জাহিদ হাসান
ফ্রিলান্স সাংবাদিক
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন শাসনব্যবস্থা মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী স্তর পর্যন্ত পৌঁছাবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা এবং সিটি করপোরেশন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোই নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে। রাস্তা, পানি, স্যানিটেশন, জন্মনিবন্ধন এবং স্থানীয় ন্যায়বিচারের মতো সেবা এই স্তর থেকেই মানুষের কাছে পৌঁছে।
দীর্ঘদিন ধরে দলীয় দখলদারি, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং নির্বাচনী সহিংসতায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের যে অঙ্গীকার করেছে, তা একই সঙ্গে একটি সুযোগ এবং পরীক্ষা। এই সুযোগ কাজে লাগানো বা ব্যর্থ হওয়া অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচনের আগে গৃহীত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মানের ওপর।
দলনিরপেক্ষ নির্বাচন পুনঃপ্রতিষ্ঠা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর একটি হলো দলনিরপেক্ষ স্থানীয় নির্বাচন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ফলে আগে যে নির্বাচনগুলো মূলত স্থানীয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক ছিল, তা জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্প্রসারণে পরিণত হয়। এর ফল ছিল পূর্বানুমেয় ও গুরুতর: সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের দুর্বলতা এবং দলীয় আনুগত্যের কাছে জনগণের চাহিদা চাপা পড়ে যাওয়া।
২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদ কর্তৃক এই বিধান বাতিল করা সঠিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে কেবল আইনগত কাঠামো পুনঃস্থাপনই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনগতভাবে বাধ্য করতে হবে যেন তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন, অর্থায়ন বা প্রচারণা না করে। নামমাত্র দলনিরপেক্ষ নির্বাচন যদি বাস্তবে দলীয় হয়, তবে তা সংস্কারের পরিবর্তে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই থেকে যাবে।
একক নির্বাচনী কাঠামো প্রণয়ন
বাংলাদেশে বর্তমানে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরের জন্য পাঁচটি পৃথক আইন রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন প্রতিটি আলাদা আইনে পরিচালিত হয়। এই বিভাজন নিয়মের অসামঞ্জস্য, ক্ষমতার ওভারল্যাপ এবং নির্বাচনী সময়সূচির জটিলতা তৈরি করে, যা ব্যয় বাড়ায় এবং জবাবদিহিতা দুর্বল করে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে একটি একীভূত আইন প্রণয়নের খসড়া তৈরি করেছে। নতুন সরকারকে নির্বাচন ঘোষণার আগেই এই আইন পর্যালোচনা ও পাসকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একক আইন প্রণয়ন করা গেলে সব স্তরের স্থানীয় সরকারে একই সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে। এতে মোট নির্বাচনী ব্যয় বর্তমানের প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে আসবে এবং সব স্থানীয় প্রতিষ্ঠান একই সময়ে কার্যকাল শুরু করতে পারবে।
ওয়ার্ড কাঠামো ও প্রতিনিধিত্ব সংস্কার
ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান ওয়ার্ড কাঠামো জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনো ইউনিয়নে চার হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও অন্য কোনো ইউনিয়নে তা চার লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে, অথচ সব ক্ষেত্রেই নয়টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়। এর ফলে প্রতিনিধিত্বে ভয়াবহ অসমতা তৈরি হয়।
কোনো কোনো ওয়ার্ড সদস্যকে শত শত বর্গকিলোমিটার এলাকা পরিচালনা করতে হয়, আবার কোথাও ঘনবসতিপূর্ণ ছোট এলাকায় দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকে। আইন সংস্কারের মাধ্যমে জনসংখ্যা ও এলাকার ভিত্তিতে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যেখানে প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ জন বাসিন্দা থাকবে। একইভাবে উপজেলা ও জেলা পরিষদকেও সুস্পষ্ট নির্বাচনী ওয়ার্ড কাঠামোর ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি থেকে সৃষ্ট জবাবদিহিতার ঘাটতি দূর হয়।
নারী অংশগ্রহণ জোরদার করা
স্থানীয় সরকারের সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক ফল দিতে পারেনি। বর্তমানে তিন ওয়ার্ডভিত্তিক নির্বাচিত নারী সদস্যরা পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে একই ভৌগোলিক এলাকায় দায়িত্ব ভাগ করে নেন, ফলে তাদের ক্ষমতা ও ভূমিকা কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি ঘূর্ণায়মান সংরক্ষণ পদ্ধতি চালু করা উচিত, যেখানে প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে মোট ওয়ার্ডের ৩০ শতাংশ নারী প্রার্থীদের জন্য পর্যায়ক্রমে সংরক্ষিত থাকবে। এতে নারীরা সরাসরি ওয়ার্ডভিত্তিক ম্যান্ডেট নিয়ে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারবেন।
নির্বাচনী প্রশাসন ও আচরণবিধি
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত বিভিন্ন সংস্কার, যেমন পোস্টার নিষিদ্ধকরণ, ইভিএম বাতিল, এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর শর্ত বাতিল, এবং পলাতক আসামিদের প্রার্থিতার অযোগ্যতা ঘোষণা, এগুলো কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার। তবে এগুলো কেবল নির্দেশিকা হিসেবে নয়, বরং আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। নির্বাচন কমিশন নিজেই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চারটি শর্ত চিহ্নিত করেছে: সরকারের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, শক্তিশালী ও দৃঢ় নির্বাচন কমিশন এবং মাঠপর্যায়ে সৎ নির্বাচনী কর্মকর্তা। এই প্রতিটি শর্তই শুধু সদিচ্ছার ওপর নয়, বরং আইনি বাধ্যবাধকতা ও লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।
স্থানীয় সরকারই হলো সেই জায়গা, যেখানে গণতন্ত্র বাস্তব জীবনে কার্যকর হয়। উপরোক্ত সংস্কারগুলো কোনো প্রক্রিয়াগত বিলাসিতা নয়, বরং গণতন্ত্রের কাঠামোগত ভিত্তি। দলীয় দখলদারি ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় যে আস্থা ক্ষয় হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতে হলে এই কাঠামোগত সংস্কারগুলো অপরিহার্য। এগুলো ছাড়া কোনো নির্বাচন, যতই প্রযুক্তিগতভাবে সুষ্ঠু হোক না কেন, প্রকৃত গণতান্ত্রিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে না।
