আমিরা হায়দার
স্বতন্ত্র স্থপতি
মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই ঢাকা ডুবে যায়। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলে গড়ে ওঠা দুই কোটির বেশি মানুষের এই রাজধানী এমন এক সামান্য বর্ষণেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে, যা একটি কার্যকর বর্ষাপ্রবণ নগরীর স্বাভাবিকভাবেই ধারণ করার সক্ষমতা থাকা উচিত।
এই পরিস্থিতি শুধু প্রকৃতির খেয়াল নয়। বরং দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে নেওয়া এমন সব পরিকল্পনাগত সিদ্ধান্তের ফল, যেখানে পানিকে নগর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা না করে বাধা হিসেবে দেখা হয়েছে। খাল ভরাট করা হয়েছে, পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত করা হয়েছে এবং শহরকে কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হয়েছে।
ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই পরিকল্পনাগত দর্শনের পরিবর্তন, যে দর্শন বর্তমান সংকট তৈরি করেছে। এই দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত আলোচনা সামনে এগিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা এই লেখা।
খাল ভরাটের দর্শন থেকে ফিরে আসতে হবে
মোগল আমলের ঢাকা তার ভৌগোলিক বাস্তবতাকে বুঝেছিল। ধোলাই খাল একই সঙ্গে ছিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশনের পথ এবং বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম, যা বুড়িগঙ্গাকে বালু ও লাক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যুক্ত করেছিল। ঢাকার জন্য পানি কখনো শুধু প্রাকৃতিক পটভূমি ছিল না, বরং শহরের কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি ছিল।
ঔপনিবেশিক আমলে এই ধারণার পরিবর্তন ঘটে। স্থির পানি ও জলাভূমিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য সমস্যা হিসেবে দেখা শুরু হয় এবং খালগুলোকে এমন নিচু জমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ভরাট করে নগর সম্প্রসারণ করা সম্ভব। ১৯১৭ সালে নগর পরিকল্পনাবিদ প্যাট্রিক গেডেস খাল পুনরুদ্ধার ও খননের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। জমির বিনিময়ে পানি বিসর্জনের যে পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল, তা আজও চলমান রয়েছে।
স্বাধীনতার পর, বিভিন্ন মহাপরিকল্পনা এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দখলের কারণে ঢাকার প্রায় ৮০টি ঐতিহাসিক খাল ও জলপথ হারিয়ে গেছে। শহরের জলপ্রবাহের পথ প্রায় ৩২৬ কিলোমিটার থেকে কমে ২০৬ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। ১৯৬৭ সালেও যে ২০ হাজার ২৮২ হেক্টর স্থায়ী জলাভূমি ছিল, তার প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর এখন বিলুপ্ত।
সংস্কারের প্রথম ধাপ হতে হবে এই চিন্তার পরিবর্তন। পানিকে অপসারণযোগ্য সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার উপযোগী সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। পরবর্তী সব প্রযুক্তিগত উদ্যোগের ভিত্তি হবে এই উপলব্ধি।
খাল নেটওয়ার্ক ও পানি ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধার
ঢাকার বিদ্যমান খাল ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে জরুরি কাঠামোগত পদক্ষেপ। বর্তমানে প্রায় ৯৫টি খাল ও জলপথ টিকে আছে, যার অনেকগুলোই পলি জমে সংকুচিত হয়েছে, সরু হয়ে গেছে কিংবা আংশিকভাবে দখল হয়ে গেছে। প্রতিটি খালের জরিপ করতে হবে, ঐতিহাসিক নকশার সঙ্গে মিলিয়ে এর প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে এবং স্বাভাবিক প্রস্থ ও গভীরতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
ধোলাই খাল, সেগুনবাগিচা ও পান্থপথের মতো প্রাকৃতিক জলপথগুলোকে বক্স কালভার্টের নিচে বন্দী করা হয়েছে। এসব পথ পুনরায় উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। খালগুলো ছিল ঢাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের প্রধান শিরা। সড়কের নিচে ঢেকে দেওয়ার ফলে পানি হারিয়ে যায়নি, বরং তার বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ি জলাভূমি পুনরুদ্ধারের উদাহরণ দেখিয়েছে, অবহেলিত জলাধারকে আবার কার্যকর পানি ধারণ ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই ধরনের উদ্যোগ শহরের অন্যান্য অবশিষ্ট খাল এলাকায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
বন্যার পানি প্রবাহের এলাকাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে
২০০০ সালের প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন খাল, বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল এবং পানি ধারণকারী জলাশয় ভরাট বন্ধ করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে আইনটি বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। মাত্র এক দশকে ঢাকার নির্ধারিত বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের অর্ধেকের বেশি হারিয়ে গেছে। এর বড় অংশই সরকারি সংস্থার অনুমোদিত আবাসন প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০১৬ থেকে ২০৩৫ সালের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় সাধারণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় কিছু শর্তসাপেক্ষ নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা কার্যত দখলকে নীতিগত বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট পানি অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রাজউকের উন্নয়ন কার্যক্রমের সাফল্য শুধু কত বর্গফুট ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে নয়, বরং কতটা পানি ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।
প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস
প্রাতিষ্ঠানিক বিভক্তি ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল করে রেখেছে। ঢাকা ওয়াসা কয়েক দশক ধরে খাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল, কিন্তু সেই সময়ে অনেক খাল পলি জমে সংকুচিত হয়েছে। ২০২০ সালে ২৬টি খাল এবং ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ৭৩০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। তবুও একই এলাকাগুলো এখনো বৃষ্টিতে ডুবে যায়।
বর্তমানে ঢাকার সব জলপথের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোনো একক সংস্থার কাছে নেই। রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও নির্দিষ্ট জবাবদিহিমূলক কর্তৃপক্ষ নেই। একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন, যার অধীনে থাকবে সব খাল, পানি ধারণকারী জলাশয়, বক্স কালভার্ট এবং পানি নিষ্কাশনের বহির্গমন পথ। প্রতিটি জলাশয়ের অবস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা নিয়ে একটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। জবাবদিহির প্রথম শর্ত হলো স্বচ্ছতা।
বাঁধ ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নতুনভাবে ভাবতে হবে
১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো ঢাকার পশ্চিমাংশকে নদীর পানি থেকে রক্ষা করেছে। তবে একই সঙ্গে এসব বাঁধ প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথও বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে সুরক্ষিত এলাকাগুলোও জলাবদ্ধতার শিকার হয়।
বাঁধ নদীর পানি ঠেকায়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি আটকে ফেলে। এই সমস্যার সমাধানে নিয়ন্ত্রিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পাম্পিং স্টেশন এবং বাস্তব সময়ে নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে, যাতে নদীর পানি বেড়ে গেলেও শহরের অভ্যন্তরের পানি নিরাপদভাবে বের করে দেওয়া যায়।
পয়োনিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আলাদা করতে হবে
ঢাকার বর্তমান পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালার সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে বৃষ্টির সময় অপরিশোধিত বর্জ্য পানি রাস্তায় ও জলপথে ছড়িয়ে পড়ে। একটি পৃথক ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য নির্দিষ্ট নালার মাধ্যমে পরিশোধন কেন্দ্রে যাবে এবং বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিক ও পরিকল্পিত নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাহিত হবে।
বর্তমান মিশ্র ব্যবস্থা শুধু জলাবদ্ধতা বাড়ায় না, বরং প্রতি বর্ষায় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করে এবং যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই পরিশোধন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বেশি বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে প্রথমে এই পৃথক ব্যবস্থা চালু করলে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব।
অর্থায়ন ও সুশাসন
এই ধরনের বড় সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে ৭৩০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে, কিন্তু দৃশ্যমান উন্নতি আসেনি। কারণ বিনিয়োগের বড় অংশ সমস্যার মূল কারণ সমাধানের পরিবর্তে সাময়িক উপসর্গ মোকাবিলায় ব্যয় হয়েছে।
ভবিষ্যতের বিনিয়োগ নির্ধারণ করতে হবে পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে। যেমন, কত কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধার হয়েছে, কত হেক্টর বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সুরক্ষিত হয়েছে এবং কতটা পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার পানি নিষ্কাশন সংকট অর্থের অভাবের সমস্যা নয়। মূল সমস্যা হলো, বদ্বীপের স্বাভাবিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অবকাঠামো পরিকল্পনা করা। যতদিন না ঢাকা বুঝবে যে পানি শহরের শত্রু নয়, বরং শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ততদিন প্রতিটি বর্ষা একই গল্প লিখবে, একই ডুবে যাওয়া রাস্তায়।
