তানজীনা ফেরদৌস
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতে ব্যভিচার সম্পর্কিত যে বিধান এখনো বহাল আছে, তা ঔপনিবেশিক যুগের উত্তরাধিকার। বর্তমান সময়ে সংবিধানের সমতা ও বৈষম্যহীনতার অঙ্গীকারের সঙ্গে এই বিধানের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা যে নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার দাবি করে, বাস্তবে সেই ধারাই নারীদের আইনি সমতা থেকে বঞ্চিত করে এবং সমাজে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
তাই এই আইনের সংস্কার কেবল একটি আইনি প্রয়োজন নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুস্থ সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার অপরিহার্য শর্ত। এই নিবন্ধে প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে, যাতে বহুদিনের বিলম্বিত জনআলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
৪৯৭ ধারার বৈষম্যমূলক কাঠামো
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা ব্যভিচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করলেও তার সংজ্ঞা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং স্পষ্টতই লিঙ্গবৈষম্যমূলক। এই ধারায় কেবল সেই পুরুষকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে তার স্বামীর সম্মতি বা নীরব সমর্থন ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। কিন্তু সেই সম্পর্কে জড়িত বিবাহিত নারীকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয় না, এমনকি সহযোগী হিসেবেও নয়। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ধারা কেবল বিবাহিত নারীকে কেন্দ্র করে প্রযোজ্য। বিধবা, অবিবাহিত নারী কিংবা যৌনকর্মীদের সঙ্গে সংঘটিত একই ধরনের সম্পর্ক এই আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়।
ফলে আইনের দৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কেবল স্বামী, আর অভিযুক্ত ব্যক্তি কেবল অন্য পুরুষ। বিবাহিত নারীকে যেন নিজের অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি নয়, বরং স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যার প্রতি অন্যের হস্তক্ষেপকে স্বামীর অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়।
এই কাঠামো থেকে বহু অযৌক্তিক পরিস্থিতির জন্ম হয়। কোনো স্বামী ব্যভিচারে লিপ্ত হলেও তার স্ত্রী স্বামী বা সংশ্লিষ্ট নারীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা করতে পারেন না। অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্ক ভঙ্গের শিকার হয়েও আইন তার জন্য কোনো প্রতিকার রাখেনি।
অন্যদিকে, একজন স্বামী চাইলে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। ফলে আইনের মাধ্যমে স্ত্রীর যৌন স্বাধীনতার ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়, অথচ নিজের আচরণের জন্য স্বামীর কোনো সমপর্যায়ের জবাবদিহি নেই। এমনকি কোনো স্বামী আর্থিক সুবিধার জন্য স্ত্রীর ব্যভিচারে সম্মতি দিলেও বর্তমান আইন সেই পরিস্থিতির কোনো সমাধান দেয় না।
এই বৈষম্যমূলক কাঠামোর প্রভাব ব্যক্তি বা পারিবারিক বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নারীদের বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীন আইনি অবস্থান অস্বীকার করে আইন পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করে। বার্তা যায়, বিবাহে নারীর স্বতন্ত্র অধিকার নেই; তার স্বার্থ কেবল স্বামীর মাধ্যমে স্বীকৃতি পায়। ফলে পারিবারিক সংকট বা বৈবাহিক বিরোধের ন্যায়সঙ্গত সমাধানে নারীর পথ সংকুচিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিরোধ আইনের বাইরে সহিংসতা বা নির্যাতনের দিকে গড়ায়।
সংবিধান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্য
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং ২৮ অনুচ্ছেদে লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ বর্তমান আইন কেবল পুরুষকে অভিযোগ করার অধিকার দেয় এবং কেবল স্বামীকেই ভুক্তভোগী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে সংবিধানের মৌলিক নীতির সঙ্গে এই ধারা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
Nemo est supra leges, অর্থাৎ “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়” নীতির মূল কথাই হলো, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান আইনি অধিকার নিশ্চিত করা। ৪৯৭ ধারা সেই নীতিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও একই দাবি জানায়। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW), ২০০০ সালে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR) এবং ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদ (ICESCR)-এ যুক্ত হয়েছে। এসব আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৪৯৭ ধারার বৈষম্যমূলক কাঠামো সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
বিচার বিভাগও ইতোমধ্যে এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগ একটি রুল জারি করে জানতে চান, কেন ৪৯৭ ধারাকে অসাংবিধানিক ও আইনবিরোধী ঘোষণা করা হবে না। একই ধরনের ঔপনিবেশিক আইন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Joseph Shine বনাম Union of India মামলায় বাতিল করে রায় দেন যে, নারীদের সমান আইনি অধিকার না দেওয়ায় আইনটি লিঙ্গবৈষম্যমূলক এবং অসাংবিধানিক। বাংলাদেশের বিচার বিভাগেও একই প্রশ্ন বিচারাধীন রয়েছে।
প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার
প্রথমত, দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারাকে সম্পূর্ণ লিঙ্গনিরপেক্ষ করতে হবে। ব্যভিচারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান আইনি দায় এবং সমান প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। কেবল পুরুষ অপরাধী এবং কেবল স্বামী অভিযোগকারী, এমন বৈষম্যমূলক কাঠামো বিলোপ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৯৮ ধারার সংশোধন প্রয়োজন। বর্তমানে ব্যভিচার সংক্রান্ত মামলা করার অধিকার সীমিত। এই বিধান পরিবর্তন করে নারীদেরও স্বামী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে মামলা করার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় ৪৯৭ ধারার যেকোনো সংশোধন বাস্তবে কার্যকর হবে না।
তৃতীয়ত, আইনের পরিধি কেবল বিবাহিত নারীর সঙ্গে সংঘটিত ব্যভিচারে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বৈবাহিক সম্পর্ক ভঙ্গকারী সব ধরনের পরকীয়াকে আইনের আওতায় আনতে হবে, অন্য পক্ষ বিবাহিত, অবিবাহিত কিংবা বিধবা যেই হোক না কেন। বর্তমান আইনের এই অযৌক্তিক বিভাজন বৈষম্যকে আরও গভীর করে।
একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতির জন্যও আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেখানে কোনো স্বামী আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে স্ত্রীকে ব্যভিচারে বাধ্য করেন বা প্ররোচিত করেন। বর্তমান আইনে এই ধরনের জোরপূর্বক বা শোষণমূলক পরিস্থিতির কোনো স্বীকৃতি বা শাস্তির বিধান নেই। আইন সংশোধনের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করাও জরুরি। নতুন আইন, তার উদ্দেশ্য এবং নারী পুরুষের সমান অধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত না করলে কেবল আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে না।
অন্যায় আইন কখনো আদালতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এমন আইন পরিবারে ক্ষমতার ভারসাম্য, নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারার সংস্কার কোনো পুরোনো আইন সংশোধনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের আইনব্যবস্থাকে সংবিধানের সমতার অঙ্গীকার এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
