দুর্বল। উচ্ছেদের আশঙ্কায় অনেক ভাড়াটিয়া অতিরিক্ত অর্থ বা বাড়তি ভাড়া নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
নয়াদিল্লিতেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ নিয়মিত আবাসনের উচ্চ ব্যয় বহন করতে না পেরে অননুমোদিত কলোনি, অনানুষ্ঠানিক বসতি কিংবা দূরের উপশহর যেমন গাজিয়াবাদ, ফরিদাবাদ ও গুরুগ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
দুই শহরের আবাসন ব্যবস্থায় আয়বৈষম্যের প্রতিফলনও স্পষ্ট। উচ্চবিত্তরা দিল্লির লুটিয়েন্স কিংবা ঢাকার গুলশানের মতো নিরাপদ ও সুবিধাজনক এলাকায় বসবাসের সুযোগ পান। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ শহরের প্রান্তে সরে গিয়ে দীর্ঘ যাতায়াত, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় এবং সময়ের মূল্য দিয়ে সেই আবাসনের মূল্য পরিশোধ করেন।
নাগরিক সুবিধার বেসরকারিকরণ
নিরাপদ পরিবেশ ও সুস্থভাবে বসবাসের সুযোগ কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে এসব সুবিধা ক্রমেই ব্যক্তিগত সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
দুই শহরেই জননিরাপত্তা বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। ঢাকার অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও কার্যকর পুলিশি উপস্থিতির অভাবে সন্ধ্যার পর মানুষের চলাচল কমে যায়। নয়াদিল্লির অননুমোদিত কলোনি ও পুনর্বাসন এলাকাগুলোতেও অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম পরিবারগুলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করে কিংবা নিয়ন্ত্রিত আবাসিক এলাকায় বসবাস করে এই ঝুঁকি অনেকটা এড়াতে পারে। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও অনানুষ্ঠানিক ভাড়াটিয়াদের এমন সুযোগ সীমিত।
আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের প্রশ্ন রয়েছে। নয়াদিল্লিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকাতেও অর্থনৈতিক অপরাধ ও কর ফাঁকির অভিযোগ কম নয়। বাংলাদেশে উচ্চ আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ আয়কর এড়িয়ে যায় এবং ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশের ক্ষেত্রেও একই বৈষম্য দেখা যায়। ঢাকা ও নয়াদিল্লি বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। উচ্চবিত্ত পরিবার বায়ু পরিশোধক, পানির ফিল্টার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসার মাধ্যমে দূষণের ক্ষতি কিছুটা সামাল দিতে পারে। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারকে সীমিত সঞ্চয় থেকে বাড়তি স্বাস্থ্য ব্যয় বহন করতে হয়।
যখন নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানি ও নির্মল বাতাস অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সুবিধায় পরিণত হয়, তখন নাগরিক অধিকার আর সর্বজনীন থাকে না। বরং তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও স্থায়ী করে।
কী করা যেতে পারে
ঢাকা ও নয়াদিল্লির মতো শহরকে বসবাসযোগ্য রাখতে মৌলিক চাহিদাকে বিলাসপণ্য হিসেবে নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, ভাড়া ও আবাসন বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নির্দিষ্ট অংশের আবাসন সংরক্ষণ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা চালু করা যেতে পারে। ডিজিটাল ভাড়াটিয়া নিবন্ধন, স্বচ্ছ ভাড়া নির্ধারণ এবং সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ এই সংকট কমাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেল ও রেল যোগাযোগের সম্প্রসারণ শুধু শহরের কেন্দ্রকে ঘিরে থাকলে চলবে না। উপশহর ও দূরবর্তী বসতিগুলোর সঙ্গে দ্রুত ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাসা থেকে কাছাকাছি জায়গা থেকে যাত্রী নিয়ে প্রধান গণপরিবহন কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, এমন সাশ্রয়ী বাসব্যবস্থাও গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, পরিবেশকে নগর নীতির প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্র গড়ে তুলে ক্ষতিকর গৃহস্থালি বর্জ্যের বিনিময়ে খাদ্য বা শিক্ষা উপকরণের মতো প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। সংগৃহীত বর্জ্য নিরাপদভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তার খাবার ও চায়ের দোকানগুলোকে স্থানীয় পানি সরবরাহের ছোট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সহজ ও বিদ্যুৎনির্ভর নয় এমন পরিশোধন ব্যবস্থা ভর্তুকির মাধ্যমে এসব দোকানে স্থাপন করা গেলে নাগরিকেরা সহজেই বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারবেন।
উপসংহার
ঢাকা ও নয়াদিল্লির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে সেই শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর, যাঁরা প্রতিদিন এই শহর দুটিকে সচল রাখছেন। কিন্তু তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় যদি আয় বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে শহরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে নিজের ভিত্তিকেই দুর্বল করবে।
সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ গণপরিবহন, বিশুদ্ধ পানি, নির্মল পরিবেশ এবং জননিরাপত্তা কোনো বিলাসী সুবিধা নয়। এগুলো একটি বাসযোগ্য শহরের মৌলিক শর্ত। ঢাকা ও নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু কত মানুষ শহরে বাস করছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যাঁরা শহরকে প্রতিদিন সচল রাখছেন, তাঁদের জন্য শহরটি কতটা বাসযোগ্য থাকছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই প্রকৃত উন্নয়ন হয়ে উঠবে, যখন শহরের সাফল্যের মূল্য দিতে হবে না সেই মানুষদের, যাঁদের শ্রমে সেই সাফল্য তৈরি হচ্ছে।
তথ্যসূত্র
- Akter, S. (2025). White-collar crime and its legal implications in Bangladesh. [online] Lilac Education Press (LEP). Available at: https://press.lilaceducation.com/white-collar-crime/ [Accessed 22 Aug. 2026].
- Angan properties (2026). Flat price in Gulshan 2026: Updated price guide. [online] Angan.com.bd. Available at: https://angan.com.bd/flat-price-in-gulshan/ [Accessed 22 Aug. 2026].
- California YIMBY (2024). What is “inclusionary zoning”? The California YIMBY explainer – California YIMBY. [online] California YIMBY. Available at: https://cayimby.org/blog/what-is-inclusionary-zoning-the-california-yimby-explainer/ [Accessed 22 Aug. 2026].
- Gahlawat, R. (2026). Delhi tops 19 Metro cities in cognizable offences: NCRB data – the Tribune. [online] The Tribune. Available at: https://www.tribuneindia.com/news/delhi/delhi-tops-19-metro-cities-in-cognisable-offences-ncrb-data/ [Accessed 22 Aug. 2026].
- Macrotrends (n.d.). Delhi, India metro area population (1950-2026). [online] Macrotrends.net. Available at: https://www.macrotrends.net/global-metrics/cities/21228/delhi/population [Accessed 22 Aug. 2026].
- Onamika, N. (2026). Living at risk in Dhaka. [online] The Oniket Bulletin. Available at: https://bulletin.oniket.org/humanity-social-welfare-human-rights-happiness/living-at-risk-in-dhaka/editor/ [Accessed 22 Aug. 2026].
- Realty Applications (2026). 6 Indian billionaires who own crores in Lutyens’ Delhi. [online] Realtyapplications.in. Available at: https://www.realtyapplications.in/blog/6-indian-billionaires-who-own-crores-in-lutyens-delhi-109 [Accessed 22 Aug. 2026].
