নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশে যৌনপেশা সবসময়ই একটি বিতর্কিত আলোচনার বিষয় । একদিকে এই দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের যৌনসেবা প্রদান আইনগতভাবে স্বীকৃত। আবার অন্যদিকে, এই আইনি স্বীকৃতি যৌনকর্মীদের জন্য নিরাপত্তা, মর্যাদা কিংবা মৌলিক অধিকার কখনই নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং বাস্তবতা হল, তথাকথিত আইনগত স্বীকৃতি বা বৈধতার আড়ালে গড়ে উঠেছে শোষণ, মানবপাচার, সহিংসতা ও সামাজিক অস্বীকৃতি এবং বর্জনের এক জটিল কাঠামো। তাই বাংলাদেশের যৌনশিল্পকে ঘিরে বিদ্যমান পরিস্থিতি কেবল আইন বা নৈতিকতায় প্রশ্নবিদ্ধ নয়; বরং এটি দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক কলঙ্ক, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সামাজিক বাস্তবতা। চলমান পরিস্থিতিতে এর বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে যে ঘাটতি বা সমস্যাগুলো দৃশ্যমান হয় সেগুলো হল-
বৈধতা আছে অথচ নিরাপত্তা নেই
বাংলাদেশে যৌনপেশা আইনত নিষিদ্ধ নয়। ২০০০ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে যৌনপেশাকে বৈধ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং যৌনপল্লী উচ্ছেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক কার্যক্রম এখনও বিভিন্ন আইনের আওতায় নিয়ন্ত্রিত বা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বাস্তবে যৌনকর্মীরা এক ধরনের আইনি অস্পষ্টতায় অবস্থান করেন। আইন তাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করে, অথচ কার্যকরভাবে সুরক্ষা দেয় না। য়ার এই অস্পষ্টতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
যৌনবাণিজ্যের পেছনের মূল বাস্তবতা
বাংলাদেশে নারী যৌনকর্মীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা এক থেকে দুই লাখের মধ্যে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নিবন্ধিত পতিতালয়, হোটেল বা ভাসমান যৌনকর্মের সঙ্গে যুক্ত। সংখ্যাটি একেবারে কম নয়! খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন দাঁড়ায় এখানে, একজন নারী কেন এই পেশায় আসেন?
গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যৌনকর্ম কোন স্বাধীন বা নির্বাচিত পেশা নয়। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, বাল্যবিবাহ, স্বামীর পরিত্যাগ, পারিবারিক সহিংসতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবপাচারের মতো কারণগুলো নারীদের এই পেশার দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ যৌনশিল্পকে ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে দেখলে বাস্তবতার বড় অংশে আড়াল থেকে যায়। এটি মূলত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ।
যৌনপল্লীগুলো প্রকৃতপক্ষে শোষণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া যৌনপল্লী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যৌনপল্লী হিসেবে পরিচিত। এখানে হাজারেরও বেশি নারী বসবাস ও কাজ করেন। কিন্তু এই শিল্পের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তথাকথিত ‘চুকরি’ প্রথা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক কিশোরীকে প্রতারণা, অপহরণ কিংবা বিক্রির মাধ্যমে যৌনপল্লীতে আনা হয়। এরপর তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় কৃত্রিম/ মিথ্যে ঋণের বোঝা, যা শোধ করতে গিয়ে বছরের পর বছর যৌনশোষণের শিকার হতে হয়, জিম্মি হয়ে থাকতে হয় যৌনপল্লীগুলোর শোষকদের কাছে। এটি কার্যত আধুনিক দাসত্বের একটি রূপ, যেখানে একজন মানুষের শ্রম, শরীর এবং স্বাধীনতা একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
মানবপাচার চক্রের অভয়ারণ্য যৌনপল্লী
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মানবপাচারপ্রবণ দেশ। নারী ও শিশু পাচারের বড় একটি অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যৌনবাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদ্বেগের বিষয় হলো, পাচারবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার ও দণ্ডের হার অত্যন্ত কম। গ্রেপ্তার ও মামলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয় অথবা প্রভাবশালী চক্রের কারণে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পাচারকারীদের জন্য ঝুঁকি কম, আর ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রায় অসম্ভবই থেকে যায়।
সহিংসতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট
যৌনকর্মীদের জীবনের সবচেয়ে কম আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো মানসিক স্বাস্থ্য। নিয়মিত সহিংসতা, সামাজিক অপমান, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ট্রমা এবং মাদকনির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ বাস্তবতা। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার হন। অনেক স্বাস্থ্যকর্মীর নেতিবাচক মনোভাব, সামাজিক কলঙ্ক এবং পরিচয় গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তা তাদের চিকিৎসাসেবা থেকেও দূরে রাখে। ফলাফল যা দাঁড়ায়, স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু যৌনকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
মাতৃ পরিচয়ে সন্তান কলঙ্কিত এবং নিগৃহীত হয়
যৌনপল্লীতে জন্ম নেওয়া শিশুদের জীবন শুরু হয় বৈষম্যের মধ্য দিয়ে। বিদ্যালয়ে ভর্তি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিচয়পত্র প্রাপ্তির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতেও তারা নানা বাধার সম্মুখীন হয়। অনেক শিশু কৈশোরে পৌঁছানোর আগেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করে কিংবা একই শোষণচক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। ফলে যৌনশিল্পের প্রভাব একটি প্রজন্মে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি প্রজন্মান্তরে দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
সমাজের দ্বিমুখী অবস্থান
বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে নেতিবাচক। তারা প্রায় সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, অবমানিত এবং অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। তবে এখানে একটি স্পষ্ট দ্বৈততা রয়েছে। সমাজ একদিকে যৌনপেশাকে অনৈতিক বলে নিন্দা করে, অন্যদিকে এই শিল্পের অস্তিত্বকে নীরবে মেনে নেয়। অর্থাৎ চাহিদা অস্বীকার করতে পারেনা, কিন্তু সেই চাহিদা পূরণকারী মানুষদের সামাজিকভাবে অস্বীকার করা হয়। এই দ্বৈত নৈতিকতা সমস্যার সমাধান তো করেই না; বরং সার্বিক শোষণকে আরও ত্বরান্বিত করে। আরও বিস্তারিত বর্ননায় গেলে বৈষম্য, ঘাটতি, সমস্যার বিস্তৃতি বাড়তেই থাকবে ক্রমান্বয়ে। তাই মূল ফোকাস যেখানে আসা উচিৎ সেটা হল , এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত?
ছোটখাটো কোন পরিকল্পনা বা কর্মসূচীর মাধ্যমে এই ব্যাপক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। স্থায়ী এবং সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক ফল পেতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং কর্মসূচীর উদ্যোগ আবশ্যক। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটিকে কেবল নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবাধিকার ও জননীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে।
প্রথমত, মানবপাচার প্রতিরোধে কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যৌনকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
তৃতীয়ত, যৌনপেশা ছেড়ে যেতে ইচ্ছুক নারীদের জন্য বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রয়োজন।
কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, নিরাপদ আবাসন, সামাজিক পুনর্বাসন এবং সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের যৌনবাণিজ্যকে ঘিরে বিদ্যমান বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে, আইনগত স্বীকৃতি কি যথেষ্ট, যদি সেই স্বীকৃতি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে না পারে?
যৌনকর্মীদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গল্প নয়; এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য, সহিংসতা এবং সামাজিক বর্জনের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিফলন। তাই সমস্যাটির সমাধানও কেবল আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে কোনো নাগরিক তার পেশা বা পরিচয়ের কারণে সুরক্ষা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত না হয়।
