সুমাইয়া হাসি
জনসংযোগ সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
একটি রাষ্ট্রের জন্মের বহু আগে একটি জাতির নির্মাণ
একটি জাতির জন্ম যত আকস্মিক মনে হোক না কেন, তার ভেতরে আসলে জমা থাকে কয়েক প্রজন্মের নিঃশব্দ প্রস্তুতি। কোনো একটি রাতের যুদ্ধ বা কোনো একটি দিনের মিছিল মানচিত্রে রেখা টেনে দিতে পারে, কিন্তু সেই রেখার ভেতরে বসবাসকারী মানুষের আত্মপরিচয়, ভাষা ও মর্যাদার বোধ গড়ে উঠতে লাগে অনেক বেশি সময়। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির জন্মের পেছনেও এমন এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রস্তুতিপর্ব আছে, এবং তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরদের তালিকায় যাঁর নাম সবার আগে আসে, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, কোনোটিই তিনি নিজের চোখে দেখে যাওয়ার সুযোগ পাননি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মাধ্যমে বাংলা যখন দ্বিখণ্ডিত হলো, তখন তিনি প্রয়াত হয়েছেন ছয় বছর আগেই। আর ঢাকার রাজপথে যখন মাতৃভাষার অধিকার নিয়ে রক্ত ঝরল, তখন তাঁর প্রস্থানের পর কেটে গেছে পুরো এক দশকেরও বেশি সময়। তবু এই দুই সংগ্রামের কোনোটিতেই তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হয়নি, বরং উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি ছিল গভীর ও সিদ্ধান্তমূলক।
তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠক ছিলেন না, কোনো দলের নেতৃত্বও দেননি, কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে তিনি বাঙালিকে এমন একটি ভাষা দিয়েছিলেন যার জন্য জীবন উৎসর্গ করা সম্ভব, এবং এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় দিয়েছিলেন যা শেষ পর্যন্ত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াতে পেরেছিল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের সম্পর্ক নিছক প্রতীকী নয়, এর শেকড় অনেক গভীরে।
বাংলার মাটি, মানুষ ও রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক জাগরণ
ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকে পরিবারের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর এবং নওগাঁর পতিসরে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। পদ্মা, ইছামতি ও আত্রাইয়ের তীরে বোটে ভেসে কাটানো সেই বছরগুলোতেই রচিত হয় ছিন্নপত্র, সোনার তরী, ক্ষুধিত পাষাণসহ অসংখ্য কালজয়ী রচনা। গ্রামীণ বাংলার মানুষ, নদী, ফসলের মাঠ আর সাধারণ জীবনের প্রতি যে গভীর মমত্ববোধ তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছিল, তা পরবর্তীকালে যেভাবে সোনার বাংলার ধারণা গড়ে ওঠে তার একটি বড় ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ও ‘আমার সোনার বাংলা’র জন্ম
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন ধর্মীয় ভিত্তিতে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিলেন, রবীন্দ্রনাথ তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদে নামেন। হিন্দু মুসলমান ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তিনি রাখিবন্ধন উৎসবের প্রচলন করেন এবং এই প্রতিবাদেরই অংশ হিসেবে রচনা করেন ‘আমার সোনার বাংলা’, যার সুর তিনি নিয়েছিলেন বাউল গায়ক গগন হরকরার একটি গান থেকে। এই গানে বাংলাকে দেখা হয়েছে ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে, মাটি, নদী আর মানুষের যৌথ অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে। এই ভাবনাই পরে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মূল কাঠামো গঠন করবে, যদিও তখনো তা কারও কল্পনায় ছিল না।
বিশ্বস্বীকৃতি এবং বাঙালির আত্মবিশ্বাসের উত্থান
১৯১৩ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, গীতাঞ্জলির জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এই বিভাগে প্রথম অইউরোপীয় বিজয়ী। এই স্বীকৃতি বাংলা ভাষাকে এক লহমায় বিশ্বমানের আসনে বসিয়ে দেয়। ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনের যে শিক্ষাদর্শন গড়ে তোলেন, তাও বাঙালির আত্মবিশ্বাসকে আরও পুষ্ট করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই বিশ্বস্বীকৃত সাংস্কৃতিক প্রতীককে হালকাভাবে নেয়নি।
রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সূচনা
১৯৪৮ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন ঘোষণা করল কেবল উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন তা আসলে যোগাযোগের একটি মাধ্যমের ওপর আঘাত ছিল না, বরং বাংলা যে সমগ্র সভ্যতা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছিল তার ওপরেই সরাসরি আঘাত। এর আগেই, ১৯৪৮ সালের গণপরিষদে কুমিল্লার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরেছিলেন, যার পেছনে কাজ করেছিল সেই সাহিত্যিক আত্মবিশ্বাস যা রবীন্দ্রনাথ দশকের পর দশক ধরে গড়ে তুলেছিলেন।
পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথকে দমনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব দমন করার চেষ্টা করে বারবার। রাষ্ট্রীয় বেতারে তাঁর জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়, প্রকাশ্য মঞ্চে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনে বাধা দেওয়া হয়, শিক্ষাক্রম থেকে তাঁর রচনা ছেঁটে ফেলার চেষ্টা চলে। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান বেতার কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রসংগীতের সম্প্রচার আরও সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিলে দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ দেখা যায়, যা প্রমাণ করে যে রবীন্দ্রনাথ তখন আর শুধু একজন কবি নন, তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐক্যেরই একটি জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
প্রতিটি দমননীতিই উল্টো ফল দিয়েছে। গবেষক গোলাম মুরশিদ যাকে বলেছেন সংগ্রামের অংশীদার, বাঙালি মুসলমান, হিন্দু এবং সকল ধর্মের মানুষ সেই অভিধাকে সত্য প্রমাণ করতে রবীন্দ্রনাথের চারপাশেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। রাষ্ট্র যত বেশি তাঁকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে, তাঁর গান ও কবিতা তত বেশি প্রতিরোধের সুর হয়ে বেজেছে।
ভাষা আন্দোলন: সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা থেকে রাজনৈতিক দাবি
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ছাত্ররা যখন রাষ্ট্রভাষার দাবিতে রাস্তায় নামল এবং রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের মতো তরুণ প্রাণ গুলিতে ঝরে গেল, তাদের মধ্যে কাজ করেছিল এক সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস, যা রবীন্দ্রনাথ কয়েক দশক ধরে তৈরি করে গেছেন। তাঁর রচনা প্রমাণ করেছিল বাংলা কোনো প্রাদেশিক উপভাষা নয়, বরং সর্বোচ্চ শৈল্পিক ও দার্শনিক প্রকাশে সক্ষম একটি পরিপূর্ণ সাহিত্যিক ভাষা। উর্দুকে শ্রেষ্ঠ মেনে নেওয়া মানে দাঁড়াত এমন একটি ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা যা ইতিমধ্যেই বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃত।
এই আন্দোলনের পরবর্তী ফলাফল হিসেবে ১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা পায় এবং পঞ্চাশ ষাটের দশকজুড়ে ঢাকা শহরে প্রমিত বাংলার চর্চা ও তার প্রতি গৌরববোধ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ছিল না, বরং তা গড়ে উঠেছিল গভীরে প্রোথিত এক সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা থেকে, যার একটি বড় উৎস ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং।
ভাষা থেকে মুক্তিযুদ্ধ: সাংস্কৃতিক চেতনার রাজনৈতিক রূপান্তর
ভাষা আন্দোলনের পর দুই দশকের মধ্যে সেই সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় আরও দৃঢ় ও রাজনৈতিক রূপ নেয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে, তার একটি লক্ষ্য ছিল বাঙালির সেই সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডটিকেই ভেঙে দেওয়া যার প্রতীক ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যক্তিত্বরা। যুদ্ধের নয় মাসে দেশের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে যে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চলেছিল এবং যা বিজয়ের ঠিক আগে ডিসেম্বরে ভয়াবহ রূপ নেয়, তা ছিল মূলত সেই বাঙালি সাংস্কৃতিক চেতনাকেই নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস, যা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, গান ও দর্শন দিয়ে গড়ে উঠেছিল।
মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রসংগীত: সংগ্রামের সুর ও স্বাধীনতার প্রতীক
এই নয় মাসের সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের গান মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে সমানভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, যা সকল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ মুছে দিয়েছিল। সীমান্তের ওপারে কলকাতার কাছাকাছি স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিতভাবে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচারিত হতো। সুরকার শমর দাশের পরিচালনায় তৈরি হওয়া সেই অনুষ্ঠানগুলোতে কাজী নজরুল ইসলামের গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গানও সমান গুরুত্ব পেত।
আমার সোনার বাংলা শরণার্থী শিবির, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এবং সম্মুখ সমরে বারবার গাওয়া হতো, যা যোদ্ধাদের কাছে কেবল একটি গান ছিল না, ছিল লড়াইয়ের উদ্দেশ্যেরই এক সংক্ষিপ্ত ঘোষণা। স্বাধীনতার আগেই, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে মুজিবনগর সরকার গঠনের সময় আমার সোনার বাংলার প্রথম দশ পঙক্তিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়, এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তা আনুষ্ঠানিকভাবেই জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অনেক গভীর।
ধর্ম নয়, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে এক নতুন রাষ্ট্র
নতুন রাষ্ট্রটি নিজেকে সংজ্ঞায়িত করল ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নয়, বরং ভাষা ও সংস্কৃতি দিয়ে, যা পাকিস্তানের সেই দ্বিজাতিতত্ত্বের সরাসরি বিপরীত যার ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছিল। গবেষক নিয়াজ জামান যেমন লক্ষ্য করেছেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঠিক সেই রূপান্তরের প্রতীক, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের দিকে যাত্রা, যা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত পটভূমি তৈরি করেছিল। সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ভাষা, ভূমি ও যৌথ মানবতার মধ্যে প্রোথিত বাংলার যে দৃষ্টিভঙ্গি রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলেছিলেন, তা নতুন রাষ্ট্রটির নৈতিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেননি, কোনো সমরাভিযানের নেতৃত্বও দেননি।
রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার: বাংলাদেশের জাতিসত্তার চিরস্থায়ী ভিত্তি
তবু তিনি এই দেশের মানুষকে এমন একটি ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় দিয়ে গিয়েছিলেন যা সাংস্কৃতিক বিলোপের চেষ্টা এবং সশস্ত্র দমন, উভয় সংকট পার করেও টিকে থাকতে পেরেছিল। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে পথ, তা সরাসরি তাঁরই তৈরি করা সেই জগতের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল।
আজও বাংলাদেশে তাঁর জন্মজয়ন্তী জাতীয়ভাবে পালিত হয়, শিলাইদহ ও পতিসরের কুঠিবাড়ি জাতীয় ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত আছে, এবং তাঁর গান এখনো দেশের প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের কল্পনাশক্তি কীভাবে এক জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়েও বেশি স্থায়ী প্রভাব রাখতে পারে।
