ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
গত সপ্তাহে আমরা বাংলাদেশের কারাগারের বর্তমান অবস্থা এবং সাজাভোগ শেষে বন্দিদের পুনর্বাসন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে প্রস্তাবিত উদ্যোগসমূহ আলোচনা করেছি। এ সপ্তাহে আমরা সেই পুনর্বাসন সংস্কার প্রস্তাবগুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করছি।
বাংলাদেশে এখনও কার্যকর থাকা ১৮৯৪ সালের প্রিজনস অ্যাক্ট সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করে একটি আধুনিক কারেকশনাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট প্রণয়ন করা জরুরি। এই নতুন আইনে পুনর্বাসনকে কারাবাসের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার বিধান রাখতে হবে এবং বন্দিদের প্রতি আচরণ ও কারাগারের পরিবেশ সম্পর্কে বাধ্যতামূলক মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কারা বিভাগের নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে তার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছে। এখন প্রয়োজন এমন আইন, প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের, যা সেই নতুন পরিচয়কে বাস্তব অর্থ দেবে। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে বেসরকারি খাত।
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, মুনাফার প্রণোদনা ও বিপরীতমুখী ঝুঁকি
বন্দিদের পুনর্বাসনভিত্তিক মডেলকে বৃহৎ পরিসরে কার্যকর করতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সরকারকে এমন আনুষ্ঠানিক আইনি ও আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে, যার মধ্যে কর সুবিধা এবং সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাবেক বন্দিদের নিয়োগে উৎসাহিত হয়। তৈরি পোশাক, নির্মাণ, হালকা উৎপাদনশিল্প এবং আতিথেয়তা খাতের শিল্প সংগঠনগুলোকে কারেকশন সার্ভিসের সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় আনা যেতে পারে। এসব চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কারাগার থেকে শিক্ষানবিশ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
কিছু কারাগারকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা যেতে পারে, যেখানে তত্ত্বাবধানের আওতায় বন্দিরা বাস্তব উৎপাদন কার্যক্রমে অংশ নেবে। এতে তারা সামান্য পারিশ্রমিক পাবে, পেশাগত অভ্যাস গড়ে তুলবে এবং কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, যা মুক্তির পর চাকরি পেতে সহায়তা করবে। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, কারাগারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সঙ্গে বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জও জড়িত। চুক্তি কাঠামো, জবাবদিহিতা, জনবল ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার এবং বাজারভিত্তিক প্রণোদনার মতো বিষয়গুলো সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে এই ধরনের অংশীদারিত্বের ফলাফল দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা হলো মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য এবং পুনর্বাসনের সামাজিক উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেসরকারি কারাগার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বন্দিপ্রতি দৈনিক ভিত্তিতে অর্থ পায়। ফলে তাদের আর্থিক স্বার্থ কারাগার পূর্ণ রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত, পুনরায় অপরাধ কমানোর সঙ্গে নয়। ফ্লোরিডার কিশোর সংশোধনাগার নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, লাভভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হলেও সেখানে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হার সরকারি ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি সাশ্রয় দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। মুনাফাভিত্তিক পরিচালনার কারণে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, খাদ্যের মান এবং বন্দি সেবায় ব্যয় কমানোর প্রবণতাও দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি কারাগারের কর্মীরা সরকারি খাতের কর্মীদের তুলনায় কম বেতন এবং কম প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন।
জবাবদিহিতার ঘাটতি ও দায় এড়ানোর প্রবণতা
কারা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যস্ত করা হয়, তখন রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা মূলত চুক্তির সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর বাইরে দৈনন্দিন কার্যক্রমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সমালোচকদের মতে, এতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে সমস্যা দেখা দিলে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একে অপরের ওপর দোষ চাপাতে পারে। অতিরিক্ত চুক্তিনির্ভর তদারকির কারণে সরকার অনেক সময় নিজের মৌলিক দায়িত্ব পালনে উদাসীন হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা দেখায়, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া চুক্তি স্বাক্ষর এবং পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদত্যাগের ফলে সরকারি কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
চুক্তি প্রণয়নের জটিলতা
কারাগার পরিচালনার জন্য কার্যকর চুক্তি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমন বলপ্রয়োগের যথার্থতা, কর্মীদের দক্ষতা, কর্মকর্তা ও বন্দির সম্পর্কের মান কিংবা পুনর্বাসনে প্রকৃত অংশগ্রহণ, আগাম নির্ভুলভাবে নির্ধারণ বা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। যেখানে চুক্তির ভিত্তি বন্দির সংখ্যা, সেখানে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করে। আবার যেখানে কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর মূল্যায়ন হয়, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র সেই সূচকগুলো পূরণে মনোযোগ দেয়, অথচ কারাজীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত থেকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ব্রাজিলের মডেল তুলনা করে করা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রণোদনা কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং তদারকি ব্যবস্থার ভিন্নতার কারণে ফলাফলও ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কোনো একক মডেল সব ক্ষেত্রে সেরা ফল দিতে সক্ষম হয়নি। এছাড়া বেসরকারিকরণের মাধ্যমে ব্যয় সাশ্রয়ের যে দাবি করা হয়, বাস্তবে তা প্রায়ই অতিরঞ্জিত। যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশিত ২০ শতাংশ সাশ্রয়ের পরিবর্তে গড় সাশ্রয় মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।
কর্মীদের দক্ষতা ও উচ্চ পদত্যাগ হার
বেসরকারি কারাগারে কর্মরত জনবল সাধারণত সংখ্যায় কম, অভিজ্ঞতায় দুর্বল এবং চাকরি পরিবর্তনের হার বেশি। কম বেতন, সীমিত সুবিধা এবং প্রশিক্ষণে কম বিনিয়োগের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ফলে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের কর্মজীবনে গড়ে ওঠা সম্পর্কভিত্তিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা কারাগারের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গবেষণায় দেখা গেছে, বেসরকারি কারাগারের কর্মীরা অনেক সময় বন্দিদের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করলেও জনবল সংকট ও অভিজ্ঞতার অভাব নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং পেশাগত আচরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি করে।
মানবাধিকার ও বন্দি কল্যাণ নিয়ে উদ্বেগ
বিভিন্ন দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত কারাগারগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথিভুক্ত উদাহরণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে করেকশনস কর্পোরেশন অব আমেরিকা-র বিরুদ্ধে কিশোর বন্দিদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে ওয়াকেনহাট করেকশনস কর্পোরেশন-কে শারীরিক শাস্তি ও যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের প্রথা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু বেসরকারি কারাগারে মাদক ব্যবহার, বন্দিদের অসদাচরণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের হার সরকারি কারাগারের তুলনায় বেশি। বন্দিশয্যা পূর্ণ রাখার উদ্দেশ্যে এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের ফলে অনেক বন্দি আদালতনির্ধারিত চিকিৎসা বা পুনর্বাসন কর্মসূচি থেকেও বঞ্চিত হয়।
প্রতিযোগিতার প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়া
বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার অন্যতম যুক্তি হলো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেবার মান বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তব গবেষণা এই ধারণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে না। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সংশোধনাগার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিযোগিতার ইতিবাচক প্রভাব যাচাইয়ের জন্য পরিচালিত ৪৮টি পরিসংখ্যানগত পরীক্ষার মধ্যে মাত্র দুটিতে সমর্থনমূলক ফল পাওয়া গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক ও অপ্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি।
সামাজিক কলঙ্ক ও নিয়োগদাতাদের অনীহা
কারিগরি প্রশিক্ষণভিত্তিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও বড় বাধা হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্দিশ্রম কর্মসূচিতে অংশ নিতে অনাগ্রহী, কারণ সমাজে বন্দি ও সাবেক বন্দিদের প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক মনোভাব তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কারাগারের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দির পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। এই সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক কুসংস্কার একসঙ্গে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগকে সংকুচিত করে। অর্থনৈতিক মন্দা বা আর্থিক সংকটের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে কর প্রণোদনা দেওয়ার মতো নীতিমালা প্রণয়নও রাজনৈতিকভাবে জটিল হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্য
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র হতে পারে। কারণ দেশে জটিল সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব চুক্তি পরিচালনার অভিজ্ঞতা সীমিত, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় দুর্নীতির ঝুঁকি রয়েছে, কারাবন্দিদের গড় শিক্ষাগত মান তুলনামূলকভাবে কম এবং সাবেক বন্দিদের নিয়োগে সামাজিক অনীহাও প্রবল। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশ যদি এই ধরনের অংশীদারিত্ব মডেল গ্রহণ করতে চায়, তবে অংশীদারিত্বের পাশাপাশি এর তদারকি কাঠামোতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হারভিত্তিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং বেসরকারি কর্মসূচির মধ্যে বাধ্যতামূলক সরকারি নজরদারি নিশ্চিত না করলে প্রকৃত পুনর্বাসনের পরিবর্তে শুধু ব্যয় ও ঝুঁকি সরকারি খাত থেকে বেসরকারি খাতে স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকবে।
