ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশ বর্তমানে তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। এই বাজেটের মাধ্যমে একটি উৎপাদনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এবারের বাজেট তাই কেবল একটি নিয়মিত আর্থিক পরিকল্পনাই নয়; বরং এই বাজেট এমন একটি নীতিগত কাঠামো হতে পারে, যা উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। তবে প্রশ্ন হলো, এই বার্তা, এই প্রত্যাশা এবং এই কৌশল কি বাজেটে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? এই সম্পর্কিত আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা থেকে এই বাজেটের পর্যালোচনায় অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ কিছু প্রশ্ন এই রিপোর্টে তুলে ধরছে।
সংস্কারের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৪৯ শতাংশে এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৯.০৪ শতাংশে। এই পরিসংখ্যানগুলো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে একই সঙ্গে এগুলো এটিও নির্দেশ করে যে এখনই সাহসী ও কাঠামোগত সংস্কারের সময়। এই বাজেটে কী আমরা তেমন কোনো সুষ্পষ্ট দিক-নির্দেশনা পেয়েছি?
সরকার ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি আকারের বাজেট প্রস্তাব করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সক্ষমতা উন্মোচনের মতো ধারাবাহিক সংস্কার অপরিহার্য। এই বাজেটের অন্তর্নিহিত উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধির বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যথাযথ নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। ১১ই জুনে প্রস্তাবিত বাজেটে কী আমরা সেসব নীতিগত পদক্ষেপের স্পষ্ট ধারণা পেয়েছি?
জ্বালানি খাতকে গতিশীল করা: জাতীয় উৎপাদনের অপরিহার্য শর্ত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হলো জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি এবং উচ্চ ব্যয় শিল্প উৎপাদন, কৃষি কার্যক্রম এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। স্থাপিত সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়ার পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দিকে নীতিগত পরিবর্তন ঘটানো গেলে অর্থনীতির প্রতিটি উৎপাদনশীল খাত উপকৃত হবে।
সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি উৎপাদন ব্যয় কমাতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আঞ্চলিক পর্যায়ে এই জ্বালানি রূপান্তর পূর্বাঞ্চলীয় শিল্প করিডোরগুলোতে সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে এবং বাংলাদেশকে উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য আরও আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আমাদেরকে ভাবতে হবে, ১১ই জুনের প্রস্তাবিত বাজেটে কী এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে?
উন্নত সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক উৎপাদন শক্তিশালী করা
সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান এবং সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণও সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সুষ্ঠুভাবে পরিকল্পিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কৃষি, সেচ, গ্রামীণ পরিবহন, কোল্ড স্টোরেজ অবকাঠামো এবং জলবায়ু সহনশীলতা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে পারে। এই বিনিয়োগগুলো শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা তৃণমূল পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তা এবং ফসল কাটার পর ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও গ্রামীণ অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ক্ষুদ্র কৃষক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বাজার ও উৎপাদন উপকরণের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত করবে। একই সঙ্গে শ্রমঘন সরকারি কর্মসূচিগুলো দারিদ্র্য হ্রাস, পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে। আমাদের ডেস্কের প্রশ্ন, আমরা কী এই প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি বিনিয়োগের সাথে আন্চলিক উত্পাদনের কোনো সামন্জন্যপূর্ণ পরিকল্পনা পেয়েছি?
বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুযোগ উন্মোচন
উৎপাদন ধরে রাখতে ব্যবসাবান্ধব নীতিগত সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ শতাংশ ছিল। এই বিনিয়োগকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। প্রশ্ন হলো, সদ্য ঘোষিত বাজেট কি এই বার্তাটি যথেষ্ট স্পষ্টভাবে দিতে পেরেছে? দ্রুত কাস্টমস নিষ্পত্তি, সময়মতো ভ্যাট ও শুল্ক ফেরত, উন্নত বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সহজতর ব্যবসায়িক নিয়মকানুন উৎপাদকদের ব্যয় ও জটিলতা কমাতে পারে। এই বাজেট তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাত ইতোমধ্যেই শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রাখে।
লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক প্রণোদনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করা গেলে এসব খাত ভবিষ্যতের নতুন উৎপাদনভিত্তিক অর্থনৈতিক স্তম্ভে পরিণত হতে পারে এবং স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাজেটে কি এসব বিষয়ে যথেষ্ট কার্যকর ও সুস্পষ্ট কৌশল রয়েছে?
সামাজিক অবকাঠামোও একটি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ
দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতার ভিত্তি হলো সুস্থ, শিক্ষিত এবং দক্ষ জনগোষ্ঠী। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কেবল সামাজিক ব্যয় নয়; বরং জাতীয় উৎপাদন সক্ষমতার ওপর বিনিয়োগ। একটি কার্যকর ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, যা নির্ভুল উপকারভোগী তথ্যভান্ডার এবং ডিজিটাল অর্থপ্রদানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
যখন শ্রমশক্তি সুস্থ, দক্ষ এবং অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ থাকে, তখন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বাজেটের তথ্যগুলোতে কি আমরা এসব বিষয়ের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি?
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে একটি বাজেট
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে প্রণয়ন করা হয়েছে, যখন বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। সুশৃঙ্খল রাজস্ব আহরণ, স্বচ্ছ ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিমুখী ব্যয়ের মাধ্যমে দেশ একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে। এই বাজেটে অন্তর্ভুক্ত সংস্কারগুলো কেবল বর্তমান চাপ মোকাবিলার জন্য নয়; বরং আগামী প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করা উচিত।
বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা রয়েছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষাও রয়েছে, এবং বর্তমান নীতিগত পরিবেশও এই রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট কী সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষ্যে যথেষ্ট শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দিতে পেরেছে?
