নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ছিল, ‘এইচএসসি পাসে বিনামূল্যে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, ভাতা দিনে ২০০ টাকা’। প্রাথমিকভাবে প্রতিবেদনটি পড়ে মনে হবে, দেশের যুবসমাজের উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। অবশ্যই বিষয়টির সাথে আমি সহমত পোষণ করি। দেশের তরুণ সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ। যুবসমাজ হাতে কলমে শিক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করবে এবং আত্মনির্ভরশীল হবে, এটাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য, যা নিশ্চিতভাবে প্রশংসার দাবিদার। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সংকট বা অসঙ্গতি তৈরি হতে পারে, যার সম্ভাবনাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। আর তাই উল্লেখিত প্রতিবেদনটির ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটো দিকই আলোচনার ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব রাখে।
প্রকল্পের মূল ফোকাস এবং কিছু জরুরি প্রশ্ন
সরকার পরিচালিত ‘যুবকদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’র এই প্রকল্পে মূলত যে বিষয়গুলোতে ফোকাস করা হয়েছে, সেগুলো হলো, তিন মাসের ৬০০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ, দৈনিক ২০০ টাকা ভাতা, বিনামূল্যে অংশগ্রহণ এবং এইচএসসি পাস তরুণদের লক্ষ্য করে কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়ন। এই প্রকল্পটি নিয়ে বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা সমালোচনামূলক মূল্যায়নে আসি, তাহলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বা প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে।
১. প্রকল্পটি কি দ্রুত আয়ের বিকল্প পথকে বেশি উৎসাহ দিচ্ছে?
প্রতিবেদনটিতে প্রশিক্ষণ, ভাতা, খাবার ও দ্রুত কর্মসংস্থানের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সঙ্গে এই প্রশিক্ষণের সম্পর্ক বা সমন্বয় সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা নেই। এতে এমন একটি অদৃশ্য বার্তা তৈরি হতে পারে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘমেয়াদি পড়াশোনার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি স্কিল ট্রেনিং দ্রুত ও কার্যকর বিকল্প। বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বাস্তবিক ভাবে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের ভাবনা হতে পারে তারা কোনটা বেছে নেবে, চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নাকি তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে তাৎক্ষণিক আয়।
২. এটি উচ্চশিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করছে কিনা?
আমাদের দ্বিতীয় প্রশ্ন হতে পারে, এই উদ্যোগ বা প্রকল্প উচ্চশিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করছে কিনা। এক্ষেত্রে আমি বলব, সরাসরি হয়তো নয়, তবে পরোক্ষভাবে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করবে। কারণ, প্রকল্পটি এইচএসসি পরবর্তী পর্যায়কে লক্ষ্য করছে, প্রশিক্ষণকে চাকরি ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে এবং ডিগ্রির দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নিয়ে কোনো বার্তা নেই। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপে থাকা পরিবারগুলো দ্রুত আয়ের পথকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। ফলশ্রুতিতে কিছু শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীর পরিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পিছিয়ে দিতে বা বাদ দিতেই পারে। তবে এটাও সত্য যে, অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং শিখে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করতে পারে। তাই আমি বলব প্রকৃত সমস্যা “ফ্রিল্যান্সিং” নয়, সমস্যা তৈরি হবে তখন, যখন উচ্চশিক্ষার বিকল্প হিসেবে ফ্রিল্যান্সিংকে উপস্থাপন করা হবে।
৩. মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয় যে স্কিলই যথেষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি জরুরি বিষয় নয়, তাহলে সাধারণ জ্ঞানচর্চা, গবেষণামুখী শিক্ষা, বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা, মানবিক ও সামাজিক বোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কিন্তু কেবলমাত্র চাকরির প্রস্তুতি নয়, এটি নাগরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ভিত্তি। কিন্তু অতিরিক্ত দক্ষতাকেন্দ্রিক নীতি শিক্ষার এই বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সংকুচিত করতে পারে।
৪. প্রকল্পটির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রশিক্ষণটি দৈনিক ৮ ঘণ্টার এবং মোট ৬০০ ঘণ্টার। এটি কার্যত একটি ফুল টাইম প্রোগ্রাম। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি বা নিয়মিত একাডেমিক পড়াশোনার সঙ্গে এটি সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে। এ ছাড়াও প্রশিক্ষণের পর বাস্তবে কতজন নিয়মিত আয় করছে, কতজন আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে টিকে থাকছে, কতজন পরে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, এসব বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা প্রকল্প দিতে পারছে না। তাই এই ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা নামক শব্দটি থেকেই যাচ্ছে।
ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের করণীয়
আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় যে আলোচনা, সেটা হলো, সরকারের তাহলে এক্ষেত্রে কী করা উচিত। আমি মনে করি সরকারের এই উদ্যোগটি যুবসমাজের জন্য অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় এবং সম্ভাবনাময় দিক। তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আনলে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। যেমন,
- প্রকল্পটিকে “স্কিল বনাম ডিগ্রি” নয়, “স্কিল + ডিগ্রি” মডেল হিসেবে প্রচার করতে হবে।
- বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সঙ্গে সমন্বিতভাবে এই প্রকল্পটি চালু করা যেতে পারে।
- প্রশিক্ষণকে পার্ট টাইম বা ফ্লেক্সিবল করতে হবে।
- দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
- এবং উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, প্রকল্পটি কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এর নকশা ও প্রচারণা এমনভাবে হওয়া দরকার, যাতে তা তরুণদের উচ্চশিক্ষা থেকে দূরে না ঠেলে দেয়। বর্তমানে প্রকল্পটি সরাসরি উচ্চশিক্ষাবিরোধী নয় বা এর উদ্দেশ্যও একেবারেই নেতিবাচক নয়, কিন্তু সঠিক ভারসাম্য না থাকলে এটি দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা দুর্বল করতে পারে।
