নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে সরকারি চিকিৎসকদের দক্ষতা, প্রাপ্যতা এবং কর্মপরিবেশের ওপর। দেশের অধিকাংশ জনগণ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ, তাদের চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারি চিকিৎসকদের বর্তমান কর্মভার (Workload) এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ব্যক্তিগত দক্ষতা বা আন্তরিকতা দিয়ে সব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব নয়। ফলে এটি কেবল একজন চিকিৎসকের কর্মদক্ষতার সংকট নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রশাসনিক, মানবসম্পদ ও সেবা ব্যবস্থাপনার একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।
স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসকদের কাজের পরিমাণ, দায়িত্বের ধরন এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকদের কর্মদায়িত্ব নির্ধারণে উন্নত বৈজ্ঞানিক কর্মপরিকল্পনার পরিবর্তে প্রশাসনিক রুটিন, জনবল সংকট এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে অনেক সরকারি চিকিৎসক এমন কর্মপরিবেশে দায়িত্ব পালন করছেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপদ ও কার্যকর কর্মপরিবেশের মানদণ্ডের সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আমি পুরো ব্যবস্থাপনার একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা রাখছি।
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সংকট এবং বিশৃঙ্খলা
সরকারি স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসকের সংখ্যা অপর্যাপ্ত, এটি বহুদিনের বাস্তবতা। তবে সমস্যাটি কেবল সংখ্যাগত নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনবল বণ্টনের অসামঞ্জস্যতা, দীর্ঘদিন শূন্য পদ পূরণ না হওয়া, বদলি ও পদায়নে পরিকল্পনার অভাব এবং দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
গ্রামীণ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহু চিকিৎসক পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকে, অন্যদিকে শহরের বড় হাসপাতালগুলো রোগীর অতিরিক্ত চাপে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। এই বৈষম্য স্বাস্থ্যসেবার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে এবং চিকিৎসকদের ওপর অস্বাভাবিক কর্মচাপ সৃষ্টি করে। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়।
চিকিৎসক যখন প্রশাসনিক কর্মকর্তা
বাংলাদেশের সরকারি চিকিৎসকদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বিপুল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা। রোগীর নথিপত্র সংরক্ষণ, সরকারি প্রতিবেদন প্রস্তুত, বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ, সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক নির্দেশনা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে হয়।
প্রশ্ন হলো, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কি তাঁর চিকিৎসা-জ্ঞান, নাকি কাগজপত্র পূরণের দক্ষতা?
যেখানে উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের জন্য পৃথক জনবল থাকে, সেখানে বাংলাদেশে একই ব্যক্তি চিকিৎসা, প্রশাসন এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করছেন। এর ফলে রোগীর জন্য নির্ধারিত সময় কমে যাচ্ছে এবং চিকিৎসাসেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি মৌলিক দুর্বলতা হলো কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার অভাব। অনেক রোগী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা না নিয়ে সরাসরি জেলা হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যান।
ফলে তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলো এমন রোগীর চাপ বহন করে, যাদের বড় একটি অংশের চিকিৎসা স্থানীয় পর্যায়েই সম্ভব ছিল। এই অস্বাভাবিক রোগী প্রবাহ শুধু চিকিৎসকদের ওপর চাপ বাড়ায় না; বরং সীমিত সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারও নিশ্চিত করে। একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সরকারি হাসপাতালের কর্মভার কখনোই ভারসাম্যপূর্ণ হবে না।
কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা চিকিৎসার মান কমিয়ে দিচ্ছে
কর্মদক্ষতা কেবল ব্যক্তিগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি অনুকূল কর্মপরিবেশেরও ফল। কিন্তু দেশের বহু সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, আধুনিক পরীক্ষাগার, ওষুধ, দক্ষ নার্সিং সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।
ফলে চিকিৎসকদের মূল্যবান সময় চিকিৎসা সিদ্ধান্তের পরিবর্তে প্রশাসনিক সমন্বয়, রোগ নির্ণয়ের বিকল্প ব্যবস্থা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। এতে রোগীসেবা বিলম্বিত হয় এবং চিকিৎসকদের পেশাগত হতাশা বাড়ে।ফলশ্রুতিতে চিকিৎসার মান দারুণভাবে ব্যহত হয়।
অতিরিক্ত কাজের চাপে চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট
সরকারি চিকিৎসকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, রাতদিন দায়িত্ব পালন, জরুরি সেবা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব ধীরে ধীরে পেশাগত অবসাদ (Burnout) সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী বার্নআউট চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ, সহমর্মিতা এবং চিকিৎসার গুণগত মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশে চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত সন্তুষ্টি নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত নীতিগত আলোচনা বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ চিকিৎসকদের সুস্থতা নিশ্চিত না করে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন বাস্তবসম্মত নয়।
কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
বর্তমানে সরকারি চিকিৎসকদের কর্মমূল্যায়নে উপস্থিতি, প্রশাসনিক আনুগত্য কিংবা দাপ্তরিক সূচকের গুরুত্ব তুলনামূলক বেশি। অথচ একজন চিকিৎসকের প্রকৃত কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চিকিৎসার গুণগত মান, রোগীর সন্তুষ্টি, ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্তের মান, পেশাগত নৈতিকতা, দলগত নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়নকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ফলাফলভিত্তিক (Outcome-based) কর্মমূল্যায়নই সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে সেই সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।
নীতিগত সংস্কারে পাঁচটি পদক্ষেপের অগ্রাধিকার
সরকারি চিকিৎসকদের কর্মভার যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে এবং কর্মদক্ষতা বাড়াতে কয়েকটি নীতিগত সংস্কার জরুরি।
প্রথমত, দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, জনসংখ্যা ও রোগের প্রকৃতির ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক মানবসম্পদ পরিকল্পনা এবং গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসক ধরে রাখার জন্য কার্যকর প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলে ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, অনলাইন রিপোর্টিং, ই-প্রেসক্রিপশন এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার চালু করতে হবে, যাতে চিকিৎসকদের প্রশাসনিক সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
তৃতীয়ত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করে একটি বাধ্যতামূলক ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে তৃতীয় স্তরের হাসপাতালের অযৌক্তিক রোগীর চাপ কমানো যায়। চতুর্থত, চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, যৌক্তিক কর্মঘণ্টা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, চিকিৎসককেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে নার্স, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এবং হাসপাতাল প্রশাসকদের সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক (Multidisciplinary) স্বাস্থ্যসেবা মডেল গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের সরকারি চিকিৎসকদের কর্মভার সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। চিকিৎসকদের ওপর অযৌক্তিক কর্মচাপ কমানো কেবল তাদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়; এটি রোগীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবার মান, সরকারি হাসপাতালের প্রতি জন আস্থা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage) অর্জনের পূর্বশর্ত।
স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে চিকিৎসকদের আরও বেশি পরিশ্রম করানোর ওপর নয়; বরং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর, যেখানে একজন চিকিৎসক তাঁর সময়ের অধিকাংশ ব্যয় করবেন রোগীর চিকিৎসায়, প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলায় নয়। কর্মভার ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক সংস্কার, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সরকারি চিকিৎসকদের কর্মদক্ষতা যেমন বাড়বে, তেমনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
