ড. শারমীন ভূঁইয়া
সিলেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম নতুন করে চালু হওয়া রোগীদের জন্য কী অর্থ বহন করে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত এবং অন্যান্য অনেক রোগী পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকা অবস্থায় একটি প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত করা কতটা ন্যায্য, এই লেখায় সেই প্রশ্নগুলোই খতিয়ে দেখা হয়েছে।
ঘটনাটি শুরুতে আর দশটি হাসপাতাল কেসের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু সংখ্যাগুলো সামনে এলে এর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। ঢাকার একজন গৃহিণী লিভারের সিরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা বাড়তে থাকলেও ভারতে লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য তাঁর পরিবারকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছিল, যা তাঁদের নাগালের বাইরে ছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁকেই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় চালু হওয়া লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রমের প্রথম রোগী হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাঁর ছেলে লিভারের একটি অংশ দান করেন। বিদেশে চিকিৎসার তুলনায় অনেক কম খরচে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
গত সেপ্টেম্বর থেকে বিএমইউ ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন করেছে। ছয়টি ঘটনা একসঙ্গে দেখলে শুধু কয়েকজন রোগীর চিকিৎসা নয়, একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও সূচনা দেখা যায়।
ছয়টি রোগীর চেয়ে চাহিদা অনেক বড়
এখন পর্যন্ত চিকিৎসা পাওয়া রোগীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের লিভার রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর এই রোগে ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যাঁদের বেশির ভাগই সিরোসিস বা ক্যানসারে মারা যান। বছরে আনুমানিক এক হাজার রোগীর লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়।
এই বাস্তবতায় ছয়টি প্রতিস্থাপন একটি শুরু মাত্র, সমাধান নয়। ২০১০ সালের পর বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছে, আবার দীর্ঘ সময় কোনো কার্যক্রম ছিল না। এখন বিএমইউ এমন একটি নিয়মিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে প্রতিস্থাপন ধারাবাহিকভাবে করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি মাসে প্রায় দুটি প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
দেশে চিকিৎসায় বিনিয়োগের আর্থিক যুক্তি
শুধু অর্থনৈতিক হিসাবও এই উদ্যোগের গুরুত্ব বোঝাতে যথেষ্ট। যাতায়াত, থাকা এবং হাসপাতালের ব্যয়সহ বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে খরচ প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিএমইউতে নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে সেবা চালু হলে একটি লিভার প্রতিস্থাপনের সম্ভাব্য খরচ ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ধরা হচ্ছে। আর বর্তমানে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থায় আলোচিত পরিবারের খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
এই ব্যবধান সামান্য নয়। এর অর্থ হলো, এমন একটি চিকিৎসা যা এতদিন মূলত সামর্থ্যবান অল্পসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে ছিল, সরকারি সহায়তা থাকলে তা অনেক বড় একটি জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে। এর আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য বর্তমানে ভারত, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে যে অর্থ চলে যাচ্ছে, দেশে সক্ষমতা তৈরি হলে সেই অর্থের একটি অংশ দেশেই রাখা সম্ভব। রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসা খাতের দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও আয়ও বাড়বে।
প্রথম দফার প্রতিস্থাপনে ১৯টি বিভাগ এবং অভিজ্ঞ হেপাটোবিলিয়ারি সার্জনদের যুক্ত থাকা একটি প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানভিত্তি তৈরির ইঙ্গিত দেয়। এই সক্ষমতা ধরে রাখা গেলে প্রথম দফায় হায়দরাবাদ থেকে যে ধরনের কারিগরি সহায়তা নিতে হয়েছে, ভবিষ্যতে তার ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর করতে হবে না।
একটি রোগে মনোযোগ, অপেক্ষায় অন্যরা
তবে আরও কঠিন প্রশ্নটি হলো ন্যায্যতার। লিভার রোগ অবশ্যই বাংলাদেশের একটি বড় স্বাস্থ্য সংকট। কিন্তু পর্যাপ্ত দেশীয় চিকিৎসা সুবিধার অভাবে জীবনসংকটে থাকা রোগীদের একমাত্র সমস্যা এটি নয়। কিডনি বিকল হওয়া, শিশুদের জটিল ও বিরল ক্যানসার, জন্মগত হৃদ্রোগ এবং রক্তের ক্যানসারের জন্য অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও দেশের অবকাঠামো সীমিত। এসব রোগের অনেক রোগীকেই শেষ পর্যন্ত একই কঠিন হিসাব করতে হয়, বিদেশে চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব কি না।
এই বৃহত্তর বাস্তবতায় শুধু লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সমন্বয় ব্যবস্থা ও সরকারি সহায়তা কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ন্যায্যতার প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কেন একটি প্রাণঘাতী রোগের জন্য একটি বড় কর্মসূচি থাকবে, অথচ মৃত্যুঝুঁকির দিক থেকে তুলনীয় অন্য রোগগুলোর রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে হবে অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মসজিদের ঘোষণা দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে?
অন্য কোনো কর্মসূচির অর্থ সরাসরি কমিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। তবে সীমিত সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণসুবিধার একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সম্পদ বণ্টন কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। একজন হেপাটোবিলিয়ারি সার্জনকে প্রশিক্ষিত করতে যে সময় ও সক্ষমতা প্রয়োজন, সেই একই সময়ে অন্য একটি ক্ষেত্রে সমপরিমাণ বিশেষজ্ঞ সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হয় না।
এক জায়গায় সক্ষমতা গড়া নাকি ছড়িয়ে দেওয়া?
তবে এর বিপরীত যুক্তিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। জটিল অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসার শুরুতে দক্ষতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে একটি কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত করা অনেক সময় বেশি কার্যকর। একটি প্রতিষ্ঠান যদি একটি নির্দিষ্ট প্রতিস্থাপন পদ্ধতিতে দক্ষতা গড়ে তোলে, বহুমুখী বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করে এবং ধারাবাহিকভাবে বহু রোগীর চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ম ও চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নত করে, তাহলে একই সময়ে কয়েকটি সীমিত সক্ষমতার কর্মসূচি চালানোর তুলনায় নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশে লিভার প্রতিস্থাপন নিয়মিত ও নিরাপদভাবে করার মতো একটি সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে সেই অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামো ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রতিস্থাপন কর্মসূচিতে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। অন্য দেশেও কিছু ক্ষেত্রে কিডনি প্রতিস্থাপনের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে পরে লিভার প্রতিস্থাপন কর্মসূচি গড়ে উঠেছে। সেই দৃষ্টিতে বর্তমান মনোযোগকে স্থায়ী বৈষম্য হিসেবে না দেখে একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবেও দেখা যায়, যা সফল হলে অন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা খাতেও অনুসরণ করা সম্ভব।
এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করণীয়
এই আশাবাদ বাস্তবে ধরে রাখতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট করতে হবে। কোন কোন রোগ, যেমন কিডনি বিকল হওয়া, শিশুদের ক্যানসার ও হৃদ্রোগ, পরবর্তী পর্যায়ে একই ধরনের বিনিয়োগ পাবে এবং কোন সময়ের মধ্যে পাবে, তা উল্লেখ করে একটি স্বচ্ছ বহু বছরের পরিকল্পনা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত নীতিমালা থাকা দরকার। রোগী কোন হাসপাতালে পৌঁছেছেন বা কোন চিকিৎসকের কাছে গেছেন, তার ওপর চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা পাওয়া নির্ভর করা উচিত নয়। একই সঙ্গে বিএমইউতে তৈরি হওয়া দক্ষতা অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি অঙ্গদানের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ একটি প্রতিস্থাপন কর্মসূচির সাফল্য শুধু সার্জনের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না, প্রয়োজনীয় অঙ্গদাতার প্রাপ্যতার ওপরও নির্ভর করে।
শুরুতে যে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এই সাফল্য একটি ন্যায্য ও বিস্তৃত স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রথম অধ্যায় হবে, নাকি আলোচিত একটি ব্যতিক্রম হিসেবেই থেকে যাবে, তা নির্ভর করবে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর।
