ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলাদেশ এমন এক সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা যেমন পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায়, তেমনি পরিবারকেন্দ্রিক রক্ষণশীল সমাজের জন্য অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর বাস্তবতাও তৈরি করছে। নারীর শিক্ষার হার বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিস্তার এবং আত্মবিশ্বাস ও আইনগত সচেতনতা নিয়ে বৈবাহিক জীবনে প্রবেশ করা নতুন প্রজন্মের নারীরা দাম্পত্য সম্পর্কের কাঠামো ও তার পরিণতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিচ্ছেন।
একসময় সাংস্কৃতিক বাস্তবতার কারণে বিবাহবিচ্ছেদের হার ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ বোঝার জন্য উন্নয়ন ও পারিবারিক বিচ্ছেদের মধ্যকার সম্পর্ককে বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের ফলে মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ে, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
সামাজিক পরিবর্তন ও মাতৃস্বাস্থ্যের মূল্য
বিবাহবিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেই লাখো নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। আগের প্রজন্মের অনেক নারীর কাছে এমন সুযোগ ছিল না। বর্তমানে অনেক বিবাহবিচ্ছেদ ঘটছে পারিবারিক সহিংসতা, জোরপূর্বক আর্থিক নির্ভরশীলতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত বিয়ের মতো পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস হিসেবে। এসব নারীর জন্য বিবাহবিচ্ছেদ আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি পথ।
তবে মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়। গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মদানের পর বৈবাহিক বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীরা প্রসবপূর্ব বিষণ্নতা, প্রসবপরবর্তী বিষণ্নতা এবং উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় মানসিক চাপ অকাল প্রসব, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং প্রসূতি জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে যেখানে রক্তক্ষরণ ও এক্ল্যাম্পসিয়া মিলিয়ে মাতৃমৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি ঘটে, সেখানে বিবাহবিচ্ছেদের মুখোমুখি হওয়া নারীদের অদৃশ্য মানসিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অথচ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো এই ঝুঁকি নিয়মিতভাবে শনাক্ত বা পর্যবেক্ষণ করে না।
শহর ও গ্রামের বাস্তবতা
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে বিবাহবিচ্ছেদকে আগের তুলনায় অনেক কম সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয়। শহুরে নারীরা আইনগত সহায়তা এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সংযুক্ত থাকেন, যা বিচ্ছেদের পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করে। গ্রামীণ বাংলাদেশে চিত্রটি অনেক বেশি উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে এখনো অনানুষ্ঠানিক তালাকের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটে, যেখানে নারীরা যথাযথ আর্থিক নিষ্পত্তি পান না।
গর্ভবতী কিংবা নবজাতকের যত্নে নিয়োজিত কোনো গ্রামীণ নারী বিবাহবিচ্ছেদের পর প্রায়ই স্বামীর আয় এবং স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত আর্থিক সহায়তা হারান, ঠিক সেই সময় যখন তার প্রসবপূর্ব সেবা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসবপরবর্তী পরিচর্যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে সবচেয়ে নিম্ন আয়ের শ্রেণির মাত্র ৭ শতাংশ নারী মানসম্মত প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা পান। বিবাহবিচ্ছেদ এই নারীদের আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে মাতৃমৃত্যুর হার সর্বোচ্চ।
গ্রামের অনেক নারী ইউনিয়ন পরিষদ বা বেসরকারি সংস্থার আইনগত সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চিকিৎসা সেবার কোনো সমন্বয় থাকে না। ফলে যে ব্যবস্থা তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে মুক্তি দেয়, সেই ব্যবস্থাই জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যগত সময়ে তাদের কার্যত একা ফেলে রাখে।
মায়েদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সংস্কার
সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈবাহিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা এবং যেখানে বিবাহবিচ্ছেদ অনিবার্য, সেখানে মাতৃস্বাস্থ্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করা।
প্রথমত, কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক বিবাহপূর্ব পরামর্শসেবা চালু করা প্রয়োজন। সেখানে প্রজনন স্বাস্থ্য পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, যাতে দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের আগেই দম্পতিরা মাতৃস্বাস্থ্য অধিকার এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে অবগত হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, নথিভুক্ত পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার আগে ৩০ থেকে ৬০ দিনের বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা সময়সীমা রাখা যেতে পারে। এই সময়ের মধ্যে গর্ভবতী নারী ও নতুন মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রসবপূর্ব বা প্রসবপরবর্তী চিকিৎসা সেবার সঙ্গে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, মুসলিম বিবাহে মোহরানার পরিমাণ বাস্তবসম্মত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নযোগ্য পর্যায়ে নির্ধারণে নীতিগত নির্দেশনা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের পর নারীরা নিরাপদ প্রসব এবং জরুরি প্রসূতি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা পেতে পারেন। চতুর্থত, গ্রামীণ নারীদের জন্য আইনগত সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং তা মাতৃস্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে সমন্বিত করা জরুরি। যাতে কোনো নারী গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মদানের পরবর্তী সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলেও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
পঞ্চমত, মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থায় বৈবাহিক অবস্থা এবং সাম্প্রতিক বিবাহবিচ্ছেদকে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঝুঁকিতে থাকা মায়েদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের সামনে অতিরিক্ত বিবাহবিচ্ছেদের কোনো সংকট নেই। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, যখন একটি বৈবাহিক সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে, তখন যেন তার মূল্য কোনো মাকে নিজের জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে না হয়। সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই নিশ্চিত করতে পারে যে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নারীর স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
