উমাইমা ইমরান
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
১৯৭১ সালের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জটিল সম্পর্কের অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ক্ষোভ, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে বহু সময় প্রভাবিত করেছে। তবে অতীতের দিকেই প্রায় একচেটিয়াভাবে মনোযোগ দিতে গিয়ে দুই দেশ হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উপেক্ষা করছে: তারা কি এমন একটি অর্থনৈতিক সুযোগ হারাচ্ছে, যা শুধু নিজেদের নয়, পুরো অঞ্চলকেও উপকৃত করতে পারে?
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই দেশ বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভিসা প্রক্রিয়ার সহজীকরণ এবং নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ বেড়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৮৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। দুই দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় এই পরিমাণ এখনো সীমিত হলেও, এসব পরিবর্তন দেখাচ্ছে যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আবারও নীতিনির্ধারণের আলোচনায় ফিরে আসছে।
যখন প্রতিযোগিতা গল্পের রূপ নির্ধারণ করে
এই সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝার জন্য সময়ের সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা দেখা প্রয়োজন।
পাকিস্তান একসময় এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ ছিল। প্রচুর তুলা উৎপাদন এবং সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পভিত্তির কারণে দেশটি এই অবস্থান অর্জন করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, যেখানে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির চার-পঞ্চমাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা পশ্চিমা বাজারে দেশটির শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
অনেক দিক থেকে যে রপ্তানি বাজারগুলো একসময় পাকিস্তানের তুলনামূলক সুবিধার প্রতীক ছিল, সেগুলোই ক্রমে বাংলাদেশের সাফল্যের গল্পে পরিণত হয়েছে। তবে কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক দূরত্ব ব্যাখ্যা করা সরলীকরণ হবে। রাজনীতি ও অর্থনীতি খুব কম ক্ষেত্রেই একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকে। তুলনামূলক সুবিধার পরিবর্তন অনেক সময় প্রণোদনার কাঠামো বদলে দেয়, অভ্যন্তরীণ স্বার্থগোষ্ঠীগুলোকে প্রভাবিত করে এবং জনমত গঠনের ধারাকে পরিবর্তন করে।
পাকিস্তান যখন রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই বাংলাদেশ একটি উৎপাদন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। অমীমাংসিত ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারণা দুই দেশের গভীরতর সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করেছে। তবে সম্পর্ককে শুধু প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখলে পাশাপাশি থাকা সম্ভাবনাগুলো আড়ালে থেকে যায়।
যৌথ স্বার্থ থেকে যৌথ সমৃদ্ধির পথে
বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো ইঙ্গিত দেয় যে দুই দেশের অর্থনীতি প্রচলিত ধারণার তুলনায় একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির বড় অংশ এখনো তুলা, বস্ত্র সুতা এবং কাপড়কেন্দ্রিক, যা বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পোশাক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। অন্যদিকে বাংলাদেশ এসব উপকরণকে উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করার দক্ষতা অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যে একই অবস্থানে থাকার পরিবর্তে দুই দেশ ক্রমশ একটি বৃহত্তর উৎপাদন ব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন অংশ হিসেবে কাজ করছে। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতা পরস্পরের বিপরীত নয়।
বিশ্বের সফল অঞ্চলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিযোগিতাও বিদ্যমান থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য পুরো অঞ্চলের মোট বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ, যেখানে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ। এই তুলনা দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়া এখনো তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশ ব্যবহার করতে পারছে না। তাই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতা শুধু দ্বিপাক্ষিক সমৃদ্ধিই নয়, আরও সমন্বিত ও শক্তিশালী আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে।
আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক কেবল বাণিজ্য বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর বাইরেও নানা সুবিধা তৈরি করতে পারে। উন্নত লজিস্টিক ব্যবস্থা, আরও কার্যকর শুল্ক প্রক্রিয়া এবং শক্তিশালী বাণিজ্যিক সংযোগ ব্যবসায়িক ব্যয় কমাতে, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়াতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করতে পারে। বৈশ্বিক বাজার যখন ক্রমেই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব একটি অতিরিক্ত স্থিতিশীলতার উৎস হতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে ইতিহাস ভুলে যেতে হবে। ১৯৭১ সালের ঘটনা এখনো গভীর তাৎপর্য বহন করে, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য। তাই সম্পর্ক উন্নয়নের যেকোনো প্রচেষ্টায় সেই সময়ের সঙ্গে জড়িত আবেগ ও সংবেদনশীলতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা অতীতকে মুছে ফেলতে পারে না, তবে অতীত যেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে চিরদিন সীমাবদ্ধ করে না রাখে।
সামনের পথ বেছে নেওয়া
ধীরে এবং সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত একটি উদ্যোগ সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মতো রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ধারণা পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে দুই সরকার এমন একটি সীমিত পরিসরের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি দিয়ে শুরু করতে পারে, যেখানে পারস্পরিক লাভের সুযোগ সবচেয়ে স্পষ্ট।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং নির্বাচিত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের জন্য আরও উন্নত বাজার সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের জন্য তুলা, বস্ত্র সুতা এবং কাপড় সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে সরাসরি নৌ যোগাযোগ বৃদ্ধি, শুল্ক প্রক্রিয়ার বিলম্ব কমানো এবং অশুল্ক বাধা দূর করার মাধ্যমে বাণিজ্যিক বিনিময়ের খরচ কমানো সম্ভব।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশের নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং পাকিস্তানের রপ্তানি সক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত ও রপ্তানি ভিত্তি বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টা এমন একটি সুযোগ তৈরি করেছে, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একটি পথ অতীতের কারণে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সীমিত রাখার পথ। অন্য পথ স্বীকার করে যে ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের বাস্তবতায় যৌথ সমৃদ্ধি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী নয়।
পুরোনো ক্ষতকে নতুন সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে প্রয়োজন বাস্তববাদ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিভাজনের বাইরে তাকানোর মানসিকতা। এই উদ্যোগ দুই দেশের সব পার্থক্য দূর করতে না পারলেও পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য আরও সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তথ্য
- The Political Economy of Pakistan–Bangladesh Bilateral Ties (Desk Report).
- World Bank, South Asia Regional Integration: Trade.
- World Trade Organization (WTO) Trade Profiles.
- World Integrated Trade Solution (WITS).
- UN Comtrade Database.
