ফারাহ জেহির
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যম, প্রকাশনা এবং ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রে এক নতুন আইনি দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এই আইনটি মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে এবং তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রদান করে। আইনের ধারা ২৫ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির ভিডিও ধারণ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা মূলধারার সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা প্রদান করে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতার নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা নিয়ন্ত্রণে এই আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান ডিজিটাল প্রকাশনা শিল্পে নৈতিকতার মানদণ্ড বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
তবে এই আইনটিকে গণমাধ্যম ও প্রকাশনা শিল্পের জন্য আরও কার্যকর এবং নির্বিঘ্ন করতে হলে ডিজিটাল প্রচারণা ও বিষয়বস্তু বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আইনের ২৬ নম্বর ধারায় ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ বা ‘সাম্প্রদায়িক ঘৃণা’ ছড়ানোর বিষয়ে যে সাজার কথা রয়েছে, তার সংজ্ঞা ও পরিধি যদি ডিজিটাল পাবলিশিং স্ট্যান্ডার্ড বা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতিমালার আলোকে সুনির্দিষ্ট করা যায়, তবে তথ্য প্রকাশে কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না। গণমাধ্যম ও প্রকাশনা সংস্থাগুলোর জন্য এটি একটি ‘গাইডলাইন’ হিসেবে কাজ করবে, যাতে তারা সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। পাশাপাশি, ধারা ৮ অনুযায়ী ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা যখন বিটিআরসি প্রয়োগ করবে, তখন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা ডিজিটাল পাবলিশিং প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি ‘আপিল’ বা ‘রিভিউ’ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এছাড়া, ইন্টারমিডিয়ারি লায়াবিলিটি বা মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা যদি বিধিমালা দ্বারা নির্দিষ্ট করা যায়, তবে ডিজিটাল প্রচারণায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অযাচিত আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত থেকে স্বচ্ছতার সাথে কাজ করতে পারবে।
ডিজিটাল প্রকাশনা ও তথ্য প্রচারের যুগে প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনের ধারা ১০ ও ১১-এ বর্ণিত ফরেনসিক ল্যাবের কার্যকারিতা যদি গণমাধ্যমের সত্যতা যাচাই প্রক্রিয়ার সাথে সমন্বিত হয়, তবে ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ প্রচার রোধ করা সহজ হবে। আদালতে ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিতে ‘চেইন অফ কাস্টডি’ বজায় রাখার জন্য একটি জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়ন করা হলে তা পেশাদার প্রকাশকদের জন্য সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া ধারা ৩৫-এর অধীনে তল্লাশি বা জব্দের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের গোপনীয় উৎস বা ‘সোর্স’ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে যদি একটি বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা চালু রাখা যায়, তবে তা সাংবাদিকতার মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে। আইনের ধারা ৪৮-এ বর্ণিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলা প্রকাশনা ও প্রচার মাধ্যমগুলোর জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। পরিশেষে, আধুনিক প্রকাশনা ও প্রচারণার যুগে কেবল কঠোর নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং তথ্য প্রচারের স্বাধীনতা ও সাইবার নিরাপত্তার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে এই আইনের প্রকৃত সাফল্য।
