নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিক পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট কেবল প্রশাসনিক নথি নয়; এগুলো নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, রাষ্ট্রীয় সেবায় প্রবেশাধিকার এবং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট সেবা ঘিরে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা নাগরিকবান্ধব প্রশাসনের ধারণার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক। লাখো মানুষ প্রতিনিয়ত পরিচয়পত্র সংশোধন, তথ্য হালনাগাদ কিংবা পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, জটিল প্রক্রিয়া এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়ার মত বিড়ম্বনা এবং জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে নাগরিক পরিচয় সুনিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা ব্যবস্থাই অনেক সময় নাগরিক চরম ভোগান্তির অন্যতম উৎসে পরিণত হচ্ছে।
আলোচনার শুরুতেই এন আইডি এবং পাসপোর্ট করতে গিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে জনসাধারণ চরম ভোগান্তি এবং বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন তার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে চাই।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
বাংলাদেশে এনআইডি বর্তমানে প্রায় সব ধরনের নাগরিক কার্যক্রমের পূর্বশর্ত। ব্যাংকিং সেবা, ভূমি নিবন্ধন, ব্যবসা পরিচালনা, কর প্রদান, সরকারি ভাতা গ্রহণ থেকে শুরু করে ভোটাধিকার প্রয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটি অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবে এনআইডি সংশোধন বা তথ্য হালনাগাদের প্রক্রিয়া বহু নাগরিকের জন্য এক ধরনের প্রশাসনিক গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। নামের বানান, জন্মতারিখ কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের সামান্য ভুল সংশোধনের জন্য আবেদনকারীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার উপজেলা বা জেলা কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার পরও সমস্যার সমাধান হয় না।
এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ভুলের একটি বড় অংশ আবেদনকারীদের কারণে নয়; বরং তথ্য সংরক্ষণ ও এন্ট্রির সময় সৃষ্ট প্রশাসনিক ত্রুটির ফল। অথচ সেই ভুল সংশোধনের দায়ও শেষ পর্যন্ত নাগরিককেই বহন করতে হয়। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, রাষ্ট্রের ভুলের মূল্য কেন নাগরিককে দিতে হবে?
প্রান্তিক মানুষের জন্য দ্বিগুণ বিড়ম্বনা
এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো সামাজিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা। যেসব শিশু জৈবিক পিতা-মাতার পরিবর্তে দাদা-দাদি, আত্মীয়স্বজন কিংবা আইনগত অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে বড় হয়েছেন, তাদের পরিচয় নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা দেখা দেয়। বিদ্যমান ফরম ও ডাটাবেজ কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্প অভিভাবকত্বকে স্বীকৃতি দেয় না। ফলে নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্নে এক ধরনের অদৃশ্য বৈষম্য তৈরি হয়। প্রশাসনিক নথিতে ব্যবহৃত কিছু শব্দ বা পরিচয়চিহ্ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। তাই এক্ষেত্রে আমি বলব, এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; বরং নাগরিক মর্যাদা ও মানবিক অধিকারের প্রশ্ন।
পাসপোর্ট যখন সরাসরি এনআইডির তথ্যের সাথে যুক্ত
এনআইডির জটিলতা যখন পাসপোর্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সমস্যার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। ই-পাসপোর্ট চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ভ্রমণ নথি প্রবর্তন করেছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ডাটাবেজ সমন্বয় না হওয়ায় নাগরিকদের ভোগান্তি অনেক ক্ষেত্রে কমার বদলে বেড়েছে। এনআইডি ও পাসপোর্ট তথ্যের মধ্যে সামান্য অমিল থাকলেও আবেদন স্থগিত হতে পারে। অনেক আবেদনকারীকে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই, নতুন কাগজপত্র সংগ্রহ এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে অভিভাবক-সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে জটিলতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এতে শিক্ষার্থী, বিদেশগামী কর্মী, চিকিৎসাপ্রার্থী এবং জরুরি প্রয়োজনে বিদেশযাত্রাকারী নাগরিকরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
বিচ্ছিন্ন পরিচয়ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতা
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন পরিচয়ব্যবস্থা। বর্তমানে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট-এই তিনটি তথ্যভান্ডার পৃথক প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হয়। ফলে একটি ডাটাবেজে সামান্য অসঙ্গতি থাকলেও তা অন্য দুটি ব্যবস্থায় জটিলতা সৃষ্টি করে। বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে নাগরিকের তথ্য একবার যাচাই হয়ে গেলে তা সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সেবায় ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশে সেই সমন্বয়ের অভাব নাগরিক সেবাকে ধীর, ব্যয়বহুল এবং অকার্যকর করে তুলেছে।
সুশাসন এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার অভাব
এনআইডি ও পাসপোর্ট সেবার সংকট কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি মূলত সুশাসনের একটি পরীক্ষা। একটি কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হলো, সেবাপ্রার্থীকে নয়, প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ হতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নাগরিকদেরই প্রমাণ করতে হয় যে তারা আসলে তারাই, যাদের পরিচয় রাষ্ট্র ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা কমিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রীয় সেবার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সংস্কারে যা প্রয়োজন
দেশের সাধারণ জনগনের মৌলিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট যা তার নাগরিক হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত করে। তাই জটিলতা বা সমস্যা আলোচনার চেয়েও জরুরী প্রয়োজন এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি কি পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক তার আলোচনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কয়েকটি মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়িত হলেই অনেকাংশে জটিলতা, বিড়ম্বনা কমে আসবে।
প্রথমত, জন্মনিবন্ধন, এনআইডি এবং পাসপোর্ট তথ্যভান্ডারকে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিচয় প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে। একটি তথ্য সংশোধিত হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, আইনগত অভিভাবকত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে আবেদনপত্র ও ডাটাবেজ কাঠামো আধুনিকায়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত, সংশোধন আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে নাগরিকরা তাদের আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পান। চতুর্থত, উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন এবং পাসপোর্টসংক্রান্ত সেবা একই ছাদের নিচে পাওয়া যাবে। পঞ্চমত, সার্ভার নির্ভরতা ও প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা কমাতে শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বিকল্প ব্যাকআপ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিক পরিচয়সংক্রান্ত সেবা হওয়া উচিত দ্রুত, নির্ভুল ও মানবিক। কিন্তু বাংলাদেশে এনআইডি ও পাসপোর্ট সেবা এখনও এমন এক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তির চেয়ে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব, জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং নাগরিককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি। নাগরিকরা রাষ্ট্রের সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে যেন বারবার প্রমাণের বোঝা বহন করতে বাধ্য না হন। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নয়, বরং নাগরিকের সময়, মর্যাদা ও অধিকারকে কতটা সম্মান করে, তার ওপরই নির্ভর করে। এনআইডি ও পাসপোর্ট ব্যবস্থার সংস্কার তাই শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; এটি নাগরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রকে আরও মানবিক ও কার্যকর করে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত।
