রুকসানা আখতার
ফ্রিল্যান্স স্থপতি
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এর একটি অংশ ভারতের ভূখণ্ডে বিস্তৃত হলেও বাংলাদেশের খুলনা বিভাগই এই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের মূল কেন্দ্র। জোয়ারভাটার নদীনালা, ঘন ম্যানগ্রোভ বনভূমি এবং অসাধারণ জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল একসময় ছিল প্রায় দুর্ভেদ্য অরণ্য।
বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এই বন এমন এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে, যার প্রভাব এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবসৃষ্ট অনুপ্রবেশ এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অমূল্য বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা হবে দীর্ঘ ও কঠিন একটি প্রক্রিয়া।
সুন্দরবনের বর্তমান অবস্থা
ক্রমবর্ধমান নানা চাপের কারণে খুলনা অঞ্চলের সুন্দরবন দৃশ্যমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যার কারণে লবণাক্ত পানি বনভূমির গভীরে প্রবেশ করছে। এতে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লবণাক্ততার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে এর প্রধান বৃক্ষ সুন্দরীর নাম অনুসারে। অথচ অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এই গাছ এখন উদ্বেগজনক হারে মারা যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এ সমস্যাকে বলা হয় ‘টপ ডাইং’। বনভূমির বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সুন্দরী গাছের শীর্ষভাগ শুকিয়ে যাচ্ছে; একসময়ের সবুজ ছাউনির স্থানে দেখা যাচ্ছে বিবর্ণ ও কঙ্কালসার অবয়ব।
অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতাও বেড়েছে। ২০০৭ সালের সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলার মতো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবনের বিপুল ক্ষতি করেছে। অসংখ্য গাছ উপড়ে গেছে, বদলে গেছে বদ্বীপ অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত থেকে সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। কিন্তু ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে কাঠ, জ্বালানি, মধু ও মাছ সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল মানুষের চাপ বনটির পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। বনটির সবচেয়ে পরিচিত বাসিন্দা রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংকুচিত আবাসস্থল এবং মানুষ-বাঘ সংঘাত বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। হ্রাস পেয়েছে ইরাবতী ডলফিন, মোহনা কুমির এবং বিভিন্ন পরিযায়ী পাখির সংখ্যাও।সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধ শিকার ও মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। এর অন্যতম কারণ হলো বন রক্ষায় নিয়োজিত জনবল ও সম্পদের ঘাটতি।
শিল্পায়নজনিত হুমকিও ক্রমশ বাড়ছে। সুন্দরবনের সীমানার কাছাকাছি নির্মিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে পরিবেশবিদ ও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। নদীপথে জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি, সম্ভাব্য তেল দূষণ, তাপীয় বর্জ্য এবং বায়ুদূষণ বনটির জলজ ও স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কী করা প্রয়োজন
সুন্দরবনের অবক্ষয় রোধ এবং এর দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমেই বনাঞ্চলে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাফার জোন বা সুরক্ষা অঞ্চল কঠোরভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং বনরক্ষীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বেতন, আধুনিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অবৈধ শিকার, বন উজাড় ও অননুমোদিত মাছ ধরা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ড্রোনভিত্তিক নজরদারিসহ আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
একই সঙ্গে বনাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের অনেকেই জীবিকার জন্য সরাসরি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি না করে কেবল বিধিনিষেধ আরোপ করলে তা কার্যকর হবে না। এ কারণে পরিবেশবান্ধব পর্যটন, টেকসই মৎস্য ও চিংড়ি চাষ এবং মধু উৎপাদন কর্মসূচিকে সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকির আওতায় আনতে হবে। এতে বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠী বন ধ্বংসের পরিবর্তে সংরক্ষণের অংশীদার হয়ে উঠবে।
জলবায়ু অভিযোজনকে বন ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পুনঃবনায়নের ক্ষেত্রে এমন ম্যানগ্রোভ প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেগুলো অধিক লবণাক্ত পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম। এছাড়া গঙ্গা ও গড়াই নদী ব্যবস্থার পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে ভারতের সঙ্গে ন্যায্য পানি বণ্টন নিয়ে কার্যকর আলোচনা জরুরি। কারণ এই নদীগুলোর প্রবাহ সুন্দরবনের জলবৈজ্ঞানিক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সুন্দরবন সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগিতা কর্মসূচি থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত ‘সুন্দরবন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ গঠনও সময়ের দাবি।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়। এটি কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ, অমূল্য জীববৈচিত্র্যের আধার এবং বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। তাই সুন্দরবন রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।
