সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহের প্রায়ই একটি প্রশ্ন আড্ডায় আসে, বিবাহের জন্য ‘প্রেম না দেখাশোনা?’ আসলে এই প্রশ্ন এতোটা হালকা নয়, এটি বাংলাদেশের সামাজিক মানসিকতা, মূল্যবোধ এবং পরিবর্তনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি। এই প্রশ্নটি নিছক বিবাহ পদ্ধতির পছন্দ নয়; এটি সমাজের ক্রমবিকাশমান মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোকে প্রতিনিধিত্ব করে।
সামাজিক মনোবিজ্ঞান বলে, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কখনো বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে না, তা সর্বদা সামাজিক প্রেক্ষাপট, পারিপার্শ্বিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। প্রেম বিবাহকে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক মনে করা, আর অ্যারেন্জড বিবাহকে পারিবারিক চাপ হিসেবে দেখা-উভয়ই একধরনের সামাজিক কন্ডিশনিং বা সামাজিক শর্তায়নের ফল। আমরা যা বিশ্বাস করি, তা অনেকাংশেই আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, শিক্ষা এবং সামাজিক বয়ান দ্বারা নির্মিত।
প্রেমের বিবাহে আবেগের প্রাধান্য থাকে, কিন্তু বাস্তবতার চাপ, অর্থনৈতিক সমস্যা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব -সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে, অ্যারেন্জড বিবাহ এখন আর একমাত্রিক নয়; বরং এটি ‘কিউরেটেড লাভ’-এর একটি রূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে পারিবারিক অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তির সিদ্ধান্ত একসাথে কাজ করে। এই পরিবর্তনটি নিজেই একটি সামাজিক মানসিকতার রূপান্তরের প্রমাণ।
মানসিকতার রূপান্তর: একটি ক্রমবিকাশমান প্রক্রিয়া
বাংলাদেশের সমাজ এখন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। একদিকে ঐতিহ্যগত পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদার প্রতি আস্থা, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভাব। এই দুইয়ের মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে, তা সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’ বা মানসিক দ্বন্দ্ব হিসেবে পরিচিত, যেখানে একজন মানুষ একই সঙ্গে দুটি বিপরীত বিশ্বাস বহন করে।
তালাকের হার বৃদ্ধি এই দ্বন্দ্বের একটি বাহ্যিক প্রকাশ। এটি সম্পর্কের অবক্ষয় নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নারীর আত্মমর্যাদাবোধ ও অধিকার সচেতনতার প্রতিফলন। নারীরা এখন আর নির্যাতনমূলক বা অসন্তোষজনক সম্পর্ক মেনে নিতে প্রস্তুত নন, এটি সামাজিক মানসিকতায় একটি ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
সমাজকাঠামো ও পরিচয়ের রাজনীতি
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো এখনও গভীরভাবে পরিবারকেন্দ্রিক। বিবাহ এখানে কেবল দুটি মানুষের মিলন নয়, এটি দুই পরিবারের, দুই সামাজিক পরিচয়ের একটি সম্পর্ক। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি থিওরি’ অনুযায়ী, মানুষ নিজের পরিচয় নির্মাণে পরিবার ও গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই পরিবারের ভূমিকাকে পুরোপুরি নাকচ করা যেমন কঠিন, তেমনি তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে নিরঙ্কুশ বলে মেনে নেওয়াও এই রূপান্তরশীল সমাজে আর সম্ভব নয়।
প্রেম বা দেখাশোনা-এই বিভাজনটি আসলে মূল প্রশ্ন নয়। মনোবিজ্ঞান বলে, যেকোনো সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নির্ভর করে পারস্পরিক সম্মান, মানসিক নিরাপত্তা, যোগাযোগের দক্ষতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষমতার ওপর। পরিচয়ের ধরন নয়, সম্পর্কের প্রতিদিনের বিনিয়োগই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। সেই বিনিয়োগ যেন হয় সমাজের সার্বজনীন ও হিতৈষী সমর্থনে এবং পৃষ্ঠপোষকতায়।
সমাজের দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হওয়া এখন শুধুমাত্র সময়ের দাবি। বিবাহকে ‘জয়’ বা ‘পরাজয়’ হিসেবে না দেখে, একে একটি চলমান সামাজিক ও মানসিক প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝার মধ্যেই রয়েছে সত্যিকারের সামাজিক রূপান্তর। মানসিকতার এই পরিবর্তন কেবল পারিবারিক স্তরে নয়, সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে একটি সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই বিষয়ে সামাজিক, নেতৃত্ব ও সরকারী প্রচারণার আবশ্যকতা আছে। ঠিক তেমনই আছে সামাজিক বিজ্ঞাপণের প্রয়োজনীয়তা, ও শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে এই দর্শনের সুস্পষ্ট আধিপত্য। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি অনেক কালজয়ী কবি, লেখক, দার্শনিক ও সংস্কৃতিকর্মী এই দর্শনে আলোকপাত করেছেন। কেন না তাঁরা সময়ের চেয়েও দ্রুত ভাবনা ও মনন সৃষ্টি করেছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দীক্ষিত করেছেন প্রগতিশীল আদর্শ ও দর্শনে। যদি বিবাহের মতো একটি সামাজিক প্রথায় এখন কোনো বিভাজিত দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম নিয়ে আমরা চিন্তিত বা ক্ষতিগ্রস্ত, তাহলে আমাদের পথ-প্রদর্শকদেরই সেই দ্বিধা ও শঙ্কা দূর করতে হবে।
