তানজীনা ফেরদৌস
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
২০২৪ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলন কোনো নীরবতা থেকে জন্ম নেয়নি। বরং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জমে থাকা সেই হতাশার বিস্ফোরণ ছিল এই আন্দোলন, যেখানে এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যে ব্যবস্থায় দেশের সবচেয়ে বড় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সরকারি চাকরির অর্ধেকেরও বেশি পদ নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত ছিল এবং মেধা পরিণত হয়েছিল গৌণ বিষয়ে।
২০২৪ সালের জুনে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আগস্টে একটি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। সাম্প্রতিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এত দ্রুত এত দূরত্ব অতিক্রম করা আর কোনো গণআন্দোলন দেখা যায়নি।
কোটা ব্যবস্থার উৎপত্তি
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কোটা ব্যবস্থা চালু করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত নারী এবং পিছিয়ে থাকা জেলার মানুষের জন্য সরকারি চাকরির ৮০ শতাংশ সংরক্ষণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর সেই নীতির পেছনে একটি নৈতিক ভিত্তি ছিল: যারা দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সুযোগের ক্ষেত্রে তারাই প্রথম অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।
পরবর্তী কয়েক দশকে মেধাভিত্তিক অংশ ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। প্রথম দিকের ২০ শতাংশ থেকে ১৯৭৬ সালে তা ৪০ শতাংশে এবং ১৯৯৬ সালে ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। ২০১৮ সালের মধ্যে ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি নাতনিদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, পিছিয়ে থাকা জেলার প্রার্থীদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের জন্য ১ শতাংশ সংরক্ষণ রাখা হয়।
সব মিলিয়ে সরকারি চাকরির ৫৬ শতাংশ পদ সংরক্ষিত ছিল। উন্মুক্ত মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার জন্য বাকি ছিল মাত্র ৪৪ শতাংশ। মুক্তিযোদ্ধা কোটা, যা মূলত ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা মানুষদের জন্য নির্ধারিত ছিল, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিস্তৃত হয়ে নাতি নাতনিদের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাদের অনেকেরই যুদ্ধের ব্যক্তিগত স্মৃতি ছিল না।
শিক্ষার্থীরা ক্রমবর্ধমানভাবে দাবি করতে থাকে যে, কোটা ব্যবস্থা আর পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে না, বরং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্যের বিনিময়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
জুন ২০২৪: পরিবর্তনের মোড়
২০২৪ সালের ৫ জুন সংকট নতুন করে শুরু হয়, যখন হাইকোর্ট সরকারের ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক, অবৈধ এবং অকার্যকর ঘোষণা করে। এই রায়ের মাধ্যমে পুনরায় পূর্ণ ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং বৃহত্তর সংরক্ষণ ব্যবস্থা ফিরে আসে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের এই সিদ্ধান্ত আসে এবং অনেকের কাছে তা ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিকভাবে সাজানো বলে মনে হয়।
শিক্ষার্থীরা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায়। জুলাইয়ের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ এবং শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ। সরকারের প্রতিক্রিয়া আন্দোলনের চরিত্র বদলে দেয়। ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের “রাজাকার” বলে অভিহিত করেন। ১৯৭১ সালের গণহত্যার সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাপক শিক্ষিত বেকারত্বের চাপে থাকা একটি প্রজন্মের মধ্যে এই মন্তব্য বিস্ফোরণ ঘটায়। শিক্ষার্থীরা অপমানজনক শব্দটিকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। ৭ জুলাই আন্দোলনকারীরা “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি শুরু করে, যার ফলে সারা দেশে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।
একই সময়ে প্রকাশ পায় যে, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত ফাঁস হয়ে আসছিল। এই তথ্য জনরোষ আরও বাড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্র কঠোরভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ গুলি চালায়। কারফিউ ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ দিয়ে মোতায়েন করা হয়।
সারা দেশে ১০ দিনের জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ প্রায় ২০০ মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়। ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ করে বরাদ্দ রাখে। ফলে ৯৩ শতাংশ চাকরি মেধাভিত্তিক হয়ে যায়। দুই দিনের মধ্যে সরকার এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।
কিন্তু ততদিনে শিক্ষার্থীদের দাবি কোটা সংস্কারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাদের নয় দফা দাবির মধ্যে ছিল হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য ক্ষমা, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের পদত্যাগ, প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের তদন্ত, নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আটক সব আন্দোলনকারীর মুক্তি। আগস্টের শুরুতে নয় দফা দাবি এক দাবিতে পরিণত হয়: শেখ হাসিনার পদত্যাগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান।
অর্জন ও অসমাপ্ত সংস্কারের পথ
আন্দোলনের বাস্তব অর্জন উল্লেখযোগ্য। যে কোটা ব্যবস্থা সরকারি চাকরির ৫৬ শতাংশ পদ সংরক্ষিত করেছিল, এখন সেখানে মাত্র ৭ শতাংশ সংরক্ষিত এবং ৯৩ শতাংশ পদ মেধার জন্য উন্মুক্ত। যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোটা ব্যবস্থাকে পৃষ্ঠপোষকতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তারা ক্ষমতা থেকে সরে গেছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জোরপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং “আয়নাঘর” নামে পরিচিত গোপন আটককেন্দ্রে বন্দি ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া শুরু করেছে। এসব শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ নয়। নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের একটি মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।
কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তে যে মেধাভিত্তিক নিয়োগ কাঠামো এসেছে, তা নির্বাহী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না রেখে আইনের মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দিতে হবে। কারণ একই ধরনের নির্বাহী সিদ্ধান্তই ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের উদ্যোগকে বাতিল করে দিয়েছিল। জুনের হাইকোর্টের রায়ে যে বিচারিক স্বাধীনতার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা রাজনৈতিক চাপ থেকে রক্ষা করতে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের নিরাপত্তার মাধ্যমে কাঠামোগত সুরক্ষা দিতে হবে।
বাংলাদেশকে জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ২১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত সরকারি সেবায় সমান সুযোগের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেধাভিত্তিক নিয়োগের আইন প্রণয়ন করতে হবে। ২০১৮ সালের “রাতের ভোট” হিসেবে পরিচিত ব্যালট কারচুপি এবং বিরোধী প্রার্থী না থাকায় ১৫৪ জন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কারণে যে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তার ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
যাতে কোনো নাগরিক ভোট দেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে সহিংসতা, আটক বা মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়। যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়েছিল, যেখানে ছিল কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি, সস্তা শ্রমের ওপর তৈরি পোশাক খাতের নির্ভরতা এবং প্রবাসী আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সেই অর্থনীতির বৈচিত্র্য আনা এবং শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি।
জোরপূর্বক গুমের কাঠামোকে শুধু বর্তমান বন্দিদের মুক্তি দিয়ে নয়, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ভেঙে দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, পুরোনো শাসনব্যবস্থার অধীনে তৈরি সংবিধানকে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যাতে জুলাই ও আগস্টের রাস্তায় আত্মত্যাগের মাধ্যমে জনগণ যে রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্পর্ক নতুনভাবে নির্মাণ করেছে, তার প্রতিফলন ঘটে।
কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ন্যায্য চাকরির দাবিতে এবং শেষ হয়েছিল একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের মাধ্যমে। সেই স্বৈরাচার রেখে যাওয়া রাষ্ট্রকে সংস্কার করাই এখন কঠিন কাজ, আর সেই কাজ কেবল শুরু হয়েছে।
