ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক
বাংলাদেশ কৃষি খাতে একটি উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় তীব্র খাদ্য ঘাটতিতে ভোগা একটি দেশ থেকে আজ এটি মূলত দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং উচ্চমূল্যের ফসলের একটি দ্রুত বর্ধনশীল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। তবে এই অগ্রগতির ধারা বজায় রাখতে কেবল বর্তমানের প্রচলিত ব্যবস্থা ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়। দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের প্রতিশ্রুতি এখন একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে কেবল তাৎক্ষণিক ফলন বৃদ্ধির চেষ্টা থেকে সরে এসে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি মডেল গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অগ্রগতির ভিত্তি ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের কৃষি খাতের এই অগ্রগতির ভিত্তি ইতিমধ্যে সুদৃঢ় হয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ধানের জাতের উদ্ভাবন, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, নিবিড় ফসল চাষ এবং সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে কিছু কাঠামোগত এবং নতুন উদ্ভূত সংকট এখন ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় ছায়া ফেলছে:
প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়: মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস, মাটির উর্বরা শক্তি কমে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট এবং একক ফসল হিসেবে কেবল ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: ফসল কাটার পরবর্তী অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, খণ্ডিত কৃষিজমি, অনুন্নত বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া এবং কৃষকদের কম আয় এই খাতের অর্থনৈতিক লাভকে সীমিত করছে।
মানবসম্পদ ও জলবায়ুর ঝুঁকি: বন্যা, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং খরার মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এর পাশাপাশি কৃষি থেকে যুবসমাজের দূরে সরে যাওয়া এবং সম্পদের মালিকানায় বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্য কৃষি খাতের মানবসম্পদকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
রূপান্তরের জন্য সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সুসমন্বিত ও পরিপূরক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। এই রূপান্তরকে সফল করতে কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
১. টেকসই উৎপাদনশীলতা ও বহুমুখীকরণ
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য কেবল ধান-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ডাল, তৈলবীজ, শাকসবজি, ফলমূল এবং মৎস্য চাষের পরিধি বাড়াতে হবে। এটি একই সাথে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করবে এবং কৃষকের আয়ের ঝুঁকি কমাবে। এছাড়া পরিবেশের ক্ষতি না করে ফলন বাড়াতে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি (প্রিসিশন অ্যাগ্রোনমি), সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং সুষম সারের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সম্প্রসারণ সেবাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি এবং ডিজিটাল তথ্য প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার মাঠপর্যায়ে নতুন উদ্ভাবন পৌঁছে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
২. জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি ব্যবস্থার প্রসার
জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষিকে এখন ব্যতিক্রমী কোনো উদ্যোগ হিসেবে না দেখে একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন:
- লবণাক্ততা-সহনশীল ফসলের জাতের সম্প্রসারণ।
- ধান চাষে পানি সাশ্রয়ী ও পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো (AWD) পদ্ধতির ব্যবহার।
- সংরক্ষণশীল কৃষি অনুশীলন, কৃষি-বনায়ন এবং সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
- মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার কর্মসূচি, ভূগর্ভস্থ পানির কৃত্রিম রিচার্জ এবং সুষম পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল ও কৃষকের জীবিকা রক্ষা করতে স্থানীয় অভিযোজন ব্যবস্থা এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ।
৩. বাজার কাঠামো ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন
বাজার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গ্রামীণ সড়ক, হিমাগার ব্যবস্থা (কোল্ড চেইন), গুদামজাতকরণ সুবিধা এবং ক্ষুদ্রভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, যা ফসল কাটার পরবর্তী ক্ষতি কমাবে এবং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করবে। সমবায় এবং কৃষক উৎপাদনকারী সংগঠনের মাধ্যমে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করা গেলে বাজারে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।
একই সঙ্গে সহজ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লজিস্টিকস খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাজার তথ্য ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, প্রান্তিক ও নারী কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও শস্য বিমার সুবিধা এবং উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ভরতুকি ব্যবস্থার সংস্কার সামগ্রিক পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করবে।
৪. ভূমি নীতি সংস্কার ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
ভূমি নীতিতে সংস্কার এনে জমির মালিকানার নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ইজারা ব্যবস্থার সহজীকরণ করলে খামারের যান্ত্রিকীকরণ সহজ হবে। ভাড়ায় কৃষিযন্ত্র মিলবে এমন সেবা কেন্দ্রের (কাস্টম-হায়ারিং সেন্টার) মাধ্যমে গ্রামীণ শ্রমসংকট দূর করা সম্ভব। মানবসম্পদে বিনিয়োগের অংশ হিসেবে গ্রামীণ যুবকদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কৃষি-ব্যবসা সংক্রান্ত শিক্ষাক্রম এবং ডিজিটাল দক্ষতার প্রসার ঘটাতে হবে। পাশাপাশি কৃষি জমি, উপকরণ, ঋণ ও প্রযুক্তিতে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। স্কুল মিল (দুপুরের খাবার) এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষাকে পুষ্টি-সংবেদনশীল কৃষির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
নীতিগত সমন্বয় ও দূরদর্শী পরিকল্পনা
সর্বোপরি, নীতিগত সফলতার জন্য বিভিন্ন খাতের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে হবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি ও পরিবেশ খাতের সমন্বয়ে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম গঠন করে সুসংহত ও পুষ্টি-সংবেদনশীল নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। উন্নত কৃষি পরিসংখ্যান, ভূমি ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এসডিজি (SDG) অর্জনের সঠিক প্রতিবেদন তৈরিতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে বীজের মান, উপকরণের মানদণ্ড এবং খাদ্য সুরক্ষায় আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হলে তা একদিকে দেশের ভোক্তাদের রক্ষা করবে এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
উপসংহার
বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন একটি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। তবে তা অর্জনে উৎপাদনশীলতার সাথে স্থায়িত্ব, পরিবেশ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাতে হবে। এই দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে তা দেশের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করবে, গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়াবে এবং কৃষি খাতকে দেশের সমতাভিত্তিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
