নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের এই মহানগর একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত আবাসন, ভয়াবহ যানজট, পরিবেশ দূষণ এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এটি ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম বসবাস-অযোগ্য নগরীতে পরিণত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি আজ শহরের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী, যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নয়, আবার উচ্চবিত্তের মতো ব্যয়বহুল নগরজীবনের চাপ সামাল দেওয়ারও সামর্থ্য রাখে না।
একসময় উন্নত জীবনের আশায় রাজধানীমুখী হওয়া অসংখ্য পরিবার আজ প্রতিনিয়ত ব্যয়, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেলেও জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে মধ্যবিত্তের আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই সার্বিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ এবং চলমান এই সংকট নিরসনের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আমার আজকের আলোচনা।
আবাসন ব্যয়ের অসহনীয় চাপ
ঢাকার মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সংকট আবাসন। নগরবাসীর প্রায় ৬৮ শতাংশই ভাড়াবাসায় বসবাস করে। বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষ করে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD)-এর জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীতে অনেক পরিবারের মাসিক আয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়ায় ব্যয় হয়, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সীমা প্রায় ৩০ শতাংশ।
গত কয়েক দশকে রাজধানীতে বাড়িভাড়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। বহু পরিবারকে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার জন্য খাদ্য, সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সঞ্চয়ের মতো মৌলিক খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে নিজস্ব ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক হওয়ার স্বপ্নও অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে ঢাকায় একটি সাধারণ ১,২০০ বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা বা তারও বেশি, যা অধিকাংশ চাকরিজীবী পরিবারের সারাজীবনের সঞ্চয়ের সমান।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ভাড়াবাজারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। বিদ্যমান Premises Rent Control Act, 1991 কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় অনেক বাড়িওয়ালা লিখিত চুক্তি বা আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়মিত ভাড়া বৃদ্ধি করেন। ভাড়াটিয়ারা অভিযোগ করতে সাহস পান না, কারণ বিকল্প ভাড়াটিয়ার অভাব নেই।
যানজট: সময় ও উৎপাদনশীলতার প্রধান অন্তরায়
ঢাকার আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলো ভয়াবহ যানজট। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ঢাকার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে নগর পরিবহন ব্যবস্থার অকার্যকারিতাকে চিহ্নিত করেছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর বা উত্তরা থেকে মতিঝিল, কারওয়ান বাজার কিংবা গুলশানে কর্মস্থলে পৌঁছাতে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত সময়ই নষ্ট হয় না; উৎপাদনশীলতা কমে যায়, পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
যদিও মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো অবকাঠামো কিছু নির্দিষ্ট এরিয়াতে স্বস্তি এনেছে, তবে নগরবাসীর বৃহৎ অংশ এখনো নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং সময়নিষ্ঠ গণপরিবহন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে যানজট এখনও নগর অর্থনীতির অন্যতম বড় ব্যয় হিসেবে রয়ে গেছে।
দূষণ ও জনস্বাস্থ্য
ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি হিসেবে প্রায়ই আন্তর্জাতিক সূচকে উঠে আসে। বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়মিতভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই বিশুদ্ধ বায়ু নিশ্চিত করার মতো প্রযুক্তি বা উন্নত আবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলাবদ্ধতা। খোলা জায়গায় আবর্জনা জমে থাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মশাবাহিত রোগের বিস্তার নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ, চোখের সংক্রমণসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যা ক্রমেই সাধারণ বিষয় হয়ে উঠছে। এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শহরতলিমুখী জনস্রোত
আবাসন ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সাভার, কেরানীগঞ্জ, পূর্বাচল, নারায়ণগঞ্জসহ রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাস শুরু করেছে। তুলনামূলক কম মূল্যে বড় বাসস্থান পাওয়া গেলেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ যাতায়াত, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা।
বাস্তবে এসব এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দাকেই প্রতিদিন কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। ফলে আবাসন ব্যয় কিছুটা কমলেও যাতায়াতের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক জীবনমানের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ ছাড়া এসব শহরতলিও ভবিষ্যতে ঢাকার মতো একই সমস্যার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
নীতিগত সংস্কারের সময় এখনই
ঢাকার মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও সেবা খাতের প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ এই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। বিষয়টি কেবল সামাজিক নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি ও নগর পরিচালনার জন্যও একটি গুরুতর ঝুঁকি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, Premises Rent Control Act কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, ডিজিটাল ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকার ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বে মধ্য ও নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন প্রকল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তৃতীয়ত, মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (BRT), আন্তঃনগর গণপরিবহন এবং সমন্বিত ট্রানজিটভিত্তিক নগর পরিকল্পনার সম্প্রসারণ দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। চতুর্থত, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং সবুজ উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধিকে নগর উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
উপসংহার
ঢাকার মধ্যবিত্ত কোনো বিশেষ সুবিধা দাবি করছে না; তারা কেবল এমন একটি নগরজীবন প্রত্যাশা করে যেখানে সম্মানজনকভাবে বসবাস, নিরাপদ পরিবেশে সন্তান লালন-পালন, কর্মস্থলে সময়মতো পৌঁছানো এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করা সম্ভব হবে।
রাজধানীর ভবিষ্যৎ কেবল সুউচ্চ ভবন, ফ্লাইওভার বা বিলাসবহুল আবাসনের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই মানুষগুলোর ওপর, যারা প্রতিদিন এই শহরের অর্থনীতি সচল রাখে। যদি মধ্যবিত্তের জীবন ক্রমাগত ব্যয়, দূষণ, যানজট এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে নিমজ্জিত হতে থাকে, তবে ঢাকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকবে না।
অতএব, পরিকল্পিত নগরায়ণ, কার্যকর সুশাসন এবং মানুষকেন্দ্রিক নগরনীতি গ্রহণই হতে পারে একটি বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই ঢাকার একমাত্র পথ।
