নিশিতা শুক্লা
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জেন এআই অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষাজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মেলানোর মতো প্রস্তুতি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো গড়ে ওঠেনি। মুখস্থনির্ভর প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে তত্ত্বনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, সর্বত্রই প্রযুক্তিগত বাস্তবতা ও পাঠ্যক্রমের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করা প্রথম পদক্ষেপ। আর সেই ব্যবধান দূর করতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত সংস্কার প্রয়োজন।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ
স্কুল পর্যায়েই সমস্যার শুরু। আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রম এখনো মুখস্থবিদ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে শিক্ষার্থীরা লেখালেখিকে চিন্তা, বিশ্লেষণ ও আত্মঅনুসন্ধানের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং জমা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত একটি চূড়ান্ত কাজ হিসেবে দেখতে শেখে। এই প্রবণতা তাদের জেন এআইয়ের অপব্যবহারের দিকে সহজেই ঠেলে দেয়। যখন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কেবল একটি পরিপাটি উত্তর তৈরি করা, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহজ শর্টকাট হিসেবে সামনে আসে।
বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই এবং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার মতো দক্ষতা গড়ে তোলার পরিবর্তে অনেক শিক্ষার্থী পুরো চিন্তাপ্রক্রিয়ার দায়িত্বই অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে শিক্ষকরা এক ধরনের কাঠামোগত সংকটের মধ্যে রয়েছেন। অধিকাংশ শিক্ষক জেন এআইকে কীভাবে পাঠদানে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। একই সঙ্গে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম বেতন তাঁদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের আগ্রহও কমিয়ে দিয়েছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যক্তিগত কোচিং বা টিউশনের ওপর নির্ভরশীল শিক্ষকরা নতুন প্রযুক্তি শেখা কিংবা পাঠদানের পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পান না।
ফলে এমন এক শিক্ষকসমাজ তৈরি হয়েছে, যারা নিজেরাই জেন এআই সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নন। তাই শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল ব্যবহারের পথও দেখাতে পারছেন না।
শুধু জাতীয় শিক্ষাক্রম নয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থাও এই সমস্যার বাইরে নয়। কেমব্রিজ কারিকুলামের মতো শিক্ষা পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ ও প্রাসঙ্গিক চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও দেখা যাচ্ছে, বাড়িতে স্বাধীনভাবে কাজ করার সময় অনেক শিক্ষার্থী অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে জেন এআই ব্যবহার করছে। ফলে আগের প্রজন্ম যে গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক মূল্যায়নের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তার দক্ষতা গড়ে তুলত, সেই কাজ এখন ক্রমশ যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জেন এআই সব সময় নির্ভুল তথ্য দেয় না। বহু ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ মনগড়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। যাচাই ছাড়া সেই তথ্য ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীরা সুন্দর ভাষার পাশাপাশি ভুল তথ্যও আত্মস্থ করছে। ফলে শিক্ষাক্রম যদি তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং প্রাসঙ্গিকতা মূল্যায়নের দক্ষতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে শিক্ষার্থীরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা একটি সমন্বিত নীতিমালার অভাব। অনেক শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের প্রতি আস্থা রাখতে চান। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের কাজ এবং জমা দেওয়া অ্যাসাইনমেন্টের মানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তাঁদের সন্দিহান করে তোলে। একক কোনো নীতিমালা না থাকায় কেউ কঠোর শাস্তির পথ বেছে নিচ্ছেন, আবার কেউ বিষয়টি উপেক্ষা করছেন। কোনোটিই কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারে না।
সমস্যা শুধু মানবিক বিভাগে সীমাবদ্ধ নয়। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মতো বিষয়েও পাঠ্যক্রম এখনো অতিমাত্রায় তত্ত্বনির্ভর। দেশের উদীয়মান সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ ডিজাইন শিল্পের মতো বাস্তব কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ এখনো খুব সীমিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনের একটি বড় অংশ এখনো জেন এআইকে সম্ভাবনার পরিবর্তে আশঙ্কার চোখে দেখে। অনেকের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল নকল করার একটি মাধ্যম। অথচ সঠিক নীতিমালা ও নৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করে তুলতে পারে। এই ভুল ধারণার কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত এখনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
নীতিগত করণীয
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুমাত্রিক নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। সবার আগে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে শিক্ষায় জেন এআই ব্যবহারের জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সেখানে কোন ব্যবহার গ্রহণযোগ্য, কোনটি একাডেমিক অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে, শিক্ষকরা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক পার্থক্যও বিবেচনায় আনতে হবে। একটি প্রোগ্রামিং কোর্সে জেন এআই ব্যবহারের গ্রহণযোগ্যতা যেমন হতে পারে, ইতিহাসের গবেষণাপত্রে তার মানদণ্ড তেমন নাও হতে পারে।
পাঠ্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে। মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কেবল চূড়ান্ত উত্তর নয়, বরং চিন্তার বিকাশের পুরো প্রক্রিয়া। খসড়া প্রস্তুত, আত্মসমালোচনামূলক মন্তব্য, মৌখিক উপস্থাপনা এবং যুক্তি উপস্থাপনের মতো বিষয়গুলো মূল্যায়নের অংশ হলে শিক্ষার্থীরা সহজ শর্টকাটের পরিবর্তে প্রকৃত শেখার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেবে।
শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং পাঠদানে তার কার্যকর প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বেতন কাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে তাঁদের ব্যক্তিগত টিউশনের ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায়, বাস্তব শিল্পক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পাঠ্যক্রম তৈরি করলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতির জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবেন।
সবশেষে উচ্চশিক্ষার নেতৃত্বে একটি মানসিক পরিবর্তন দরকার। জেন এআইকে কেবল নিষিদ্ধ করার বিষয় হিসেবে না দেখে দায়িত্বশীল ব্যবহারের পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা নিতে হবে। শিক্ষক ও প্রশাসকদের নিজেরাও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নৈতিক ও সমালোচনামূলক ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব থেকে আলাদা থাকবে না। এখন মূল প্রশ্ন একটাই, সেই ভবিষ্যৎ কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, নাকি সুপরিকল্পিত নীতিমালার মাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হবে।
