ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক
বাংলাদেশ যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৯.৩০ ট্রিলিয়ন টাকার একটি জাতীয় বাজেট পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া নতুন রাষ্ট্র হিসেবে এটিই প্রথম বাজেট, তখন দেশের কৃষি খাত এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি সহায়তা নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত ভর্তুকিগুলো এখন মুদ্রার অবমূল্যায়ন, আমদানি নির্ভর উৎপাদন উপকরণের ক্রমবর্ধমান খরচ এবং এলডিসি উত্তরণের ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) শর্তপালন সংক্রান্ত আসন্ন বাধ্যবাধকতার কারণে মারাত্মক রাজস্ব চাপের মুখে পড়ছে।
একই সঙ্গে, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, বিশেষ করে এসডিজি ২ (ক্ষুধামুক্তি), এসডিজি ১ (দারিদ্র্য বিমোচন), এসডিজি ১৩ (জলবায়ু পদক্ষেপ) এবং এসডিজি ১৫ (স্থলজ জীবন), শুধু কৃষি উৎপাদন বজায় রাখার প্রশ্ন তুলছে না, বরং বাংলাদেশ কীভাবে তার খাদ্য ব্যবস্থার উৎপাদন, অর্থায়ন এবং স্থায়িত্বকে একটি নতুন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে যাবে, সেই গুণগত রূপান্তরের দাবি জানাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন বাজেটকে তার পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত স্পষ্টতা নিয়ে এই টানাপোড়েন মোকাবিলা করতে হবে।
বর্তমান ভর্তুকি পরিস্থিতি এবং এর কাঠামোগত দুর্বলতা
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ভর্তুকি বাবদ ১৭,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুক্তি অনুসারে, এই অঙ্কটি এই খাতের প্রকৃত চাহিদার চেয়ে ৮,০০০ কোটি টাকা কম ছিল। মন্ত্রণালয়ের চাহিদা এবং অর্থ বিভাগের অনুমোদনের মধ্যে এই ব্যবধান নিজেই একটি কাঠামোগত সমস্যার লক্ষণ: বাংলাদেশে কৃষি ভর্তুকি নীতি কৌশলগত হওয়ার চেয়ে বরং পরিস্থিতি প্রতিক্রিয়াশীল (রিঅ্যাক্টিভ), যা উৎপাদনশীলতার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পরিবর্তে রাজস্ব সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
ভর্তুকির সিংহভাগই শোষিত হয় সারের পেছনে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়মূল্য এবং কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকিযুক্ত মূল্যের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের কারণে, যা ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর আর সংশোধন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সার প্রায় ৫১ টাকায় কিনে কৃষকদের কাছে ২৭ টাকায় বিক্রি করার ফলে, একটিমাত্র উৎপাদন উপকরণের আর্থিক বোঝাই এমন একটি ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে যা অন্যথায় একটি বৈচিত্র্যময় এবং উৎপাদনশীলতা বর্ধক সহায়তা কাঠামো হতে পারত।
সার ভর্তুকির এই অতি কেন্দ্রীয়করণের পরিণতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। বাংলাদেশের সারের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যার অর্থ ভর্তুকির বিল সরাসরি বৈশ্বিক পণ্যের মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হারের সাথে ওঠানামা করে; যার উভয়ই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিপক্ষে তীব্রভাবে মোড় নিয়েছে। ভর্তুকির বকেয়া পুঞ্জীভূত হয়েছে, বেসরকারি আমদানিকারকরা সুদ পরিশোধের দাবি জানাচ্ছে এবং সরাসরি অর্থ প্রদানের পরিবর্তে কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা বন্ডগুলো গ্রহণ করতে ব্যাংকগুলো ক্রমবর্ধমান অনীহা প্রকাশ করছে। এটি কোনো টেকসই ভর্তুকি নীতি নয়; এটি একটি স্থিতিশীলকরণ প্রক্রিয়া বা মেকানিজমবিহীন এক বিশাল আর্থিক দায়।
আসন্ন বাজেটে যা অবশ্যই সমাধান করতে হবে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে একই সাথে তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে হবে: এলডিসি উত্তর ডব্লিউটিও-র শর্তপালনের বাধ্যবাধকতার কথা মাথায় রেখে ভর্তুকি কাঠামো যৌক্তিকীকরণ করা, অবমুক্ত হওয়া সম্পদ উৎপাদনশীলতা বর্ধক বিনিয়োগের দিকে চালিত করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের জন্য বাংলাদেশ যে এসডিজি ফ্রেমওয়ার্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তার সাথে আর্থিক সহায়তার সমন্বয় সাধন করা।
ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের ক্ষেত্রে সরকারকে ‘সরাসরি কৃষক সহায়তা হস্তান্তর’ (ডিরেক্ট ফারমার সাপোর্ট ট্রান্সফার) ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা হবে মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রদত্ত এবং যোগ্যতা যাচাইকৃত একটি আয় ভর্তুকি। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় সফলভাবে বাস্তবায়িত সংস্কারের আদলে তৈরি এই রূপান্তরটি বৈশ্বিক পণ্যের মূল্যের ওঠানামার বিপরীতে দেশের রাজস্ব ঝুঁকি হ্রাস করবে, লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে এবং কৃষকদের ওপর থেকে সমন্বয় ব্যয়ের চাপ কমিয়ে সার আমদানির মূল্যকে ধীরে ধীরে বাজার বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ করার সুযোগ দেবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বচ্ছভাবে ঘোষিত তিনটি বাজেট চক্রের মধ্যে একটি পর্যায়ক্রমিক উত্তরণ কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খলকে (সাপ্লাই চেইন) সেই পরিকল্পনাগত নিশ্চয়তা প্রদান করবে যার এখন তীব্র অভাব রয়েছে।
উৎপাদনশীলতা বর্ধক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কৃষির ক্রমহ্রাসমান অংশ (অর্থবছর ২৫-এর ৫.০ শতাংশ থেকে অর্থবছর ২৬-এ ৪.৭ শতাংশে নেমে আসা) অবশ্যই উল্টোমুখী করতে হবে। আসন্ন বাজেটে কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে; যেখানে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য লবণাক্ততা সহনশীল বীজ, উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোর জন্য খরা সহনশীল জাত এবং সামগ্রিকভাবে জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ম্যান্ডেট বা কর্মপরিধির তুলনায় দীর্ঘকাল ধরে মারাত্মক তহবিল সংকটে ভুগছে। সরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগে একটি আমূল পরিবর্তন ছাড়া, কেবল ভর্তুকি নীতি দিয়ে এসডিজি ২-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে হিমাগার যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায়, কোল্ড চেইন (শীতলীকরণ শৃঙ্খল) অবকাঠামো খাতের জন্য নিবেদিত মূলধনী বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। পচনশীল পণ্যের বিভিন্ন শ্রেণীতে ফসল কাটার পরবর্তী ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষতি মূলত একটি কাঠামোগত উৎপাদনশীলতার অপচয়, যা কোনো উপকরণ ভর্তুকি দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কৃষি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্য শৃঙ্খলের রূপান্তরের (ভ্যালু চেইন ট্রান্সফরমেশন) পূর্বশর্ত হলো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহসহ কৃষি সংস্করণ অঞ্চল (অ্যাগ্রো-প্রসেসিং জোন) গড়ে তোলা, গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রান্তিক পর্যায়ের লজিস্টিকস বা পরিবহন সংযোগ নিশ্চিত করা।
এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে রাজস্ব সংস্কার
এসডিজির সাথে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই কৃষি প্রবৃদ্ধির জন্য বাজেট খাতের বাইরেও রাজস্ব সংস্কারের প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ফলে যে ‘ক্রাউডিং-আউট’ প্রভাব (প্রকল্পিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ঘাটতির ৪৬ শতাংশ) তৈরি হচ্ছে, তা যেন ক্ষুদ্র চাষী ও কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের ঋণের প্রবাহকে সংকুচিত না করে, সেজন্য কৃষি ঋণ নীতি পুনর্গঠন করতে হবে। আসন্ন বাজেটে একটি বিশেষায়িত কৃষি ঋণ গ্যারান্টি তহবিল গঠন করা হলে, তা বড় আকারের সরাসরি রাজস্ব ব্যয় ছাড়াই এই খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করবে।
জলবায়ু অর্থায়নকে (ক্লাইমেট ফাইন্যান্স) আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষি বাজেট পরিকল্পনার সাথে একীভূত করতে হবে। বাংলাদেশের হাওর জলাভূমি, উপকূলীয় কৃষি অঞ্চল এবং খরাপ্রবণ উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলো ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে, যা প্রথাগত ভর্তুকি এবং ঋণ সহায়তার মাধ্যমে মোকাবিলা করা অসম্ভব। জলবায়ু-অভিযোজনমূলক একটি কৃষি তহবিল, যা দেশীয় বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, উভয় উৎস থেকেই তহবিল সংগ্রহ করবে, তাকে প্রকল্প ভিত্তিক দাতা নির্ভরশীলতা হিসেবে না রেখে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি সরাসরি এসডিজি ১৩ এবং এসডিজি ১৫-এর লক্ষ্যসমূহকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সেই অভিযোজন সক্ষমতা তৈরি করবে, যা জলবায়ুগত অনিশ্চয়তার মধ্যেও টেকসই কৃষি উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের কৃষি সম্ভাবনা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। প্রশ্ন হলো, আসন্ন বাজেট কৃষিকে একটি কৌশলগত উৎপাদনশীল খাত এবং এসডিজি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করবে, নাকি এটিকে একটি আর্থিক দায় হিসেবে দেখবে যা কেবল কমিয়ে আনা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের জুনে গৃহীত সিদ্ধান্তটির প্রভাব এই অর্থবছর ছাড়িয়েও অনেক সুদূরপ্রসারী হবে।
