ড. আমিনুল মোমেন
ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া
বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং পঞ্চগড়জুড়ে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার একর এলাকায় বিস্তৃত ১৬৮টি চা বাগান রয়েছে। এই শিল্প বছরে ১০ কোটি কিলোগ্রামের বেশি চা উৎপাদন করে, সরাসরি প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিককে কর্মসংস্থান দেয় এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় জিডিপিতে চা শিল্পের অবদান ১ শতাংশ এবং প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে। তবে পরিবেশগত অবক্ষয়, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের স্থায়িত্ব এখন হুমকির মুখে, যা জরুরি মনোযোগ দাবি করে।
পরিবেশগত স্থায়িত্বের ওপর হুমকি
বাংলাদেশের চা উৎপাদন কুয়াশাচ্ছন্ন, মাঝারি তাপমাত্রার জলবায়ু এবং নির্ভরযোগ্য বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুতগতিতে এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে সিলেটে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে বৃষ্টিপাত ছিল ৪৬ মিলিমিটার। একই সময়ে মার্চ মাসে তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মাসিক গড় উৎপাদনের তুলনায় চা উৎপাদন ৫৭ শতাংশ কমে যায়। সিলেটের একটি বাগানে দৈনিক চা সংগ্রহ ৪ হাজার ৫০০ কিলোগ্রাম থেকে নেমে ২ হাজার ৫০০ কিলোগ্রামে দাঁড়ায়, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খরার সরাসরি প্রভাবে ৪৫ শতাংশ হ্রাস।
বর্ধিত তাপমাত্রা লাল মাকড়, ব্লাইট এবং ছত্রাকজনিত রোগের প্রকোপও বাড়িয়ে দেয়, যা উৎপাদন আরও কমিয়ে দেয়। বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রধান চা উৎপাদনকারী অঞ্চলে উৎপাদন ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
উৎপাদনের পরিবেশগত চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বাগান সম্প্রসারণের জন্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল পরিবর্তনের ফলে জীববৈচিত্র্য কমছে, রাসায়নিক সার থেকে সৃষ্ট দূষণ পানির উৎসে ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রচলিত প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন মাত্র ১ হাজার ২৪৫ কিলোগ্রাম, যেখানে কেনিয়ায় ২ হাজার ৩২১ কিলোগ্রাম এবং শ্রীলঙ্কায় ১ হাজার ৭৬৩ কিলোগ্রাম। এই পার্থক্য পুরোনো চা গাছের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস এবং ঔপনিবেশিক সময় থেকে প্রায় অপরিবর্তিত সেচ ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে।
সামাজিক স্থায়িত্বের সংকট
বাংলাদেশি চায়ের প্রতিটি কাপের পেছনে থাকা মানুষের গল্প এই শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থায়িত্ব সংকট। চা বাগানের শ্রমিকদের অধিকাংশই প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীর নারী, যারা ১৭০ বছর ধরে পাঁচ প্রজন্ম ধরে এমন পরিস্থিতিতে কাজ করে আসছেন, যাকে আধুনিক দাসত্বের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি আগে ছিল ১২০ টাকা। ব্যাপক আন্দোলনের পর তা বেড়ে ১৭০ টাকা হয়েছে, যদিও তাদের দাবি ছিল ৩০০ টাকা। বর্তমান বিনিময় হারেও এই মজুরি জীবনযাপনের উপযোগী ন্যায্য আয়ের তুলনায় অনেক কম।
শ্রমিকরা প্রতি সপ্তাহে রেশন হিসেবে মাত্র প্রায় ৩ কিলোগ্রাম আটা। চা বাগান এলাকায় বসবাসকারী কিশোরীদের ৪৬ শতাংশ শিশু বিবাহের শিকার এবং ১৫ শতাংশ নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত, অথচ চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। এই সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ব্যাপক মদ্যপান, ঋণগ্রস্ততা এবং অশিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্য নয়, বরং এমন একটি মজুরি কাঠামোর ফল, যা একটি নির্ভরশীল শ্রমশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তৈরি হয়েছে।
দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকায় বৃদ্ধি পাওয়া অগ্রগতির একটি ধাপ হলেও বেঁচে থাকার জন্য তা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। শিল্পের সামাজিক ভিত্তির সমাধান না করে কোনো পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারবে না।
অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের সংকট
এক সময় বাংলাদেশ বছরে ২৬ হাজার ৯৭০ টন চা রপ্তানি করত। কিন্তু ২০১৬ সালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদা উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় রপ্তানি মাত্র ৭৭ টনে নেমে আসে। যদিও ২০২৪ সালে রপ্তানি আবার বেড়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার কিলোগ্রামে পৌঁছেছে, তবুও মূল অর্থনৈতিক কাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।
দেশীয় নিলাম মূল্য প্রতি কিলোগ্রাম ১৭০ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে থাকলেও মূল্যস্ফীতি, সারের মূল্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যয় উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধানের কারণে রপ্তানির জন্য খুব সামান্য উদ্বৃত্ত থাকে। পাশাপাশি কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের মতো দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা মূল্য কমিয়ে রাখছে।
পুরোনো চা গাছ, প্রাচীন সেচ ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাব উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে শিল্পের প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামো মূল্য সংযোজনের পরিবর্তে পরিমাণ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়, ফলে বাংলাদেশ কম দামের পণ্যের চক্র থেকে বের হতে পারছে না।
বাংলাদেশের চা শিল্পের টেকসই রূপান্তরের পথ
জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এর জন্য দ্রুত ড্রিপ সেচ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ছায়াদানকারী গাছ লাগানো এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত খরা সহনশীল চা জাতের ওপর বিনিয়োগ প্রয়োজন।
পাশাপাশি পরিবেশগত চাপ কমাতে জৈব চাষ পদ্ধতিতে বাধ্যতামূলক রূপান্তর, রাসায়নিক সারের পরিবর্তে কম্পোস্ট ব্যবহার এবং মাটির স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে ডালজাতীয় ফসলের সঙ্গে মিশ্র চাষ চালু করতে হবে। প্রণোদনা কাঠামোরও পরিবর্তন প্রয়োজন। চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি কমপক্ষে ৩০০ টাকা করতে হবে এবং শিল্পের লাইসেন্সের শর্ত হিসেবে পূর্ণ স্বাস্থ্য বীমা, শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি এবং আবাসন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
যেসব পুরোনো চা গাছ উৎপাদনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা হারিয়েছে, সেগুলোকে জাতীয় অর্থায়নে পরিকল্পিতভাবে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এর পাশাপাশি জৈব সনদ, বিশেষায়িত ব্র্যান্ডিং, সিলেটে চা পর্যটন এবং চা নির্যাসভিত্তিক ত্বকের যত্নের পণ্যের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন করতে হবে। কাঁচা পণ্য রপ্তানির সেই পুরোনো মডেল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যে মডেল বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খলের নিচের দিকে আটকে রেখেছে। পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের সমতল ভূমির চা চাষ, যা ইতোমধ্যে জাতীয় উৎপাদনের ১২ শতাংশে অবদান রাখছে, আধুনিক সেচ সুবিধার মাধ্যমে আরও সম্প্রসারণ ও সহায়তা পাওয়া উচিত।
বাংলাদেশের চা বাগান প্রায় ২০০ বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ধরে রেখেছে। আগামী ২০০ বছরও লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে শিল্পটি শোষণের পরিবর্তে সংস্কারের পথ বেছে নেয় কি না তার ওপর।
