মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম
ভাইস প্রেসিডেন্ট (বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক)
২৮৫+
২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক
৩৪
২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা, যার মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনে নিহত
২,৪৭৯
২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো মানুষ
২০২৬ সালের ১৪ মে, লালমনিরহাটের অমজোল সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর গুলিতে নিহত হন ২৫ বছর বয়সী খায়েমুল হক। এর কয়েক দিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাঠারিয়াদোয়ার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আরও দুই বাংলাদেশি নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে গুলির শব্দ যেন এক ভয়াবহ ও পুনরাবৃত্ত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়। গত দুই দশক ধরে চলমান এক দীর্ঘ সংকটের ধারাবাহিক অধ্যায়, যেখানে শত শত মানুষের প্রাণ গেছে এবং যার সমাধান এখনও অধরা। অধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন, যার মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মারা যান। বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে একই ধারায় রয়েছে। ২০২৪ সালে ৩০ জন, ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২১ সালে ১৮ জন নিহত হন।
২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত অন্তত ২৮৫ জন বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন, যা বছরে গড়ে প্রায় ২৪ জন মৃত্যুর সমান। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ২৭ জন বাংলাদেশি শিশু ও কিশোর নিহত হয়েছে, যার মধ্যে শুধু ২০২৪ সালেই ছয়জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
এই সংকট শুধু হত্যাকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ঘটনাও একটি পৃথক মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে ২,৪৭৯ জন মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১২০ জনকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, এই সীমান্তে কোনো বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো বিএসএফ সদস্যের বিরুদ্ধে বিচারিক শাস্তির নজির নেই।
বিজিবির প্রতিক্রিয়া
সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ তাদের কার্যক্রম ও প্রস্তুতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পুরো সীমান্তজুড়ে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
বেনাপোল অঞ্চলে যশোর ৪৯ বিজিবি ও খুলনা ২১ বিজিবির আওতাধীন প্রায় ১০২ কিলোমিটার সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রঘুনাথপুর, শিকারপুর, পুটখালী এবং দৌলতপুর এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জেও একই ধরনের সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে, যেখানে অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর ঘটনা ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি চলছে।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামজুড়ে প্রায় ৫৫৮ কিলোমিটার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এসব অঞ্চল হত্যাকাণ্ড ও পুশ ইন ঘটনার তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। দুর্গম নদী অঞ্চল, বনাঞ্চল এবং সুন্দরবনের মতো এলাকায় নজরদারি বাড়াতে রাডার ব্যবস্থা, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, দ্রুতগতির নৌযান এবং ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাতের সময় সীমান্ত এলাকায় অপ্রয়োজনীয় চলাচল থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত থাকার সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলো প্রয়োজনীয়। তবে এসব ব্যবস্থা মূলত সংকটের দৃশ্যমান অংশ, বিশেষ করে অবৈধ সীমান্ত পারাপার মোকাবিলায় মনোযোগ দেয়। মূল সমস্যা, সীমান্ত অতিক্রমকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা, এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
জবাবদিহির সংকট
এই হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকার সবচেয়ে বড় কারণ হলো জবাবদিহির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। বাংলাদেশি কোনো বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনায় কোনো বিএসএফ সদস্যের বিচার বা শাস্তি হয়নি। একমাত্র আলোচিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাওয়া ঘটনা ছিল ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ড, যেখানে তার মরদেহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে ছিল। সেই মামলাতেও অভিযুক্ত খালাস পেয়েছে। জবাবদিহি না থাকলে কূটনৈতিক প্রতিবাদ, পতাকা বৈঠক কিংবা মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারে না।
ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিএসএফের আচরণে পরিবর্তন আসে না। তাদের আচরণ নির্ধারিত হয় জবাবদিহি বা পরিণতির উপস্থিতির মাধ্যমে, আর এখন পর্যন্ত সেই পরিণতির ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। ২০২৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে “সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা” এবং “যৌথ টহল বৃদ্ধি” করার মতো প্রচলিত বক্তব্য এসেছে। তবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা বা শক্তি ব্যবহারের স্পষ্ট নীতিমালা নিয়ে কোনো বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত আসেনি। সরকারি পর্যায়ে নথিভুক্ত ভারতের অনীহাই এক পর্যায়ে কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এখন বাংলাদেশের করণীয়
সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে তুলে ধরা
ভারতীয় হাইকমিশনে নিয়মিত প্রতিবাদপত্র পাঠানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকর ফলাফল ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে যায়। বাংলাদেশকে সীমান্ত হত্যার বিস্তারিত নথি জাতিসংঘের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের কাছে উপস্থাপন করতে হবে, মানবাধিকার কাউন্সিলের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিষয়টি উত্থাপনের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে।
এসব উদ্যোগ তাৎক্ষণিক আইনি ফল না দিলেও নীরব থাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা দ্বিপাক্ষিক প্রতিবাদের মাধ্যমে সম্ভব হয়নি।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা
বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে প্রতিটি প্রাণঘাতী গুলির ঘটনা তদন্তে একটি যৌথ স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা। কমিশনের নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রকাশ্য প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষমতা থাকা জরুরি। প্রতিটি মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে এই প্রস্তাব উত্থাপন এবং সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে সাংস্কৃতিক সংযোগ বৃদ্ধি
বাংলাদেশ সীমান্তে মোতায়েন বিএসএফ সদস্যদের বড় অংশ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানের মতো অঞ্চল থেকে আসে। ফলে অনেক সদস্য সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত নন।
এই দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রে এমন এক মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে, যা অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানাতে হবে যে সীমান্ত ইউনিটগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাংলা ভাষাভাষী সদস্যদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।
বৈধ সীমান্ত বাণিজ্যকে নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে গ্রহণ
সীমান্ত হাট এবং নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ব্যবস্থা অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমিয়ে সাধারণ মানুষকে ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে পারে। ভারতের গবাদিপশু রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বিএসএফের প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অন্যতম প্রধান অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই বাণিজ্যকে বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনলে সীমান্ত হত্যার অন্যতম সাধারণ কারণ দূর করা সম্ভব হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ মোকাবিলা
চোরাচালান চক্র সীমান্তের উভয় পাশে সক্রিয়, যেখানে অনেক সময় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ফলে প্রায়ই নিম্নস্তরের মানুষ সহিংসতার শিকার হয়, কিন্তু মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকে।
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো সীমান্তবর্তী জেলার অর্থনৈতিক প্রান্তিকতাকে একটি কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা মানুষকে সীমান্তের শূন্যরেখার দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অপেক্ষা করে থাকে গুলি।
জরুরি বাস্তবতা
বিজিবির বাড়তি প্রস্তুতি একটি প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক, আইনগত ও কৌশলগত সংস্কারের বিকল্প নয়। যতদিন সীমান্ত নীরবতার পরিবর্তে জবাবদিহির মাধ্যমে পরিচালিত না হবে, যতদিন দায়মুক্তির পরিবর্তে বিচার প্রতিষ্ঠিত না হবে এবং যতদিন মানুষকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত না হবে, ততদিন মৃত্যুর খবরগুলো নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হতে থাকবে।
সীমান্তে কঠোর অবকাঠামো এবং কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হওয়ার আগে সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। পছন্দটি নিষ্ক্রিয়তা ও কার্যক্রমের মধ্যে নয়। পছন্দটি হলো সীমান্তের ভবিষ্যৎ এখনই গড়ে তোলা, অথবা এমন এক বাস্তবতা মেনে নেওয়া যেখানে সীমান্ত নিয়মিত প্রাণ নেবে, কিন্তু জবাবদিহি থাকবে না।
