সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
মহাস্থানগড় থেকে ওয়ারী-বটেশ্বর, হাজার বছরের সভ্যতার স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ আজ যেন এক গভীর নীতিগত শূন্যতার ভেতর দিয়ে হাঁটছে। দেশের পাঁচ শতাধিক নিবন্ধিত প্রত্নস্থল ও অমূল্য ঐতিহ্য সেকেলে আইন, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, আর লাগামহীন দখল, পাচারের চাপে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই যদি কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কার না আসে, তবে এই মাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা আমাদের ইতিহাসের শেকড় একদিন নিঃশব্দেই মুছে যাবে।
সেকেলে আইন: উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা
দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের মূল ভিত্তি হিসেবে এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে পাকিস্তান আমলে প্রণীত ‘পুরাকীর্তি আইন ১৯৬৮’। আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই আইনটি বর্তমানে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং কার্যকারিতাহীন।
সংজ্ঞাগত সীমাবদ্ধতা: আইন অনুযায়ী কেবল ১০০ বছরের বেশি পুরনো স্থাপনাকে সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়, যা আধুনিক ঐতিহ্যিক সংজ্ঞার পরিপন্থী।
দন্তহীন বাঘ: প্রত্নসম্পদ পাচার বা অবৈধ দখল রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নির্ধারিত না থাকায় মাঠ পর্যায়ে আইনটি কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।
ডিজিটাল শূন্যতা: বর্তমান যুগের ডিজিটাল জালিয়াতি বা আন্তর্জাতিক পাচারের আধুনিক পদ্ধতি মোকাবেলার কোনো বিধান এই প্রাচীন আইনে নেই।
জনবল ও বাজেট সংকটে পঙ্গু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বর্তমান অবস্থা দাঁড়িয়েছে ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’-এর মতো। তীব্র আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে এর কার্যক্রম।
২৬% পদই শূন্য: অধিদপ্তরের মোট ৪৯৯টি পদের মধ্যে ১৩১টি পদই (২৬%) বর্তমানে খালি। মাত্র চারটি বিভাগীয় অফিস দিয়ে দেশব্যাপী বিস্তৃত বিশাল ঐতিহ্য তদারকি করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আর্থিক দৈন্যদশা: জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ এতটাই নগণ্য যে, বৈজ্ঞানিক খনন বা আধুনিক সাইট রক্ষণাবেক্ষণ এখন একটি দূরহ স্বপ্ন মাত্র।
জাদুঘরের সেকেলে রূপ: দেশের ২২টি জাদুঘর এখনো প্রথাগত প্রদর্শনীতেই সীমাবদ্ধ। আধুনিক যুগের ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন বা অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণের কোনো কার্যকর উপস্থিতি সেখানে নেই।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বর্তমান চিত্র:
┌───────────────────────────────┬──────────────────────────────┐
│ মোট পদ: ৪৯৯টি │ শূন্য পদ: ১৩১টি (২৬%) │
├───────────────────────────────┼──────────────────────────────┤
│ তদারকি অফিস: মাত্র ৪টি │ দেশের জাদুঘর: ২২টি (সেকেলে) │
└───────────────────────────────┴──────────────────────────────┘
পাচার, দখল ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার চিত্র
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাব আমাদের প্রত্নসম্পদকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সীমান্ত দিয়ে পাচার: সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান প্রত্নবস্তু বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।
দখল ও নগরায়ণের গ্রাস: দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে অনেক প্রত্নস্থল আজ অবৈধ নির্মাণ ও দখলের শিকার।
রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা: নীতি বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছে খোদ সরকারি সংস্থাই। ঐতিহ্যের তোয়াক্কা না করে ঐতিহাসিক ‘লাখুটিয়া জমিদার বাড়ি’র মতো স্থানে অফিস স্থাপন করা হয়েছে, যা ঐতিহ্য সংরক্ষণের পরিপন্থী।
সংকট উত্তরণে ভবিষ্যৎ পথরেখা
আমাদের অতীতকে ভবিষ্যতের জন্য রক্ষা করতে হলে কেবল গতানুগতিক জোড়াতালি নয়, প্রয়োজন আমূল সংস্কার। বিশেষজ্ঞরা ৪টি প্রধান বিষয়ে জোর দিচ্ছেন:
১. আইনি সংস্কার: ১৯৬৮ সালের আইনটি সম্পূর্ণ পুনর্লিখন করে পাচারবিরোধী কঠোর বিধান ও ডিজিটাল পুরাকীর্তির আধুনিক সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
২. সাংস্কৃতিক অর্থনীতি: ভারত বা থাইল্যান্ডের মডেল অনুসরণ করে প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনকে দেশের জিডিপির অন্যতম অংশ হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ: দেশের প্রতিটি প্রত্নস্থলের থ্রিডি (3D) স্ক্যানিং ও ডিজিটাল ম্যাপিং নিশ্চিত করা জরুরি।
৪. জনগণের অংশীদারিত্ব: স্থানীয় জনগণকে কেবল দর্শক হিসেবে না রেখে, সাইট ব্যবস্থাপনার সরাসরি অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ শুধু পর্যটনের উপকরণ নয়, এগুলো আমাদের জাতিসত্তার গভীরে প্রোথিত স্মৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ধারক। এই শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রের আন্তরিক নীতিগত অঙ্গীকার, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত বড় বিনিয়োগ। কারণ সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজ আমরা যদি আমাদের ঐতিহ্যের পাশে না দাঁড়াই, তবে একদিন হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বলার মতো ইতিহাস থাকবে, কিন্তু দেখানোর মতো কোনো চিহ্ন আর অবশিষ্ট থাকবে না।
