সিদ্দিকী বাপ্পী
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান বোরো ধান উৎপাদন কেন্দ্র। প্রতি বছর এই অঞ্চল জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখে। কিন্তু সম্প্রতি প্রথম আলোতে প্রকাশিত “হাওরে চালের ক্ষতি ২ লাখ টন, দাম বাড়ছে” শিরোনামের সংবাদ শুধু একটি কৃষি সংকটের ইঙ্গিত নয়; এটি দেশের খাদ্যনীতি, কৃষি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
২ লাখ টন চালের ক্ষতি সংখ্যার দিক থেকে যতটা বড়, বাস্তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। কারণ হাওরের উৎপাদন কমে গেলে শুধু স্থানীয় কৃষক নয়, জাতীয় বাজারও চাপের মুখে পড়ে। চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হওয়ায় সামান্য ঘাটতিও দ্রুত বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা অনেক সময় ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কাকে ব্যবহার করে মজুত বৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, যা দাম আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই সংবাদের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই আলোচনায় আসে না।
প্রথমত, হাওরাঞ্চলের কৃষি এখনো অত্যন্ত জলবায়ুনির্ভর। অকাল বন্যা, অনিয়মিত বৃষ্টি, নদীর নাব্যতা হ্রাস ও অপরিকল্পিত বাঁধ ব্যবস্থাপনা প্রতি বছর একই ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক বাঁধ সময়মতো সংস্কার হয় না বা নিম্নমানের কাজের কারণে ভেঙে যায়। ফলে কৃষকের ফসল তলিয়ে যায়, কিন্তু দায় নির্ধারণ খুব কমই হয়।
দ্বিতীয়ত, কৃষকের প্রকৃত ক্ষতির হিসাব অনেক সময় পুরোপুরি সামনে আসে না। সংবাদে “২ লাখ টন ক্ষতি” বলা হলেও এর সঙ্গে কত পরিবার ঋণগ্রস্ত হবে, কত কৃষক পরবর্তী মৌসুমে চাষে অনিশ্চয়তায় পড়বে, কিংবা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে কী প্রভাব পড়বে- এসব বিষয় খুব কম আলোচিত হয়। অথচ কৃষি সংকট শুধু খাদ্য সংকট নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও।
তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় একটি কারণ। উৎপাদন কিছুটা কমলেই কেন দাম দ্রুত বাড়ে- এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। দেশে সরকারি খাদ্য মজুত কত আছে, আমদানির পরিকল্পনা কী, বাজার মনিটরিং কতটা কার্যকর- এসব তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে আসে না। ফলে গুজব ও আতঙ্ক বাজারকে আরও অস্থির করে তোলে।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং প্রায় নিয়মিত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় কৃষিতে অভিযোজন প্রযুক্তি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা বা বিকল্প ফসল পরিকল্পনায় বিনিয়োগ এখনো সীমিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষকের ন্যায্যমূল্য। উৎপাদনের সময় কৃষক কম দাম পায়, কিন্তু সংকট তৈরি হলে বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়- লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার নিয়ন্ত্রকদের হাতে। অর্থাৎ ক্ষতির সময় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত, আর মূল্যবৃদ্ধির সময়ও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ সেই কৃষকই !
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক আমদানি বা বাজার অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনীতি, হাওর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, কৃষি বীমা, আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তি এবং কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। একইসঙ্গে কৃষককে শুধু উৎপাদক নয়, খাদ্য নিরাপত্তার মূল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
হাওরে ২ লাখ টন চালের ক্ষতির সংবাদ তাই কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগের গল্প নয়; এটি আমাদের কৃষি ও নীতিগত প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি। এখন প্রশ্ন হলো- আমরা কি প্রতি বছর একই সংকটের খবর পড়েই থেমে থাকবো, নাকি এই সংকটকে ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ হিসেবে নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতি বাস্তবায়নের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবো, যা হবে বাস্তবিক সমস্যার প্রকৃত সমাধান।
